Image description
গত এপ্রিল - মে মাসে জ্বালানিসংকটের সময় প্রতিষ্ঠান চালু রাখতে হিমশিম খাচ্ছিল ফসল অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ নামের মানিকগঞ্জের একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগ । ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে কার্যক্রম চালানোর খরচ কুলিয়ে উঠতে পারছিল না কর্তৃপক্ষ । সমাধান খুঁজতে গিয়ে সম্ভাবনাময় এক বিকল্পের দেখা পেয়েছে ফসল অ্যাগ্রো । সৌরবিদ্যুতের প্যানেল আর বিদ্যুৎ ‘ সঞ্চয়ের জন্য ’ লিথিয়াম ব্যাটারি স্টোরেজ বসিয়ে লোডশেডিংয়ের তুলনামূলক সাশ্রয়ী সমাধান করেছে প্রতিষ্ঠানটি । দেশে বিদ্যুতের বিদ্যমান উচ্চ মূল্য হ্রাস , জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতে সৌরবিদ্যুতের অংশ বৃদ্ধি এবং সঞ্চালন লাইনের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার লিথিয়াম ব্যাটারি উৎসাহিত করছে । 
তুলনামূলক সাশ্রয়ী এই প্রযুক্তি কয়েক বছর আগে থেকে দেশে আসতে শুরু করেছে । তবে চলতি অর্থবছরের বাজেটে বড় শুল্কছাড়ের কারণে এর ব্যবহার অনেকটাই বাড়বে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা । মানিকগঞ্জের ফসল অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ভবনের ছাদে ৩০ কিলোওয়াটের সৌর প্যানেল বসিয়েছে । এ ছাড়া নিচের একটি কক্ষে বসানো হয়েছে ৪৬ কিলোওয়াটের লিথিয়াম ব্যাটারি স্টোরেজ । কীটনাশক প্যাকেজিং ও বিপণন কোম্পানি ফসল অ্যাগ্রোর কর্মকর্তা মনি লাল দাস আজকের পত্রিকাকে জানান , ফসল অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের একটি বাণিজ্যিক এবং একটি শিল্পসংযোগের জন্য মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে । 
ব্যাটারি স্টোরেজ স্থাপন করে রেশনিংয়ের ফলে এই খরচ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় নেমে আসবে বলে আশা করছেন তাঁরা । ডিজেল জেনারেটর চালালে এক ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ৩৫ থেকে ৪০ টাকা হারে খরচ হয় । লিথিয়াম ব্যাটারির দাম তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও এর বিদ্যুৎ স্টোরেজ ক্ষমতা ও স্থায়িত্ব তুলনামূলক বেশি । নবায়নযোগ্য জ্বালানি অ্যাসোসিয়েশন ( বিএসআরইই ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন , ‘ বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি , লোডশেডিং , তেলের মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাটারি স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বাড়ানো

লোডশেডিং মোকাবিলা » লিথিয়াম ব্যাটারির দামের পাশাপাশি ক্ষমতা ও স্থায়িত্ব বেশি । » ২০২১-২২ সালে বড় লিথিয়াম ব্যাটারি আমদানি শুরু । » দেশেই উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে বড় আমদানিকারকেরা । » ব্যাটারি স্টোরেজ নিয়ে অচিরেই গাইডলাইন তৈরি করবে সরকার ।

জরুরি । স্মার্ট গ্রিড না থাকলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি , বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের প্রকল্প বাড়ানো মুশকিল । সাশ্রয়ের জন্য আগামী দিনে ব্যাটারি স্টোরেজই ডিজেল জেনারেটরের স্থলাভিষিক্ত হবে । ' বিএসআরইই সভাপতি আরও বলেন , সরকার ব্যাটারি স্টোরেজ বাড়াতে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে , বাড়াতে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে , সেগুলো দেশের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির জন্য খুবই ইতিবাচক । তাঁদের ধারণা , এই বাজেটের পর একটা বড় ধরনের ‘ ব্যাটারি বিপ্লব ' ঘটবে । চলতি অর্থবছরে দুই হাজার মেগাওয়াট ব্যাটারি স্টোরেজ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে ।

লেড অ্যাসিড থেকে লিথিয়াম আয়ন খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে , ২০১৪-১৫ সালে সরকার দেশের কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে সৌর প্যানেল বসিয়ে মিনি গ্রিড চালু করে । সেই সময় সৌরবিদ্যুৎ

সংরক্ষণ ও সূর্যাস্তের পর সরবরাহের জন্য লেড অ্যাসিড ব্যাটারির সংযোগে ৭০ থেকে ৮০ কিলোওয়াটের স্টোরেজ চালু করা হয়েছিল । এ জন্য বিশাল জায়গাজুড়ে ২০০ থেকে ৫০০ ব্যাটারি ব্যবহার করা হতো । ২০২১-২০২২ সাল থেকে দেশে বড় আকৃতির লিথিয়াম ব্যাটারি আমদানি শুরু হয় । মূল উৎস চীন , দেশেও তৈরি শুরু ‘ রেয়ার আর্থ ’ বা বিরল ধাতু লিথিয়াম ব্যবহার করে তৈরি হয় লিথিয়াম ব্যাটারি । বিশ্বে এর ৯০ শতাংশই উৎপাদিত হয় চীনে । আমদানি হওয়া ব্যাটারির প্রায় শতভাগই চীন থেকে আসে । অন্যতম আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান রহিমআফরোজের শীর্ষ কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন , চীনে বিওয়াইডি , হুয়াওয়েসহ অন্তত ৩০ টি কোম্পানি লিথিয়াম ব্যাটারি সেল তৈরি করে । সেই সেল ব্যবহার করে হাজার হাজার কোম্পানি দেশটিতে লিথিয়াম ব্যাটারি তৈরি করছে । বাংলাদেশেও রহিমআফরোজ , ওয়ালটন , সুপার স্টারসহ ৩০-৪০টি কোম্পানি আগামী ৬ মাসের মধ্যে লিথিয়াম ব্যাটারি প্রস্তুত করতে যাচ্ছে । মনোয়ার হোসেন জানান , কয়েক বছর আগে এক কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি লিথিয়াম ব্যাটারির দাম ৫০ হাজার টাকা থাকলেও এখন তা ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় নেমেছে । সরকার শুল্ক সুবিধা দেওয়ায় দাম আরও কমবে ।

সাশ্রয়ী বলে দাবি

রহিমআফরোজের কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন বলেন , লোডশেডিংয়ে বিকল্প বিদ্যুৎ হিসাবে ডিজেল জেনারেটরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ৩০ থেকে ৪০ টাকা । সে ক্ষেত্রে ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেম ব্যবহার করে লোডশেডিং ব্যবস্থাপনায় খরচ হবে ইউনিটপ্রতি মাত্র ৫ থেকে ৬ টাকা । অর্থাৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা মূল্যের গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যাটারি স্টোরেজে নিয়ে ব্যবহার করলে মোট খরচ হবে ১৬ টাকা , সৌরবিদ্যুৎ স্টোরেজে ব্যবহার করলে খরচ পড়বে ১০ থেকে ১২ টাকা । লিথিয়াম ব্যাটারির আরও কিছু সুবিধা জানিয়ে তিনি বলেন , এটি একবার কিনলে ১০- ১৫ বছর রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয় না ।

ডিজেল জেনারেটরের বিকল্প শেষ পৃষ্ঠার পর চার্জ শেষ হতে কত সময় লাগবে লিথিয়াম ব্যাটারিতে তা দেখা যায় । এটি অ্যাসিড ব্যাটারির চেয়ে ওজনে অর্ধেক কম । সুপার স্টার গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তা তোফায়েল আহমেদ বলেন , “ আমরা লিথিয়াম ব্যাটারিতে পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছি । আগামী ছয় মাসের মধ্যে চীন থেকে লিথিয়াম সেল এনে বাংলাদেশে ব্যাটারি উৎপাদন করবে সুপার স্টার । ’ তোফায়েল আহমেদ জানান , বর্তমানে দেশের বাজারে ১২ ভোল্ট ১০০ অ্যাম্পিয়ার একটি লেড অ্যাসিড ব্যাটারির দাম ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে । একই সক্ষমতার লিথিয়াম ব্যাটারির দাম ২৮ হাজার থেকে ৩৪ হাজার টাকা পর্যন্ত । দেশে লিথিয়াম ব্যাটারির বিক্রি ও সরবরাহ এখনো খুব প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও আগামীতে ছবিটা বদলে যাবে বলে ধারণা এই উদ্যোক্তাদের ।

ইতিবাচক অবস্থানে সরকারও টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ( স্রেডা ) চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন , ‘ সরকার ব্যাপক শুল্কছাড় দেওয়ার ফলে এই খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটবে । আমরা ব্যাটারি স্টোরেজ এনার্জি স্থাপনের জন্য অচিরেই একটি গাইডলাইন প্রকাশ করব । ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থা এগিয়ে গেলে আমাদের বিদ্যুৎ - সংকট অনেকখানি কমে যাবে । ' এত দিন সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি স্টোরেজ সামগ্রীর ওপর গড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ কর ছিল । এটি কমে ১০ থেকে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে । আর সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য কেউ লিথিয়াম ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট সামগ্রী আমদানি করলে শুল্ক সুবিধা আরও বাড়বে । বিদ্যুৎসচিব মিরানা মাহরুখ আজকের পত্রিকাকে বলেন , “ আগামী দিনে ব্যাটারি স্টোরেজ ক্যাপাসিটি

বাড়াতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নেবে । এখন থেকে যেসব সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হবে , সেগুলো ব্যাটারি স্টোরেজ ক্যাপাসিটি ছাড়া হবে না । ফলে চলতি বছরে আমাদের স্টোরেজ ক্যাপাসিটি অনেক বাড়বে । ' ব্যাটারি স্টোরেজের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সরকারের এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন , সরকার পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে । সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প একটা বড় বিকল্প । কিন্তু সেখানে মাত্র ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায় । লম্বা সময় ধরে সেবা পেতে স্টোরেজ ব্যবস্থা বাড়াতে হবে ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ( বুয়েট ) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক জিয়াউর রহমান খান আজকের পত্রিকাকে বলেন , এত দিন মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসে লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করা হতো । এখন যানবাহন , স্টোরেজ সিস্টেমসহ বড় আকারে লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার হচ্ছে । আরও অনেক আধুনিক প্রযুক্তি সামনে এলেও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত লিথিয়াম ব্যাটারিই বেশি প্রযোজ্য হচ্ছে । কারণ , অন্য সব ব্যাটারির তুলনায় এই ব্যাটারি অধিক টেকসই । 

পরিবেশগত বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অধ্যাপক জিয়াউর রহমান খান বলেন , ল্যাপটপ ও মোবাইলে ব্যবহৃত ব্যাটারিগুলো এখন ইলেকট্রনিক বর্জ্য হিসেবে মারাত্মক পরিবেশদূষণের ঝুঁকি তৈরি করেছে । তবে লিথিয়াম ব্যাটারির আয়ুষ্কাল অন্তত ১০ বছর হওয়ায় আর বড় আকারের ব্যাটারিগুলো অল্প দিন আগে দেশে আসায় আপাতত লিথিয়াম ব্যাটারির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ নেই । সার্বিকভাবে ইলেকট্রনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে অভিমত দিয়ে অধ্যাপক জিয়াউর রহমান বলেন , সরকারের অচিরেই এ বিষয়ে নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন ।