রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সিলেটে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের দৃশ্যপট থেকে আওয়ামী লীগ উধাও হলেও স্বস্তি ফেরেনি সাধারণ মানুষের জীবনে। পরিবহণ, পাথর কোয়ারি, ফুটপাত ও সীমান্ত চোরাচালান-সবখানেই এখন নতুন করে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন বিএনপির কপিতপয় প্রভাবশালী নেতাকর্মী। শুধু চাঁদাবাজির ক্যাশ কাউন্টারে বসা মুখগুলো বদলেছে, বদলায়নি চাঁদাবাজির ধরন ও পরিমাণ। এসবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খোদ দলের ভেতরেই চলছে চরম কোন্দল, ঘটছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনাও। যদিও দলের শীর্ষ নেতারা দাবি করছেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেটের কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড এবং বন্দরবাজারের লেগুনা ও সিএনজিচালিত রিকশা স্ট্যান্ডগুলো এখন বিএনপি ও ছাত্রদলের একাংশের হাতে। এসব এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মে মাসে সরকারপন্থি পরিবহণ শ্রমিক দলের শীর্ষ দুই বলয় (সিলেট জেলা সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি হাজী মইনুল ইসলাম এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা ও সিলেট জেলা বাস-মিনিবাস-কোচ-মাইক্রোবাস পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজন) লাঠিসোঁটা ও রামদা নিয়ে দক্ষিণ সুরমায় সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ ঘটনায় রিপন আহমেদ ও দেলোয়ার হোসেন নামের দুইজন নিহত হন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ, গোয়াইনঘাটের জাফলং ও কানাইঘাটের লোভাছড়া পাথর কোয়ারিগুলো পরিবেশগত কারণে বন্ধ থাকলেও বালু ও পাথর চুরির সিন্ডিকেট সক্রিয়। কোয়ারির দখল নিয়ে বিএনপির একাধিক পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্য মহড়া ও অস্ত্রের প্রদর্শনীও দেখা গেছে। গত বছর জাফলংয়ের নয়নবস্তি ও বলাঘাটে জেলা বিএনপির যুগ্মসম্পাদক রফিকুল ইসলাম শাহপরান এবং সাবেক কোষাধ্যক্ষ শাহ আলম স্বপনের অনুসারীদের মধ্যে বড় ধরনের উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল।
জানতে চাইলে সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিউক) চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী যুগান্তরকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে কিছুটা বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। এখন সেই অবস্থা নেই। মাঝেমধ্যে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে বহু ক্ষেত্রে বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নাম ভাঙিয়ে অপরাধ ঘটানোর তথ্যও পাওয়া গেছে।
নগরীর ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে কয়েস লোদী বলেন, বর্তমানে সিলেটে ছিনতাই, চাঁদাবাজি বা বখাটেপনা নেই বললেই চলে। ফুটপাত সম্পূর্ণ হকারমুক্ত রাখা হয়েছে।
তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মদিনা মার্কেট, আম্বরখানা, জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, সুরমা নদীর তীর, কাজীবাজার সেলফি ব্রিজ, উপশহর, শাহী ঈদগা, টিলাগড়, মেজরটিলা ও ইসলামপুরসহ সিলেট মহানগরীর অলিগলির ফুটপাতগুলো এখন ছাত্রদল ও যুবদলের কিছু নেতাকর্মীর নিয়ন্ত্রণে। একেকটি চৌকি বসানো বাবদ এককালীন ও দৈনিক নির্দিষ্ট হারে চাঁদা আদায় করছেন তারা। এছাড়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকেও চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, উপশহর, শিবগঞ্জ ও টিলাগড় এলাকায় আওয়ামী লীগের একাধিক অফিস ও বাড়ি দখলের ক্ষেত্রে সিলেট মহানগর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক উমেদুর রহমান উমেদের নাম বেশি আলোচিত। ৫ আগস্টের পর তিনি নিজের একটি বিশাল বাহিনী গড়ে তোলেন এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের ফেলে যাওয়া একাধিক কার্যালয় নিয়ন্ত্রণে নেন। ভারত থেকে আসা চোরাই চিনির ট্রাক আটকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে উমেদ বাহিনীর বিরুদ্ধে। তবে নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে উমেদ যুগান্তরকে বলেন, আমি একজন সাচ্চা রাজনীতিবিদ। রাজনীতি করতে গিয়ে অতীতে অনেক হামলা মামলার স্বীকার হয়েছি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সব মামলা থেকে রেহাই পেয়েছি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সিলেট মহানগরীর উপকণ্ঠ মেজর টিলা বাজার এলাকায় বাণিজ্যিক পয়েন্টের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে দুই পক্ষ। এরই অংশ হিসাবে গত বছরের ১ এপ্রিল মাঝরাতে সিলেট জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক সিদ্দিকী এবং স্থানীয় যুবদল কর্মী কবীর গ্রুপের নেতাকর্মীরা পুরো এলাকার আলো নিভিয়ে টর্চলাইট ও মোবাইলের ফ্লাশ লাইট জ্বালিয়ে দেশীয় অস্ত্র ও লোহার রড নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
একই বছরের ২৬ মার্চ গভীর রাতে সিলেট সীমান্তে ভারত থেকে অবৈধ উপায়ে আসা চোরাই মহিষের একটি বড় চালান জব্দ করে সেনাবাহিনীর টহল দল। ওই সময় চোরাকারবারিরা ইটপাটকেল ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেনাবাহিনীর ওপর হামলা চালায়। এ ঘটনার মদদদাতা হিসাবে জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুর রশিদকে চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে তার বাড়িতে অভিযানও চালায় যৌথ বাহিনী।
গত বছরের অক্টোবরে সিলেট-২ আসনের আধিপত্য নিশ্চিত করতে বিশ্বনাথ বাজারে বিএনপির দুই হেভিওয়েট বলয়ের অনুসারীরা প্রকাশ্য দিবালোকে ধারালো অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায়।
সূত্র আরও জানায়, বিএনপি নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় সিলেট নগরীর শাহী ঈদগাহ এলাকার প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফ খান সাদেকের বাসা জোর করে দখল করে রেখেছে যুবলীগ নেতা মুকিত। সিলেট নগরীর শামীমাবাদ আবাসিক এলাকায় যুক্তরাজ্য প্রবাসী আলম বেগের পাঁচতলা ‘মাতৃমহল’ ভবনটি ২০০৮ সাল থেকে এক ছাত্রলীগ নেতার দখলে ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এটি দখল করেন মহানগর ছাত্রদলের স্কুলবিষয়ক সম্পাদক এস এম ফাহিম। গত বছরের ১ জুলাই পুলিশ অভিযান চালিয়ে বাড়িটি উদ্ধার করে মালিকের কাছে হস্তান্তর করে।
সিলেট প্রেস ক্লাবে এক সংবদ সম্মেলনে আবাসন প্রতিষ্ঠান শাহপরান রয়েল সিটি প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক আলী আশরাফ খান মাছুম অভিযোগ করেন, গণঅভ্যুত্থানের পর সিলেট মহানগরীর শাহপরাণ এলাকায় সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে তার কোম্পানির জায়গা জোরকরে দখলে নেন সিলেট জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান পাপলু। শুধু তাই নয়, পাপলু বেশকিছু মামলা দিয়ে মাছুমকে হয়রানি করছেন বলেও অভিযোগ করেন। ওই সংবাদ সম্মেলনের এক সপ্তাহের মধ্যে মাছুম মারা যান। গত ২৯ জানুয়ারি অপর এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাজ্য প্রবাসী শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক পরিচয়ে মিজানুর রহমান দক্ষিণ সুরমার লাউয়াই গ্রামে তার (শহিদুল) ২৩ শতক বসতভিটা ও জমি দখল করে নিয়েছেন। তবে পাপলু ও মিজান দুইজনই তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শাহপরান থানার শিবগঞ্জ বাজারের কিচেন মার্কেটের পাশে এক সংখ্যালঘু পরিবারের ৬২ শতক সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে একটি প্রভাবশালী চক্র। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের এক সদস্য বলেন, ২০০৮ সাল থেকে আমরা আদালতে লড়াই করছি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমরা নিপীড়িত ছিলাম। বর্তমান সরকারের আমলে মাটির সঙ্গে মিশে গেছি। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দখলদার সাবেক কাউন্সিলর এলাকা ছেড়ে পালালেও এখন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের ক্যাডাররা প্রতিনিয়ত ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে।
এক যুবদল নেতার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ২০নং ওয়ার্ডের শাহপরান থানা এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ও প্রাচীন ‘শ্রী শ্রী গোপাল জিউ মন্দির’-এর প্রায় ৪ একর দেবোত্তর সম্পত্তি আওয়ামী ক্যাডারদের দখলে ছিল। বর্তমানে বিএনপির একাধিক গ্রুপ ওই সম্পত্তি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
এসব বিষয়ে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলের অভিযোগ পাওয়া মাত্রই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিএনপি সব সময় নীতি ও আদর্শের রাজনীতিতে বিশ্বাসী উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থা, দলীয় উৎস ও গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি। গত দুই বছরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে অন্তত ১২ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে যাদের বিরুদ্ধে: জাফলং পাথর কোয়ারি ও বালুমহাল থেকে অবৈধভাবে পাথর ও বালু লুটপাটের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় গত ১৪ অক্টোবর সিলেট জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম শাহপরানের পদ স্থগিত করা হয়। কোয়ারি এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত থাকায় জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য আব্দুল্লাহ আল মামুন পারভেজকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে ভারত থেকে আসা চোরাই চিনির ট্রাক আটকে চাঁদাবাজি এবং মালামাল ছিনতাইয়ের অভিযোগে ২৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান ও ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সুলেমান হোসেন সুমনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
সিলেট নগরীর বিভিন্ন ব্যস্ততম এলাকার ফুটপাত দখল এবং হকারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মহানগর যুবদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জয়দেব চৌধুরী মাধবকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ওসমানীনগরে প্রবাসীর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে গত বছরের ১৪ জুন দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে সিলেট জেলা যুবদলের সদস্য ও ওসমানীনগর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আহবাবুল হোসেনকে। এছাড়াও বিভিন্ন অভিযোগে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের আরও বেশকিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।