কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপকূলের জলবায়ু-পীড়িত, দরিদ্র মানুষগুলোর দিন কাটে নিত্য অভাবের সঙ্গে লড়াই করে। চরম সেই অসহায়ত্ব আজ তাদের দাঁড় করিয়েছে এক মারাত্মক আইনি বিপর্যয়ের মুখে। সামান্য একটু ত্রাণের আশায় একটি আঙুলের ছাপ দিয়ে আজ নিজ দেশেই ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় নিয়ে আইনি সংকটে আটকে পড়েছেন ৫ শতাধিক স্থানীয় বাংলাদেশি। ২০১৭ সালের দিকে মিয়ানমার থেকে আসা লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢলে যখন উখিয়া-টেকনাফ ভেসে যাচ্ছিল, তখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দেওয়া ত্রাণের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন চরম অভাব অনটনে থাকা স্থানীয় ভুখা মানুষও। পাহাড়ি জঙ্গল, নদীভাঙন আর চরম দারিদ্র্যে দিশেহারা সেসব পরিবারের কাছে চাল-ডাল-তেলের এক প্যাকেট ত্রাণ ছিল জীবন বাঁচানোর একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু বেঁচে থাকার এই ন্যূনতম আকুতির মুহূর্তেই নিঃশব্দে তৈরি হয় চিরদিনের আইনি ফাঁদ। কীভাবে কিংবা কীসের খাতায় তাদের নাম উঠছে, তা বোঝার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা সচেতনতা ছিল না এসব মানুষের। শুধু পেটের খিদে মেটাতে লাইনে দাঁড়িয়ে দেওয়া একটি আঙুলের ছাপই আন্তর্জাতিক ডাটাবেজে তাদের স্থায়ীভাবে ‘রোহিঙ্গা’ বানিয়ে দেয়। ফলশ্রুতিতে আজ নিজেদের পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিতে গিয়ে থমকে যাচ্ছেন তারা।
লজ্জার আড়ালে চাপা পড়া হাজারো আকুতি : বাংলাদেশি হয়ে রোহিঙ্গা পরিচয় বহন করা এমন বহু পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়, যারা নিজেদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। সমাজ আর প্রতিবেশীদের কাছে ‘রোহিঙ্গা’ হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার তীব্র লজ্জায় তারা আড়ালেই থেকে যেতে চান। উখিয়ার এক দুর্গম গ্রামের ৬৫ বছরের এক দিনমজুর, তিনি নিজের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে অশ্রুসজল চোখে জানান সেই দিনগুলোর কথা। ‘‘ঘরে তখন চাল ছিল না, ছোট বাচ্চা দুটো খিদের জ্বালায় কাঁদছিল। ক্যাম্পের পাশে ত্রাণের বড় বড় গাড়ি দেখে আমরা পাড়ার কয়েকজন মানুষ কৌতূহল আর পেটের তাগিদে লাইনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। তারা ছবি তুলল, মেশিনে আঙুলের ছাপ নিল আর আমাদের হাতে একটা রেশনের কার্ড দিল। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো গরিবদের সাহায্য করা হচ্ছে। এক-দুই বেলা দুমুঠো ভাতের আশায় দেওয়া ওই ছবি আর আঙুলের ছাপ যে আমাদের আজীবনের জন্য ‘রোহিঙ্গা’ বানিয়ে দেবে, তা জানলে বিষ খেয়ে মরে যেতাম, তবু ওই লাইনে দাঁড়াতাম না।’’
ছেনুয়ারা বেগমের গল্প : টেকনাফের নয়াপাড়া শিলখালী গ্রামের ৪৬ বছর বয়সি ছেনুয়ারা বেগম জন্মসূত্রে বাংলাদেশি। তার কাছে নিজের আসল এনআইডি কার্ড রয়েছে। ২০১৭ সালের সেই উত্তাল সময়ে তিনি রোহিঙ্গা ত্রাণ কার্ডের জন্য বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করেন, যেখানে তার নাম দাঁড়ায় ‘রহিমা’। আজ সেই এক প্যাকেট চালের বিনিময়ে দেওয়া আঙুলের ছাপ তার জীবনকে স্থবির করে দিয়েছে। এক দেহে দুই পরিচয় নিয়ে ছেনুয়ারা বেগম এখন নিজ জন্মভূমিতেই যেন এক ‘ছায়ামানব’।
খেলার ছলে দেওয়া আঙুলের ছাপে নিষ্পাপ শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকারে : উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী তার এলাকার ১১ বছরের শিশু গুরার (গুরায়া) করুণ উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি জানান, গুরায়ার বাবা বিশার আহমদ আর মা লায়লা বেগম-দুজনেই জন্মসূত্রে নিখাদ বাংলাদেশি। গুরায়া যখন আরও ছোট, ক্ষুধা আর অবুঝ বয়সের কারণে পাড়ার অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে ত্রাণ নেওয়ার লাইনে গিয়ে দাঁড়ায়। খেলার ছলেই বায়োমেট্রিক মেশিনে আঙুলের ছাপ দিয়ে ফেলেছিল। আজ এত বছর পর ছেলেটা যখন পাসপোর্টের আবেদন করতে গেল, ডাটাবেজ তাকে দেখাচ্ছে ‘নিবন্ধিত রোহিঙ্গা’। এভাবে একটা পুরো শিশুর ভবিষ্যৎ থমকে গেল। চেয়ারম্যান আফসোস করে বলেন, কেবল তার এলাকা থেকেই ৭০ জনের বেশি মানুষ দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না।
যা বলছে প্রশাসন : বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, উখিয়া-টেকনাফের চরম দারিদ্র্যপীড়িত ৩০০ জন বা তারও বেশি বাংলাদেশি নাগরিক কেবল ত্রাণের আশায় ও সঠিক তথ্যের অভাবে রোহিঙ্গা ডাটাবেজে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তারা কোনো চক্রান্তের অংশ ছিলেন না, বরং তাদের নিরক্ষরতা ও দারিদ্র্যের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এখন তারা জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট নিতে গিয়ে চরম আইনি সংকটে পড়ছেন। যেহেতু এটি আন্তর্জাতিক ডাটাবেজের বিষয়, তাই এই তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। অনেকে রোহিঙ্গা নারী বিয়ে করে ইতোমধ্যে নোয়াখালীর ভাসানচরে গিয়ে বসবাস করছেন বলে জানান তিনি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, রোহিঙ্গা কার্ড বাতিল করে নিজেদের বাংলাদেশি প্রমাণের জন্য আমি ইতোমধ্যে বেশ কিছু আবেদন পেয়েছি। এ সমস্যার একটি সহজ ও কার্যকর পথ বের করতে আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি এবং খুব শিগগিরই আরআরআরসির সঙ্গে বৈঠকে বসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।