রাজস্ব আদায়ে মরিয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নতুন পথে হাঁটছে। সিমেন্ট, সিগারেট, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ও এমএস প্রোডাক্ট (রড, ঢেউটিন)-প্রাথমিকভাবে এই ৪ খাতের মার্কেট লিডারদের ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য বিক্রয়ের তথ্য বিশ্লেষণ শুরু করেছে সংস্থাটি। উদ্দেশ্য হচ্ছে-শীর্ষ কোম্পানিগুলো যথাযথভাবে রাজস্ব দিচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা। পর্যায়ক্রমে টয়লেট্রিজ ও জুয়েলারিসহ অন্য শিল্পের ডাটাও বিশ্লেষণ করা হবে। দায়িত্বশীল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ইতোমধ্যে এই ৪ খাতের ব্যবসায় জড়িত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যের মার্কেট শেয়ার ও রাজস্ব পর্যালোচনার জন্য এনবিআর-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব ভ্যাট বাস্তবায়নের সদস্য সৈয়দ মুসফিকুর রহমানকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। এ কমিটি গত ১৬ জুলাই একটি বৈঠক করেছে। বৈঠকে কোম্পানিগুলোর পণ্যের ব্রান্ডের নাম, কাঁচামালের এইচএস কোড, আমদানি ও স্থানীয় পর্যায়ে সংগৃহীত উপকরণের তথ্য ছক আকারে দিতে মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
১৬ আগস্ট আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) মধ্যাহ্নভোজ সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী রাজস্ব আদায় বাড়ানোর এই পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে রাজস্ব দিচ্ছে কি না-সেটিও মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হবে। এজন্য খাতভিত্তিক মার্কেট শেয়ার হিসাব করে কে কত টাকা রাজস্ব দিচ্ছে, তাও পরিমাপ করা হবে। ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সহনীয় হারে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা হবে। এজন্য ডাটাবেজও তৈরি করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, সিমেন্ট শিল্প নিয়ে বৈঠকে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। কেননা কমিটির সব সদস্য এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছে যে, সিমেন্ট উৎপাদনের প্রধান উপকরণ ক্লিংকার আমদানির সঙ্গে প্রদেয় ভ্যাটের বড় গড়মিল আছে। গত ৩ অর্থবছরে যত ক্লিংকার আমদানি হয়েছে, সে অনুপাতে সরকার রাজস্ব পায়নি। তাই ব্যবসার পরিধি যাচাইয়ে ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ক্লিংকার আমদানি তথ্য পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একইভাবে সিগারেট ব্যবসার মার্কেট শেয়ার যাচাইয়ের ভিত্তি হিসাব করতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে নাম, এইচএস কোডসহ ব্যবহৃত কাঁচামালের নাম, আমদানি ও স্থানীয় পর্যায়ে সংগৃহীত কাঁচামালের তথ্য চাওয়া হবে। সিগারেটের তথ্য বিশ্লেষণ করা হলেও বিড়ি বাদ দেওয়া হয়েছে।
পানি, এনার্জি ড্রিংকস, কার্বোনেটেড ড্রিংকস, নন-কার্বোনেটেড ড্রিংকস-এই ৪ ক্যাটাগরিতে ফুড অ্যান্ড বেভারেজের মার্কেট শেয়ার ও রাজস্বের তথ্য যাচাই করা হবে। এসএম প্রোডাক্টের মধ্যে রড, ঢেউটিন ও প্রি-ফেব্রিকেটেড অবকাঠামো তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা, এইচএস কোডসহ ব্যবহৃত কাঁচামালের নাম, আমদানি ও স্থানীয় পর্যায়ে সংগৃহীত কাঁচামালের তথ্য চাওয়া হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিটির এক সদস্য যুগান্তরকে বলেন, মার্কেট শেয়ার যাচাইয়ের মাধ্যমে বড় করপোরেটের রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটন অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। রাজস্ব খাতে এটি এ যাবৎকালে এনবিআর-এর যুগান্তকারী পদক্ষেপ হয়ে থাকবে। কাজটি যথাযথভাবে শেষ করতে পারলে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। কারণ তখন চাইলেও কেউ রাজস্ব ফাঁকি দিতে পারবে না।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, করপোরেট কোম্পানিগুলোর মার্কেট শেয়ার ও রাজস্ব প্রদানের তথ্য যাচাই এনবিআর-এর যুগান্তকারী উদ্যোগ হতে পারে। এর মাধ্যমে কত টাকা রাজস্ব আদায় বাড়বে, না কমবে-সেটি মুখ্য নয়; এটি ব্যবসায় সুস্থ প্রতিযোগিতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষমতা তৈরি করবে। যেমন : বর্তমানে একই প্রকৃতির ব্যবসা করে দুটি প্রতিষ্ঠান ১ কোটি টাকার কাঁচামাল আমদানি করে একটি ৪ কোটি টাকার এবং অন্যটি ২ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন করছে। এতে বাজারে অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। এই অসম প্রতিযোগিতায় পড়ে অনেক শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে। তবে মার্কেট শেয়ার ও রাজস্ব প্রদানের তথ্য যাচাই অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হতে হবে। এটি যেন নতুন হয়রানির হাতিয়ার না হয়, সেদিকে এনবিআর-এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের খেয়াল রাখতে হবে।
তামাকবিরোধী সংস্থা বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসির (বিএনটিটিপি) কারিগরি কমিটির সদস্য সুশান্ত সিনহা বলেন, মার্কেট যাচাই করে সিগারেট খাতে রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটন সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। অথচ নজরদারি বাড়ানোর মাধ্যমে এ খাত থেকে আরও ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব। যেমন : বাজেটে ২০ শলাকা প্রিমিয়াম সিগারেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৪২০ টাকা, অর্থাৎ প্রতি শলাকার দাম ২১ টাকা নির্ধারণ করা হয়। অথচ বাজারে কোম্পানিগুলো প্রতি শলাকা ২৩ টাকা করে বিক্রির নির্দেশ দিয়েছে। এজন্য প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপনও দিচ্ছে কোম্পানি, যা এনবিআরসহ সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। বাড়তি ২ টাকা বিক্রি করায় সরকার প্রতি শলাকা সিগারেটে ১ টাকা ৬৬ পয়সা রাজস্ব হারাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাজেট পাশের আড়াই মাস অতিবাহিত হলেও পুরোনো দামের সিগারেট বাজারে নতুন দামে বিক্রি করছে সিগারেট কোম্পানিগুলো। এ সিগারেটগুলো আগে উৎপাদন করে মজুত করে রেখেছে কোম্পানিগুলো। বাজেটে দাম বাড়ার পর যা বাজারে সরবরাহ করা হয়। যা প্রতিষ্ঠানগুলো মাসভিত্তিক উৎপাদনের তথ্য যাচাই করলেই বেরিয়ে আসবে।