জাতীয় সংসদ ভবন এলাকাটি এমনিতেই দিনে-রাতে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকে। চারপাশেই পুলিশের চেকপোস্ট, টহল ও সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা তৎপরতা থাকে। সংসদের অধিবেশন চলার মধ্যে সেই নিরাপত্তার কড়াকড়ি আরও বাড়ে। এর মধ্যেই জাতীয় সংসদের সামনের সড়কে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ঘটল ভয়ংকর ঘটনা। ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে চলন্ত রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারালেন রনজিনা পারভীন (৫৫) নামে এক স্কুলশিক্ষক। তিনি বগুড়ার গাবতলীতে অবস্থিত বাগবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন।
গতকাল শনিবার সকাল ৬টার দিকে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে ঘেরা সংসদ ভবন এলাকায় ঘটে এই ঘটনা। মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী শিক্ষিকার প্রাণ কেড়ে নির্বিঘ্নেই পালিয়ে যায়। পুলিশ বলছে, শনিবার সকালে এলাকাটিতে পুলিশের অন্তত তিনটি টহল টিম থাকলেও
কোনো চেকপোস্ট ছিল না।
নিহতের স্বজন ও সহকর্মীরা বলছেন, রনজিনা পারভীন গতকাল ভোরে ব্যবসায়ী স্বামী মতিউর রহমান মতিনের সঙ্গে বগুড়া থেকে বাসে ঢাকায় আসেন। সেখান থেকে যাচ্ছিলেন ফার্মগেটে ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে। কথা ছিল সেখানে চোখের চিকিৎসা করাবেন রনজিনা। তবে এর আগেই ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ দিতে হলো তাকে। বছর খানেকের মধ্যেই তার চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। তার আগেই চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসে জীবন থেকেই অবসর নিতে হলো এই শিক্ষিকাকে।
পুলিশ ও স্বজনরা জানিয়েছেন, শিক্ষিকা রনজিনা ও তার স্বামী মতিন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। তাদের রিকশাটি সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়ক ধরে খেজুর বাগান এলাকায় পৌঁছানোর পর আগেই পেছন থেকে মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী শিক্ষিকার ব্যাগ ধরে টান দেয়। এতে তিনি সড়কে ছিটকে পড়েন। উদ্ধার করে শেরেবাংলা নগরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থলের উল্টো পাশে রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয় এবং অদূরেই চক্ষু হাসপাতাল।
মৃত ঘোষণার পর শিক্ষিকার মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে রাখা হয়। খবর পেয়ে সেখানেই ছুটে আসেন ঢাকায় থাকা তার স্বজনরা। তাদের একজন সাগর হোসেন জানান, চোখের ডাক্তার দেখিয়ে শনিবার রাতের বাসে বগুড়ায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল রনজিনার। এখন তার লাশ নিয়ে ফিরতে হচ্ছে।
মর্গের সামনে ছিলেন রনজিনার স্বামী মতিউর রহমান মতিনও। চোখের সামনে স্ত্রীকে হারিয়ে তিনি ছিলেন বাকরুদ্ধ। দুপুরের দিকেও তার চোখেমুখে সকালের আতঙ্কটা ভাসছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে পুলিশ জানায়, শিক্ষিকা ও তার স্বামীকে বহন করা অটোরিকশাটি সংসদ ভবনের ১২ নম্বর (বকুলতলা) গেট পার হওয়ার পরপরই পেছন থেকে আসা একটি মোটরসাইকেল থেকে তার হাতে থাকা ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান দেয় ছিনতাইকারীরা। এ সময় রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে তার মাথা ফেটে যায়।
ওই ছিনতাইয়ের ঘটনাস্থলে আগে-পরের সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যায়, আর-ওয়ান-ভাইভ মডেলের একটি মোটরসাইকেলে করে দুই ব্যক্তি সন্দেহজনকভাবে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ঘোরাফেরা করছে। এমনকি রাস্তার উল্টো দিকের লেনেও ঢুকে পড়তে দেখা গেছে মোটরসাইকেলটিকে। পুলিশ বলছে, এই মোটরসাইকেল দিয়েই চলন্ত রিকশার যাত্রী শিক্ষিকার ব্যাগ ধরে টান দিয়ে তারা দ্রুত পালিয়ে যায়। তাদের শনাক্তে একাধিক টিম কাজ করছে।
শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, ওই এলাকায় থানা পুলিশের তিনটি টহল টিম থাকে। গাড়ির টহল ছাড়াও মোবাইল টহল টিম ও ফুট প্যাট্রোল টিম থাকে। ভোরের দিকে ফাঁকা পেয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনাটি ঘটেছে।
তিনি বলেন, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে আমরা মাঝে মাঝে চেকপোস্ট করি। শনিবার চেকপোস্ট ছিল না। তবে টহল টিম ছিল। ঘটনার সময় সংসদের ১১ ও ১২ নম্বর গেটের মাঝামাঝি স্থানে টহল টিম অবস্থান করছিল। আর ১২ নম্বর গেটের একটু সামনেই ঘটনাটি ঘটে।
কালবেলার বগুড়া ব্যুরো ও গাবতলী প্রতিনিধি জানান, ঢাকায় চিকিৎসা করাতে গিয়ে ছিনতাইকারীদের হাতে শিক্ষিকা রনজিনা পারভীনের মৃত্যুর খবর বগুড়ায় পৌঁছলে স্বজন ও সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
রনজিনা পারভীন বগুড়া শহরের পিটিআর মোড়ে স্বামী ও একমাত্র কন্যাসন্তান ১৪ বছরের রাইশা মনিকে নিয়ে বসবাস করতেন। রাইশা নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
রনজিনা পারভীনের ভাই জাহিদুল ইসলাম জানান, ১৯৯১ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন তার বোন। ৩৫ বছর শিক্ষকতা জীবনে তিনি নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন মর্মান্তিক ঘটনায় তারা মুষড়ে পড়েছেন। মাত্র এক বছর পরই তার বোনের অবসরে যাওয়ার কথা ছিল।
বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ও রনজিনা পারভীনের দীর্ঘদিনের সহকর্মী রিজবোনা আকতার জানান, ২৬ আগস্ট ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটির দিনে তারা ছয়জন শিক্ষিক স্কুলে গিয়ে মিলাদ মাহফিলে অংশ নেন। পরে তার অনুরোধেই সবাই মিলে তার মোবাইল ফোনে একটি গ্রুপ ছবি তোলেন। ছবিটি তাদের প্রধান শিক্ষিকার মোবাইল ফোনেই রয়ে গেছে।
গাবতলী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসান জানান, শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন ছুটির দরখাস্ত দিয়ে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় গিয়েছিলেন। সেই ছুটিই যে তার শেষ ছুটি হবে কে জানত? তিনি বলেন, রনজিনা পারভীন দীর্ঘ কর্মজীবনে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে সুন্দর আচরণের মাধ্যমে তিনি সবার কাছে প্রিয় ছিলেন।