সুন্দরবনের কোলঘেঁষা সাতক্ষীরার শ্যামনগর। ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ভাঙে অনেক শিশুর। হাতে বই-খাতা নয়, থাকে খালি কলসি। স্কুলে যাওয়ার আগে তাদের কাজ পানির সন্ধানে বের হওয়া। বাড়ির কাছের পুকুরের পানি লবণাক্ত কিংবা পানযোগ্য নয়। কোথাও ফিল্টারের পানি পাওয়া গেলেও সেখানে দীর্ঘ সারি। আবার কোথাও সেই পানির জন্য দিতে হয় টাকা। কিন্তু পানি কিনেও এর মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে মিঠা পানির উৎস নষ্ট হওয়া এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বাড়তি চাপে সাতক্ষীরার উপকূলে নিরাপদ পানির সংকট দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্থানীয় বাসিন্দা, চিকিৎসক, গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য ও বক্তব্যে উপকূলের এই সংকটের চিত্র উঠে এসেছে।
মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের একটি মুন্ডাপাড়ায় প্রায় ৩০টি মুন্ডা পরিবারসহ ৪০-৪৫টি পরিবার বসবাস করে। তাদের পানির প্রধান উৎস একটি পুকুর। পরিবারের নারীরাই সাধারণত পানি সংগ্রহ করেন। মুন্ডা সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী সনেকা মুন্ডা বলেন, প্রতিদিন সকালে তাকে পানি আনতে যেতে হয়। পুকুরের পানি ফিল্টার হয়ে নির্দিষ্ট স্থানে আসে। সেখানে ভিড় থাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর হেঁটে বাড়ি ফিরতে হয়।
স্থানীয় রমেছা বেগমের বাড়ি থেকে পানির উৎস প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে। আশপাশে মিষ্টি পানির পুকুর নেই। ফিল্টারের পানি নিতে টাকা লাগে বলে তিনি বিনামূল্যে পুকুরের পানি সংগ্রহ করেন। এক কলসি পানি আনতে এক ঘণ্টার বেশি এবং ভিড় থাকলে দেড় ঘণ্টাও লাগে বলে জানান তিনি।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর শ্যামনগরের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। পরবর্তী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসেও মিঠা পানির উৎস লবণাক্ত হয়েছে। একটি গবেষণায় শ্যামনগর, দেবহাটা ও খুলনার কয়রায় গড়ে ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রায় ১ হাজার পিপিএম এবং ভূপৃষ্ঠের পানিতে প্রায় ২ হাজার পিপিএম লবণাক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ-ছয় গুণ বেশি।
এর সঙ্গে রয়েছে আর্সেনিকের ঝুঁকি। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার (মেডিসিন) অনিন্দ্য দাশ সৌরভ বলেন, দীর্ঘদিন আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলে ত্বকে কালো দাগ ও চামড়া মোটা হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে লিভার, কিডনি ও বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় শ্যামনগরে আর্সেনিক তুলনামূলক কম পাওয়া গেলেও উপকূলের বিভিন্ন স্থানে লবণাক্ততা ও আর্সেনিক একসঙ্গে পানির নিরাপত্তাকে জটিল করতে পারে বলে উল্লেখ রয়েছে।
সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক কৃষ্ণপদ মুন্ডা বলেন, কইখালী, রমজাননগর ও গাবুরা ইউনিয়নের মুন্ডাপাড়াগুলোতে সংকট বেশি। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়ানোর পাশাপাশি কোথাও পানি কিনতে হয়। অনেক মুন্ডা নারী দিনমজুরির কাজ করেন। পানি সংগ্রহে সময় ব্যয় হওয়ায় তাদের কাজ ও পরিবারের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সৌরভ মুন্ডা জানান, বর্ষায় তারা বৃষ্টির পানি ধরে সারা বছর ব্যবহারের চেষ্টা করেন। দুর্যোগে সেই পানি নষ্ট হলে বাইরে থেকে কিনতে হয়। তখন ৩০ লিটারের একটি ড্রামে ২০-৩০ টাকা পর্যন্ত লাগে।
নিরাপদ পানির চাহিদা ঘিরে সাতক্ষীরা শহর ও বিভিন্ন এলাকায় জার ও বোতলজাত পানির ব্যবসা গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠানের যথাযথ অনুমোদন ও মান নিয়ন্ত্রণ নেই। পৌরসভার বাসিন্দা মো. হোসেন আলী বলেন, শহরে ‘ব্যাঙের ছাতার মতো’ পানির কারখানা গড়ে উঠেছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের বিএসটিআই অনুমোদন থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন আছে কি না এবং পানির মান পরীক্ষা করা হচ্ছে কি না, তা সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়।
সাতক্ষীরায় ৫০০টির বেশি অনুমোদনহীন বোতলজাত পানি কারখানা এবং সেখান থেকে প্রতিদিন ৮০-৯০ লাখ লিটার পানি উত্তোলনের তথ্য স্থানীয়ভাবে বলা হলেও প্রতিবেদনের সময় এর স্বাধীন সরকারি যাচাই পাওয়া যায়নি।
পানি সরবরাহকারী আরিফুল বলেন, তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে জারের পানি সংগ্রহ করে শহরের বাসাবাড়িতে পৌঁছে দেন। তার দাবি, তাদের সরবরাহ করা পানির বিএসটিআই অনুমোদন রয়েছে।
সাংবাদিক ইব্রাহীম খলিল বলেন, মানুষ ২০, ৩০ বা ৩৫ টাকা দিয়ে জারের পানি কিনলেও সেটি পরীক্ষিত বা অনুমোদিত কি না, অনেকেই জানেন না। পানি স্বচ্ছ দেখালেই নিরাপদ হওয়ার নিশ্চয়তা নেই; রাসায়নিক ও জীবাণুবিষয়ক পরীক্ষায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাতক্ষীরা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদ পারভেজ বলেন, জেলার সাত উপজেলায় নিরাপদ পানি সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ। ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক ও লবণাক্ততার কারণে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কমিউনিটি পর্যায়ে পানি পরিশোধন ও পাইপলাইনে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক স্থাপনের পাশাপাশি আশাশুনি, শ্যামনগর ও কালীগঞ্জে নারীদের নেতৃত্বে কমিউনিটি পর্যায়ে নিরাপদ পানি সরবরাহের প্রকল্প রয়েছে। আশাশুনি, কালীগঞ্জ ও দেবহাটায় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পও নেওয়া হয়েছিল। সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও পানির গুণগতমান পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্পও রয়েছে।
কিন্তু কবে নাগাদ কতটুকু বাস্তবায়িত হবে তার কোনো নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেনি। সংকট মোকাবিলায় ইউনিয়নভিত্তিক নিরাপদ পানির উৎসের মানচিত্র তৈরি, পুকুর ও নলকূপের পানি নিয়মিত পরীক্ষা, বড় পরিসরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ট্যাংকের পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুমুক্তকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় মানুষের বক্তব্যে। এলাকাভেদে পুকুর স্যান্ড ফিল্টার, কমিউনিটি ওয়াটার প্ল্যান্ট ও উপযুক্ত স্থানে গভীর নলকূপ ব্যবহারের পাশাপাশি জার ও বোতলজাত পানির কারখানায় নিয়মিত অভিযান, পানির নমুনা পরীক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে নজরদারির প্রয়োজনও রয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা জলবায়ু পরিষদের আহ্বায়ক আশেক-ই-এলাহী বলেন, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা, পানির স্তর নেমে যাওয়া ও আর্সেনিক মিলিয়ে পানির সংকট প্রকট। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প থাকলেও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে প্রত্যাশিত সুফল সব মানুষের কাছে পৌঁছায় না।
একদিকে সনেকা মুন্ডার মতো শিশুকে ভোরে উঠে পানি আনতে যেতে হচ্ছে, অন্যদিকে শহরের মানুষ টাকা দিয়ে জারের পানি কিনেও সেটি পরীক্ষিত কি না নিশ্চিত হতে পারছেন না। নিরাপদ পানি সরবরাহের এই সংকটের সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, নারী ও শিশুর শ্রম, শিক্ষা, পরিবারের আয় এবং ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থাপনাও যুক্ত হয়ে পড়েছে।