উচ্চশিক্ষার জন্য মাত্র ২৩ বছর বয়সে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিয়েছিলেন বাংলাদেশের সৈয়দ মোহাম্মদ রব্বানী। কিন্তু একটি হত্যাকাণ্ডের মামলায় যুক্তরাষ্ট্রে তার জীবন থেমে যায়। ১৯৮৮ সালে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর প্রায় ৩৫ বছর ধরে এখন টেক্সাসের কারাগারে বন্দি তিনি।
প্রায় তিন দশক ধরে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ আপিল আদালতে অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে ছিল। ২০২২ সালে সেই আবেদন আবার সামনে আসে। পরে টেক্সাসের সর্বোচ্চ ফৌজদারি আপিল আদালত তার মৃত্যুদণ্ড বাতিলও করেন। তবে হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত থাকায় মামলার অগ্রগতি হয়নি।
জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে তাকে প্যারোলে মুক্তির সুযোগসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। টেক্সাসের সরকারি কারা নথিতেও এই তথ্য রয়েছে। ২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৬০ বছর বয়সি রব্বানী টেক্সাসের ডিকিনসনের ক্যারোল ইয়ং কারাগার ইউনিটে বন্দি আছেন। তিনি বর্তমানে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ চিকিৎসাসেবা বা হসপিস সেবা পাচ্ছেন। তার প্যারোলের আবেদনও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তার আইনজীবী বেঞ্জামিন উলফের ভাষ্য, অভিবাসনগত অবস্থানের কারণে চিকিৎসাজনিত বিশেষ মুক্তির একটি সুযোগও তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হচ্ছে না।
হিউস্টনে শুরু সেই হত্যা মামলা : ঘটনার শুরু ১৯৮৭ সালের ১ নভেম্বর। হিউস্টনের একটি কুইক-এন-ইজি নামের সুবিধাজনক পণ্যের দোকানে গুলিতে নিহত হন বাংলাদেশি অভিবাসী মোহাম্মদ জাকির হাসান। রব্বানীর বিরুদ্ধে তাকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়। মামলার নথি ও পরবর্তী সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসান ছিলেন রব্বানীর পূর্বপরিচি। ১৯৮৮ সালে হ্যারিস কাউন্টির একটি জুরি রব্বানীকে মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। তার কারাবন্দি নম্বর ৯১০।
মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে রব্বানীর সরাসরি আপিল যায় টেক্সাসের সর্বোচ্চ ফৌজদারি আপিল আদালতে। ১৯৯২ সালে আদালত তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। পরে ১৯৯৪ সালে রব্বানীর পক্ষে তার মৃত্যুদণ্ডের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি আবেদন করা হয়। কিন্তু আবেদনটি স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়ায় এগোয়নি।
রব্বানীর মামলার ওপর অনুসন্ধান চালানো হিউস্টন ল্যান্ডিং ও পরে টেক্সাস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে জানা যায়, হ্যারিস কাউন্টির আদালতে শতাধিক পুরোনো ফৌজদারি আপিল বছরের পর বছর পড়ে ছিল। রব্বানীর আবেদনও সেগুলোর মধ্যে ছিল।
রব্বানীর পক্ষে থাকা আইনজীবী ডিক হুইলান ২০০৮ সালে মারা যান। এরপর আরেক আইনজীবীকে তার পক্ষে নিয়োগ দেওয়া হলেও আইনি কার্যক্রম এগোয়নি। প্রায় তিন দশক পর ২০২২ সালে রব্বানীর সেই পুরোনো আবেদন আবার সামনে আসে। ততদিনে রব্বানীর বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। ১৯৮৮ সালে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া তরুণ রব্বানীর ৩৫ বছর পর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক অবনতি ঘটে।
টেক্সাসের কারা চিকিৎসকদের নথিতে উল্লেখ আছে, রব্বানী এখন গুরুতর মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন। তিনি সিজোফ্রেনিয়া ও সিজোঅ্যাফেকটিভ ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত।
পরিবারের সঙ্গে বহু বছর বিচ্ছিন্ন : ১৯৯৫ সালে রব্বানীর বাবার মৃত্যুর পর বাংলাদেশে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলে আইনজীবীদের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর প্রায় তিন দশক ধরে রব্বানীর কোনো খোঁজ জানত না তার পরিবার।
২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত হিউস্টন ক্রনিকলের প্রতিবেদনে রব্বানীর বর্তমান অবস্থার কথা আবার সামনে আসে। ৬০ বছর বয়সি রব্বানী এখন টেক্সাসের কারাগারে হসপিস সেবা পাচ্ছেন। তার আইনজীবী বেঞ্জামিন উলফের মতে, অভিবাসনগত অবস্থানের কারণে রব্বানীর মুক্তির আর সুযোগ নেই।