দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে একটা বড় অংশই এখন বেকার। দীর্ঘদিন ধরেই বেকারত্ব বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা। উচ্চশিক্ষা শেষ করে বেশির ভাগই এখন সরকারি চাকরির জন্য অপেক্ষা করেন বছরের পর বছর। চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে অনেকের মধ্যে তৈরি হয়েছে হতাশা। অথচ এই উচ্চ বেকারত্বের মধ্যেও দেশে ৫ লাখের বেশি সরকারি পদ শূন্য রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫ লাখের বেশি পদ শূন্য থাকায় স্থানীয় প্রশাসন ও জনসেবামূলক কাজে এর প্রভাব পড়ছে। কোথাও কোথাও কাজে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। এর ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মক্ষম তরুণেরা বেকারত্বে ধুঁকছেন। দ্রুত সরকারি শূন্য পদ পূরণে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা থাকলেও বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীলরা জানান, সরকারি চাকরিতে পদ শূন্য হওয়া ও পদ পূরণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। কারণ প্রতিনিয়ত কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে যাচ্ছেন। আবার নিয়োগও চলছে। একই সঙ্গে নতুন পদ সৃষ্টিও হচ্ছে। তাই নিয়োগ কার্যক্রম জোরদার করা হলেও সব সময়ই অনুমোদিত পদের একটি অংশ খালি থাকবেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু চাকরির সংকট নয়, প্রশাসনিক কাঠামো ও শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলনও।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রণীত ‘স্ট্যাটিসটিকস অব সিভিল অফিসার্স অ্যান্ড স্টাফ-২০২৫’-এর খসড়া অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন বেসামরিক সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত ১৯ লাখ ৮৬ হাজার পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। অর্থাত্ ৫ লাখ ২২ হাজার পদ এখনো শূন্য। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্যের উপস্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনে মোট ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি সরকারি পদ শূন্য রয়েছে বলে জানান। যদিও পরিসংখ্যানটি ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেডভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, গ্রেড ১-৯ পর্যায়ে শূন্য রয়েছে ৬৮ হাজার ৮৮৪টি পদ, গ্রেড ১০-১২ পর্যায়ে ১ লাখ ২৯ হাজার ১৬৬টি, গ্রেড ১৩-১৬ পর্যায়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯টি এবং গ্রেড ১৭-২০ পর্যায়ে ১ লাখ ১৫ হাজার ২৩৫টি পদ।
এছাড়া অন্যান্য শ্রেণিতে আরো ৮ হাজার ১৩৬টি পদ খালি রয়েছে। সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে গ্রেড ১৩-২০ পর্যায়ে, যা মাঠপর্যায়ের সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার শূন্য পদ পূরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুই বিষয়েই গুরুত্ব দিয়ে সরকার কাজ করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদে নিয়োগে যে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে, তা কমাতে কার্যকর উপায়ও খুঁজে দেখা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে ৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের চেষ্টা চলছে। গত ১০ জুন জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকারের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পদ খালি আছে, যেগুলো আরো গতিশীল করার জন্য, দেশের মানুষকে আরো সহজে সুবিধাজনকভাবে সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য কতগুলো নিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। দ্রুত সরকারি শূন্য পদ পূরণের প্রক্রিয়া শুরু করবে সরকার।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পদের সংখ্যা প্রতি বছরই বেড়েছে। সরকারি চাকরিতে ২০১০ সালে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৬৬৭টি, ২০১১ সালে ২ লাখ ৫৪ হাজার ২০৫টি, ২০১২ সালে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৯৬৪টি, ২০১৩ সালে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৫৮৭টি, ২০১৪ সালে ৩ লাখ ২ হাজার ৯০৪টি, ২০১৫ সালে ৩ লাখ ২৮ হাজার ৩১১টি, ২০১৬ সালে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ২৬১ এবং ২০১৭ সালে ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৮৯৭টি ছিল। ২০১৮ সালে ৩ লাখ ৯৩ হাজার ২৪৭টি, ২০১৯ সালে ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৩৩৮টি, ২০২০ সালে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৯৫৫ এবং ২০২১ সালে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ১২৫টি, ২০২২ সালে ৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৭৬টি এবং ২০২৩ সালে ৪ লাখ ৭৩ হাজার একটি পদ ফাঁকা ছিল। গত বছরের ১৮ মে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ প্রকাশ করে। জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বেকারত্বের হার ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ঠেকেছে। গত অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে দেশের বেকারত্বের হার বেড়ে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
এর আগের বছর একই সময়ে যা ছিল ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। বেকারের এই নতুন হিসাবটি ১৯তম আইসিএলএস (পরিসংখ্যানবিদদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন) অনুযায়ী প্রস্তুত করে বিবিএস। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে আইসিএলএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বেকার জনগোষ্ঠী বেড়ে ২৭ লাখ ৩০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এর আগের বছর যা ২৪ লাখ। অর্থাত্, এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকার বেড়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার। তবে দেশে কর্মসংস্থানের যে পরিস্থিতি, সে অনুযায়ী মাত্র ২৭ লাখ বেকার, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয় সংশ্লিষ্টদের কাছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, প্রকৃত বেকারের সংখ্যা সরকারের দেওয়া হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, নিয়োগ বিধির জটিলতা, সমন্বয়হীনতা এবং বিভিন্ন দপ্তরে আলাদা নিয়োগ ব্যবস্থার কারণে সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া ধীরগতিসম্পন্ন হয়ে পড়েছে। স্পষ্ট নিয়োগ বিধির অভাব এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এই জটকে আরো জটিল করে তুলছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই ৫ লাখ শূন্য পদ পূরণ হলে প্রায় ৫ লাখ পরিবারের ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন। একদিকে বেকারদের কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে হাজারো পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। তাই দ্রুত এসব পদে নিয়োগে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।