ভারত থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে নতুন একটি আর্থিক দায় যুক্ত হতে যাচ্ছে। ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি বিদ্যুৎ ভায়াপার নিগম লিমিটেডের (এনভিভিএন) সঙ্গে ‘সেটেলমেন্ট নোডাল এজেন্সি’ বা এসএনএ চুক্তি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এর আওতায় ভারতীয় গ্রিড ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ ও চার্জ নিষ্পত্তি করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ‘এসএনএ চার্জ’। এ কারণে চুক্তির আর্থিক প্রভাব কী হবে, এ ব্যয় কোন সংস্থা বহন করবে, কীভাবে অর্থ পরিশোধ করা হবে এবং ভবিষ্যতে এ খাতে কত টাকা ব্যয় হতে পারে-এসব বিষয়ে মতামত চেয়ে অর্থ সচিবের কাছে চিঠি দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
বিদ্যুৎ বিভাগের সাম্প্রতিক এক চিঠিতে এনভিভিএন ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মধ্যে এসএনএ চুক্তির খসড়া পুনরায় পর্যালোচনার উদ্যোগের কথা জানানো হয়। ওই চিঠিতে ভারতের সিইআরসি নির্ধারিত এসএনএ চার্জের বিষয়টি উল্লেখ করে বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে খসড়া চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের মতামত চাওয়া হয়েছে। ভারতের ২০১৯ সালের ক্রস-বর্ডার বিদ্যুৎ বাণিজ্য বিধিমালায় বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্যে গ্রিড-সংশ্লিষ্ট চার্জ নিষ্পত্তির জন্য এসএনএ ব্যবস্থা রয়েছে। ভারত সরকার এনভিভিএনকে এ দায়িত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে এ বিষয়ে একটি এসএনএ চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।
সহজ ভাষায়, ভারত থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ কিনলেও শুধু বিদ্যুতের দাম পরিশোধ করলেই বিষয়টি শেষ হয় না। বিদ্যুৎ যে ভারতীয় সঞ্চালনব্যবস্থা বা গ্রিড ব্যবহার করে বাংলাদেশে আসে, সেই গ্রিড ব্যবহারের সঙ্গে নানা ধরনের কারিগরি ও আর্থিক হিসাব তৈরি হয়। কত বিদ্যুৎ নির্ধারিত ছিল, বাস্তবে কত বিদ্যুৎ এসেছে, নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম-বেশি হলে তার হিসাব কী হবে, গ্রিড ব্যবহারের চার্জ কত হবে-এসবের হিসাবও নিষ্পত্তি করতে হয়। এ কারণে অর্থ সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসাবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ চুক্তি কার্যকর হলে, এটি নিয়মিত ও পুনরাবৃত্ত ব্যয়ের একটি নতুন খাত তৈরি করতে পারে। বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ যত বাড়বে, সংশ্লিষ্ট চার্জও তত বাড়বে।
এ প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, অর্থ বিভাগের মতামত দেওয়ার পর বিপিডিবি ও বিদ্যুৎ বিভাগ চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করবে। এরপরই স্পষ্ট হবে এসএনএ চার্জসহ অন্যান্য গ্রিডসংশ্লিষ্ট ব্যয়ের প্রকৃত দায় কার ওপর পড়ছে এবং বিদ্যুৎ আমদানির মোট ব্যয়ে এর প্রভাব কতটা হবে।
কত চার্জ দিতে হবে : বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠিতে ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (সিইআরসি) নির্ধারিত এসএনএ চার্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে নির্ধারিত বিদ্যুতের (শিডিউল এনার্জি) প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি হারে এসএনএ চার্জের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতি ইউনিটে এ অঙ্ক খুব বেশি নয়। কিন্তু বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ বেশি হওয়ায় মোট অঙ্ক একেবারে কমও নয়। উদাহরণ হিসাবে, এনভিভিএন ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৪,৯১১ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে। ওই বিদ্যুতের ওপর শুধু ০.০০৫ রুপি হারে হিসাব করলে এসএনএ চার্জ দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ ভারতীয় রুপি।
বাংলাদেশি টাকায় তা বিনিময় হারভেদে কয়েক কোটি টাকার সমান। তবে এটি শুধু উদাহরণভিত্তিক হিসাব। বিশেষ করে বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ ভবিষ্যতে আরও বাড়লে এসএনএ চার্জ বাবদ ব্যয়ও বাড়বে। প্রকৃত অর্থ পরিশোধের পরিমাণ নির্ভর করবে চুক্তিতে কোন কোন বিদ্যুৎ লেনদেন ও কী পরিমাণ শিডিউল এনার্জি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে তার ওপর। ভারতের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এনভিভিএনের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তি রয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত ওই অর্থবছরে এনভিভিএন বাংলাদেশে ৩,৬৭২ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছিল। এছাড়া ভারত সরকার ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত তথ্যে বাংলাদেশ-ভারত বিদ্যুৎ সহযোগিতার বিভিন্ন চুক্তির পাশাপাশি নেপাল-ভারত-বাংলাদেশ ত্রিপক্ষীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্য চুক্তির কথাও জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে বহরামপুর-ভেরামারা ৪০০ কেভি আন্তঃসংযোগ এবং ত্রিপুরা-কুমিল্লা সংযোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ আমদানি হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ স্থানান্তর সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট ছিল। পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে আদানি পাওয়ারসহ অন্যান্য উৎস যুক্ত হওয়ায় ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি সক্ষমতা আরও বেড়েছে। এছাড়া ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পাশাপাশি নেপাল থেকেও ভারতীয় সঞ্চালনব্যবস্থা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ সরবরাহের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করে। এ ধরনের আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য বাড়লে গ্রিডসংশ্লিষ্ট চার্জ নিষ্পত্তিতে এসএনএর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ভারত সরকারের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান জ্বালানি সংকটের মধ্যেও সরকার ভারত থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি সহায়তা চেয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সম্প্রতি সচিবালয়ে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের হাতে বিকল্প খুবই সীমিত এবং লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ আমদানির পাশাপাশি আমদানির প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত চার্জ, সঞ্চালন ব্যয়, মুদ্রা বিনিময় হার এবং চুক্তির অন্যান্য শর্ত বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ আমদানি করা বাস্তবসম্মত হলেও এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো লাভজনক হতে পারে। বিশেষ করে ভারতকে এ ধরনের আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
শুধু চার্জ নয়, আরও খরচ আছে : বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে এসএনএ চার্জই একমাত্র অতিরিক্ত ব্যয় নয়। আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যে ট্রান্সমিশন চার্জ, সিস্টেম অপারেশন, শিডিউলিং, ডেভিয়েশন, রিঅ্যাকটিভ এনার্জি এবং অন্যান্য গ্রিডসংশ্লিষ্ট চার্জও প্রযোজ্য হতে পারে। ভারতের বিধিমালায় এসএনএর মাধ্যমে এসব হিসাব নিষ্পত্তির কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এ কারণে বিদ্যুতের ক্রয়মূল্যের সঙ্গে সব ধরনের আনুষঙ্গিক ব্যয় যোগ করেই বাংলাদেশের প্রকৃত আমদানি ব্যয় হিসাব করতে হবে। সাম্প্রতিক তথ্যও বলছে, ভারতের বিভিন্ন উৎস থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দামে বড় পার্থক্য রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনভিভিএন থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় ৭ টাকা ৫৮ পয়সা, যেখানে আদানি পাওয়ারের বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল ১৪ টাকা ৮৬ পয়সা। অর্থাৎ বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে শুধু চুক্তিতে উল্লেখ করা বিদ্যুতের দাম নয়, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব চার্জ ও আর্থিক দায় বিবেচনা করা জরুরি।