জাল-জালিয়াতির ‘মাস্টার’ রাজধানীর অনন্যা সক্স অ্যান্ড ইনার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় ফেব্রিক্স, অ্যাক্সেসরিজ থেকে শুরু করে পণ্যের কাঁচামাল আমদানি করে বেআইনিভাবে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে শুধু বন্ড সুবিধায় ২০০ কোটি টাকার ফেব্রিক্স আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সরকারের প্রায় ১১৭ কোটি টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়েছে। শুধু ফাঁকি নয়, এ অনিয়ম করতে তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএর ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনও (ইউডি) জালিয়াতি করেছে। এ ছাড়া রপ্তানি করে নির্ধারিত সময়ে অর্থ দেশে ফেরত আনেনি প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আরও প্রায় ১৪ লাখ ডলার পাচার করেছে বলে প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কয়েক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের অনিয়ম করে আসছে। এনবিআরের দুই গোয়েন্দা দপ্তর সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্ট সেল (সিআইসি) এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে এমন অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।
সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে বন্ডেড সুবিধায় পণ্য আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ ছিল অনন্যা সক্স অ্যান্ড ইনার্স ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটি বন্ডের কাঁচামাল থেকে শুরু করে ফ্রি অব কস্ট (এফওসি) সুবিধায় আমদানি করা পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করে সরকারের শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে বন্ড সুবিধায় ৩ হাজার ৫৮১ টন ফেব্রিক্স আমদানি করে, যার শুল্কায়ন মূল্য ১৯৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা। আলোচ্য সময়ে প্রায় ১৮ টন অ্যাক্সেসরিজ পণ্য বন্ডেড সুবিধায় আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি। এ অ্যাক্সেসরিজের শুল্কায়ন মূল্য ২ কোটি টাকা। বন্ডেড সুবিধায় আমদানি করা পণ্যের বিপরীতে মাত্র ৭৮৬ টনের তৈরি করা পণ্য রপ্তানি করেছে অনন্যা।
এর সঙ্গে পণ্য তৈরিতে ২৭ শতাংশ অবচয় বিবেচনায় নিলে পণ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৯৮ টন। আইন অনুযায়ী, বাকি পণ্য অনন্যার ওয়্যারহাউস বা গুদামে থাকার কথা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির ওয়্যারহাউসে পণ্য মিলেছে এক টনেরও কম। অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ৫৮২ টন পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে প্রতিষ্ঠানটির সর্বমোট কর ফাঁকির পরিমাণ দাঁড়ায় ১১৭ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে অনন্যা সক্স অ্যান্ড ইনার্স ইন্ডাস্ট্রিজ মাত্র ৪২ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাত্র ২৮ লাখ ডলার দেশে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, রপ্তানির অর্থ ৪ মাসের মধ্যে দেশে আসতে হবে। কিন্তু চার মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও অনন্যার রপ্তানির ১৪ লাখ ডলার দেশে ফেরত আসেনি। এতে অর্থ পাচারের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে বলেও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সফিউর রহমান কালবেলাকে বলেন, অনন্যা সক্সের বিরুদ্ধে তদন্তে প্রায় ১১৫ কোটি টাকারও বেশি বন্ড ফাঁকির প্রমাণ মিলেছে। এরই মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন ঢাকা দক্ষিণের বন্ড কমিশনারেটে পাঠানো হয়েছে। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বন্ড ফাঁকির দাবিনামাও জারি হয়েছে। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ বছরের ব্যবধানে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট ও বন্ডের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান অনন্যা সক্স অ্যান্ড ইনার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড জালজালিয়াতির মাধ্যমে শতকোটি টাকা ফাঁকি দিলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ ছিল না। সর্বশেষ সিআইসি ও শুল্ক গোয়েন্দার অভিযানে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনা। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, পাঁচটি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে আমদানি করা পণ্য দিয়ে ফিনিশড প্রোডাক্ট বা রপ্তানি পণ্যও তৈরি করা হয়নি। অন্যদিকে, পণ্য তৈরি না করলে প্রতিষ্ঠানটির ওয়্যারহাউসে মজুত থাকার কথা থাকলেও অভিযানে মজুত পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া বন্ড সুবিধায় আমদানি করা ফেব্রিক্স দিয়ে পণ্য রপ্তানি করেছে—এমন দলিলাদিও দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটিতে বন্ড রেজিস্ট্রারও পাননি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এ ছাড়া লে-অফ বা বন্ধ ঘোষণাকালীন প্রতিষ্ঠানটি বন্ডেড সুবিধায় পণ্য আমদানি করেছে বলে তথ্য মিলেছে। গোয়েন্দ কর্মকর্তারা মনে করছেন, খোলাবাজারে বিক্রির জন্যই বন্ধ থাকাকালীন বন্ডেড সুবিধায় পণ্য আমদানি করা হয়।
জানতে চাইলে বন্ড কমিশনারেট ঢাকা দক্ষিণের কমিশনার মোহাম্মদ হাসমত আলী কালবেলাকে বলেন, অনন্যা সক্স অ্যান্ড ইনার্স ইন্ডাস্ট্রজের বিরুদ্ধে বন্ড ফাঁকির দাবিনামা জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স সাসপেন্ড করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, শুধু আমদানিতেই জালিয়াতি করেনি অনন্যা সক্স অ্যান্ড ইনার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ থেকে নেওয়া ইউডিতেও জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে তদন্তে। প্রতিষ্ঠানটির সেলস কন্ট্রাক্ট এবং বিল অব এক্সপোর্টের দেওয়া ইউডিও বিজিএমইএর ওয়েবসাইটে যাচাই করে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ ভুয়া ইউডির মাধ্যমে বিল অব এক্সপোর্ট দাখিল করেছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি একই সেলস কন্ট্রাক্টে এবং বিল অব এক্সপোর্টে আলাদা আলাদা ইউডি ব্যবহার করেছে। মূলত অর্থ পাচারের উদ্দেশ্যে এ ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলেও উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
তদন্ত প্রতিবেদনে হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির তিনটি বিল অব এক্সপোর্টের তথ্য বিজিএমইএর ডাটাবেজে যাচাই-বাছাই করে পাওয়া যায়নি, যা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অর্থ পাচার আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমন ফৌজদারি অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য সাপেক্ষে পরবর্তী আইনি কার্যক্রম গ্রহণেরও সুপারিশ করা হয়েছে। বন্ডেড সুবিধায় পণ্য আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রির প্রমাণ পাওয়ায় এ বিষয়েও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ বন্ডেড প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনন্যা সক্সসের বন্ড লাইসেন্স স্থায়ীভাবে স্থগিতের সুপারিশও করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
শুল্ক ফাঁকির বিষয়ে কথা বলতে অনন্যা সক্স অ্যান্ড ইনার্স ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মুরাদ হোসেন সোহাগের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে প্রতিষ্ঠানে গিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।