গ্যাসের সংকট নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছেই না। সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় (ডিপিএম) কেনা ব্ল্যাক কিউব কোম্পানির যে এলএনজি কার্গোটি ৬ সেপ্টেম্বর আসার কথা ছিল, তাও অনিশ্চিত। তারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এখনো জমা দিতে পারেনি পেট্রোবাংলার কাছে। এমনকি ব্ল্যাক কিউবের কর্মকর্তারা সরকারের সঙ্গে কয়েকদিন ধরে যোগাযোগই করছেন না। এই কার্গো না এলে সপ্তাহজুড়ে আবারও গ্যাস সংকট লেগেই থাকবে। এদিকে সারা দেশে এখনো লোডশেডিং প্রকট। আকস্মিক বন্যায় বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শনিবার যুগান্তরকে বলেছেন, নেপাল যে দুটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করত, সেই দুটি বন্যায় দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন অন্য কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানির চেষ্টা চলছে।
২১ জুলাই থেকে সারা দেশে গ্যাসের মারাত্মক সংকট চলছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশের শত শত শিল্পকারখানা। এক মাসের বেশি সময় অনেক শিল্পকারখানা স্বাভাবিক উৎপাদনে যেতে পারছে না। পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছিল, ১ সেপ্টেম্বরের পর নিয়মিত এলএনজি কার্গো এলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। কিন্তু চলতি সপ্তাহেও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে না। কারণ, ডিপিএমে কেনা একটি এলএনজি কার্গো ৬ সেপ্টেম্বর আসার কথা। সেটি এখনো নিশ্চিত করেনি। যদি ৬ সেপ্টেম্বর কার্গো বাংলাদেশে না আসে, তাহলে দেশের বড় ধরনের ক্ষতি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
সমন্বয়হীনতা ও দূরদর্শিতার অভাবের ছাপ : ডিপিএম পদ্ধতিতে ব্ল্যাক কিউব থেকে ২টি কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত হয় ৬ আগস্ট ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে। এর একটি আসার কথা ৬ সেপ্টেম্বর। এমভি ইসটিম ফুজি (আইএমও ৯৯৯১৮৫৮) নামে একটি এলএনজি কার্গো বাংলাদেশে পাঠানোর কথা বলে গত সপ্তাহে ব্ল্যাক কিউব কাগজপত্র পাঠিয়েছিল পেট্রোবাংলার কাছে। কিন্তু এলএনজি বিক্রেতা এই কার্গোর এসবিএলসি (স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিট) এখনো জমা দেয়নি সরকারের কাছে। এসবিএলসি হচ্ছে এলএনজি লেনদেনে বিক্রেতার ব্যাংক গ্যারান্টি। এই কার্গোর ক্ষেত্রে এটির পরিমাণ দেড় কোটি ডলার। এক সপ্তাহ ধরে তাগাদা দিয়েও এই এসবিএলসি পাচ্ছে না পেট্রোবাংলা। সর্বশেষ ব্ল্যাক কিউবের স্থানীয় প্রতিনিধি সরকারি প্রতিনিধিদের ফোনও ধরছে না। তাকে কোনোভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে কার্গো আসার সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্ল্যাক কিউবের দেওয়া কার্গো ‘এমভি ইসটিম ফুজি’ এখনো লোহিতসাগর অর্থাৎ মিসরের উপকূলে আছে। এটি আইবেরীয় উপকূল জিব্রাল্টার অভিমুখে রওয়ানা দিয়েছে। সেখানে এটি পৌঁছবে ৭ সেপ্টেম্বর। সুতরাং এই কার্গো আর আসছে না। এখন ৬ সেপ্টম্বরের কার্গোর চাহিদা কীভাবে পূরণ করা যায়, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে পেট্রোবাংলা। জানা যায়, এ সময়ের আগে-পরের কার্গোর সময় সমন্বয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। যাতে বড় ধরনের কোনো সংকট না হয়।
ব্ল্যাক কিউব কোম্পানি খোলা হয়েছে ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল। ব্রিটিশ নাগরিক মাশরুর হায়দার এই কোম্পানির মালিক। ব্যবসায় এ খাতে তার কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই। এ কোম্পানি ১৫ দশমিক ৫০ ডলারে প্রতি ইউনিট এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমান বাজারে চলছে ২২ ডলারের বেশি প্রতি ইউনিট। ব্ল্যাক কিউবের মতো হংকংভিত্তিক জেন হু শিপিং এবং মাক্সওয়েল নামে আরও দুটি কোম্পানির ৪টি কার্গো ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই ৪টি কার্গোর মধ্যে ২৬ আগস্ট জেন হুর কার্গো কুংপেং বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। পরে কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, সেই কার্গো পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত। ২৬ আগস্টের কার্গো না আসার কারণে এখন দেশে গ্যাস সংকট চলছে। কারণ, কুংপেং-এর স্থলে সরকার নতুন করে কোনো কার্গো স্পট থেকে কিনতে পারেনি। কুংপেং কার্গোটি রাশিয়ার এলএনজি বহন করে। এভাবে ডিপিএম-এর কোনো এলএনজি এখনো আসেনি। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে। তাই দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে ১০৫ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এখন সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে ৭২ কোটি ঘনফুট। ১০ সেপ্টেম্বর ডিপিএম পদ্ধতিতে কাজ পাওয়া মেক্সওয়েলের একটি কার্গো আসার কথা। কিন্তু সেটি অনেকটা অনিশ্চিত। তাই সৌদি আরামকোকে এই সময়ে একটি কার্গো সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে।
সরাসরি ক্রয়নীতিতে সর্বনাশ : সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় গত ১৭, ২৩, ২৬ ও ২৯ আগস্ট এবং ৬ ও ১০ সেপ্টেম্বর কার্গো আমদানির শিডিউল দেওয়া হয়েছিল। একটিও আসেনি বা আসার সম্ভাবনা দেখছে না পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগ। এর মধ্যে ২৬ আগস্ট এবং ৬ সেপ্টেম্বরের কার্গোর চাহিদা স্পট বা অন্য কোনোভাবে এনে পূরণ করা যায়নি। বাকি কয়েকটি স্পট থেকে কেনা হয়েছে একেবারে স্বল্পসময়ে। সুতরাং এ সময়ে সারা দেশে গ্যাস রেশনিং করতে হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের শিল্প-কলকারখানাসহ সব ধরনের গ্রাহক। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী গ্যাস সরবরাহ স্বভাবিক করতে আন্তরিক। এমনকি এ বিষয়ে দৈনিক ২/৩ বার পর্যন্ত বৈঠক করছেন। তিনি তাগাদাও দিচ্ছেন। কিন্তু সরকারের ভেতরে থাকা একটি চক্র জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় কার্গো আমদানির জন্য চাপ দিচ্ছে। এতে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে সরকারের।
একই কারণে সরকারকে এলএনজি কিনতে হয়েছে বেশি দামে। এর মধ্যে ৭/৮ সেপ্টেম্বর সরবরাহ দিতে সৌদি আরামকো ট্রেডিংয়ের একটি কার্গোর এলএনজি কেনা হয়েছে ২৩ দশমিক ৯৩ ডলারে প্রতি ইউনিট। আর পসকো কোম্পানির এলএনজি কেনা হয়েছে ২৪ দশমিক ৬২ ডলারে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এক মাস আগে স্পট বা চুক্তির কার্গো কেনার শিডিউল ঠিক করে ফেলতে পারলে প্রতি কার্গোতে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব। প্রতি কার্গো এলএনজি কিনতে এখন খরচ পড়ে ৭ থেকে ৮ কোটি ডলার। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আগে এই খরচ ছিল ৪ কোটি ডলার।
দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল-এফএসআরইউ-এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুন লাগে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহের পর এই টার্মিনাল চালু হলেও এরপর ২০ দিন ধরে পুরোনো কার্গো আমদানি বা ডিপিএম-এর শিডিউল দিয়েও কার্গো না পাওয়ার কারণে দেশে গ্যাস সংকট লেগেই আছে।
নেপালের বন্যায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ : বুধবার নেপালে স্মরণকালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা হয়। এই বন্যার কারণে নেপালের চিলিমে ও ত্রিশূল বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন অন্য কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আনার চেষ্টা করছে পিডিবি। পিডিবির চেয়ারম্যান বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ চলছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। আশা করছি, কয়েকদিনের মধ্যে নেপালের বিদ্যুৎ আবার পাওয়া যাবে।
সারা দেশে এখনো মারাত্মক লোডশেডিং চলছে। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধ এবং তেল কিনতে সরকারের কাছে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহে সরকার এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত দিতে পারে। বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন-বিপ্পার সভাপতি ডেভিড হাসনাত যুগান্তরকে বলেছেন, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা আছে সরকারের কাছে। এখন এই টাকা পরিশোধ করলে বেসরকারি কোম্পানি বা আইপিপিগুলো তেল আনার এলসি করতে পারবে। নতুবা ব্যাংক তাদের এলসি করতে দেবে না। শনিবার দুপুর ২টায় সারা দেশে লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ২৪৭ মেগাওয়াট। এ সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৮৫৭ মেগাওয়াট। আর সরবরাহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৬১০ মেগাওয়াট।