Image description

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে চলমান মতপার্থক্য ও বিভেদ একটি জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ পুনর্গঠনের অন্তরায় বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্ট হচ্ছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। এটি সুশাসন, গণ-আন্দোলন, আত্মত্যাগ, গণ-অভ্যুত্থান এবং পরিবর্তিত একটি রাষ্ট্র গঠনে আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। জুলাই আন্দোলনের শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ যত বাড়বে, পতিত ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা ফিরে আসার সম্ভাবনা ততই প্রবল হবে। ইতোমধ্যে পতিত আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার হুংকারও দিচ্ছেন, যা নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের অন্তরায় বলে মনে করেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাত্র দুই বছরের মাথায় ওই আন্দোলনে পক্ষের শক্তিগুলো এখন বহু ভাগে বিভক্ত। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি এই তিনটি দল এখন তিন দিকে। বিএনপি নিজেদের মতো করে সরকার পরিচালনা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার কথা বলছে। দলটির সঙ্গে জামায়াত ও এনসিপির দূরত্ব বেড়েছে। এমনকি বিএনপির সঙ্গে এনসিপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ইদানীং দৃশ্যমান হচ্ছে। অপরদিকে সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের বনিবনা হচ্ছে না। সবমিলিয়ে সংঘাতময় রাজনীতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে উৎফুল্ল হচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কয়েকটি বহিঃশক্তির নাক গলানোর প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, জুলাই ‘স্পিরিট’ বা চেতনা নষ্ট হলে গণতন্ত্রের ধারা ফিরিয়ে আনতে গত ১৭ বছরের আন্দোলন ও আত্মত্যাগের সুফল দেশের জনগণ পাবে না। ফলে দেশের স্বার্থে জুলাই পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে সমঝোতা জরুরি বলেও মনে করেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীর মতে, জুলাই শক্তিগুলোর মধ্যে অনৈক্য দেশে ধ্বংস ডেকে আনবে। কথায় আছে ঐক্যবদ্ধ হলে জয়, বিভক্ত হলে পতন। নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন জুলাই আন্দোলনে দেখা গেছে, তা নষ্ট হয়ে যাবে। এজন্য ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তাহলেই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মত্যাগ করা মানুষের স্বপ্ন ধীরে ধীরে পূরণ করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, মানুষের মৌলিক ও ভোটের অধিকার হরণ এবং বৈষম্যমূলক শোষণ-বঞ্চনার সমাজ থেকে মুক্তির জন্য মানুষ গণ-আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। তাদের স্বপ্ন একটা বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা। সেই সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার এই দলগুলো করেছে, তা থেকে সরে যাওয়া যাবে না। তাই নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর আগ্রহ থাকতে হবে। তাহলে একটি পরিবর্তিত বাংলাদেশ গঠনের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নিয়ে তৈরি হয়েছে এনসিপি। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে এ দলটি সংসদে বিরোধী দলে রয়েছে। অপরদিকে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতি করে আসা বিএনপি এখন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রয়েছে সরকারে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এ তিনটি পক্ষেরই বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সরকার গঠনের পর থেকে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ হবিগঞ্জ ও সিলেটে এনসিপির কর্মসূচিতে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের হামলার ঘটনা ঘটে। অপরদিকে সংবিধান সংশোধন বা সংস্কার ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত ও এনসিপির আগে থেকেই দূরত্ব তৈরি হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে বাগযুদ্ধ করেছে। সংসদ ও রাজপথে পালটাপালটি বক্তব্যও দিচ্ছেন সরকার ও বিরোধী দলের নেতারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পালটাপালটি রাজনীতির দোলাচলে জুলাই যদি তার আদর্শ, মূল্যবোধ ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়, তবে পরাজিত হবে শুধু একটি আন্দোলন নয়; পরাজিত হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তারা বলেন, জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে একত্রিত করা। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থার দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছিল। সেই প্রত্যাশা যদি ধীরে ধীরে হতাশায় পরিণত হয়, তবে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়বে। এমনকি জুলাইয়ের আন্দোলনে প্রাণহানি, আহত হওয়া এবং নির্যাতনের ঘটনার বিচারসহ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাও কঠিন হয়ে পড়বে।

তাদের মতে, জুলাইয়ের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় ঐক্য ধরে রাখা। আন্দোলনের সময় যে ঐক্য তৈরি হয়েছিল, পরবর্তীকালে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, মতপার্থক্য ও ক্ষমতার লড়াইয়ে তা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো সংস্কার বাস্তবায়ন। নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।

দলগুলোর মধ্যে সংঘাতের ঘটনায় শঙ্কা প্রকাশ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, দলগুলোর মধ্যে মতদ্বৈততা হওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু তা দ্বন্দ্ব বা হানাহানিতে রূপ নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সহিংসতা গণতান্ত্রিক ভাষা নয়। তারা যদি দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়, তাহলে অন্যরা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করবে, যা কারও জন্যই শুভকর নয়। তিনি বলেন, জুলাই শক্তিগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব যত প্রকট হবে, আওয়ামী লীগের উগ্র ও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নেতাকর্মীরা তত বেশি সুযোগ নেবে। তারা তত বেশি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পাবে। এখন রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কী একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণে একযোগে কাজ করবে, নাকি পরাজিত শক্তিকে সুযোগ করে দেবে।

জুলাই শক্তির পক্ষের দলগুলোকে সহনশীল আচরণের পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন কাজী মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, এই সময়ে এসে জুলাই আন্দোলনের পক্ষের শক্তিগুলোর বিভক্তি দেখা যাচ্ছে। এতে পরাজিত শক্তি উফুল্ল হচ্ছে। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জুলাইয়ে যে স্পিরিট রয়েছে এ সরকারের সঙ্গে মিলেমিশে তা বাস্তবায়নে সবাইকে সহযোগিতা করা দরকার। প্রয়োজনে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার পরিবারসহ ব্যক্তি বিশেষকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়, সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। সবারই জুলাই স্পিরিট বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়া দরকার।

জুলাইয়ের আন্দোলনে তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল সবচেয়ে বেশি। কর্মসংস্থান, মেধার মূল্যায়ন, বৈষম্য দূরীকরণ এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়েই তারা রাজপথে নেমেছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, যদি সেই প্রজন্ম মনে করে তাদের স্বপ্ন পূরণ হয়নি, তবে ভবিষ্যতে সামাজিক ও রাজনৈতিক হতাশা আরও বাড়তে পারে। এজন্যই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাতের চেয়ে সমঝোতা বেশি জরুরি বলে মনে করেন তারা।

তবে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের মতে, এই তিন দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও তারা পৃথকভাবে জুলাইকে ধারণ করে। জুলাই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে দলগুলো নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাবে বলেও জানান তারা। তবে দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সমঝোতায় পৌঁছবে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু শনিবার যুগান্তরকে বলেন, জুলাইয়ের মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এবং সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একটা দেশে নির্বাচন হয়েছে। সেই নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা দিয়েছে। মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলাসহ আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা পরাজিত হওয়ার কোনো সুযোগ এখন পর্যন্ত আমি দেখছি না। তিনি বলেন, বিএনপি জুলাই স্পিরিট ধারণ করে বলেই সংবিধান সংশোধন করতে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সরকার দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে।

জুলাই মূল্যবোধ বাস্তবায়নেই সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। যুগান্তরকে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ছিল দেশের রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তন। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর একক ও অসীম ক্ষমতা থাকবে না, বৈষম্যহীন রাষ্ট্রগঠন, সর্বস্তরে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করাও ছিল অন্যতম লক্ষ্য। এ কারণে আমরা বারবার সংবিধান সংস্কারের কথা বলে আসছি। তিনি বলেন, জুলাই হারিয়ে গেলে গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধের সব বৈশিষ্ট্যই হারিয়ে যাবে। আবার তৈরি হবে বৈষম্য, লুটপাট, চাঁদাবাজি, গুম, খুন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি। একদলীয় স্বৈরশাসন, ব্যক্তি ও দলের ইচ্ছায় চলবে দেশ। সর্বোপরি দেশ আবার কোনো বিদেশি শক্তির ডিকটেশনে পরিচালিত হবে। আলটিমেটলি হেরে যাবে বাংলাদেশ। সেটা আমরা হতে দেব না।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার বলেন, নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানে ভীত হয়ে এনসিপির ওপর বিএনপি হামলা করছে। এতে আমরা শঙ্কিত নই। আমাদের জনসমর্থন আরও বাড়ছে। তিনি বলেন, জুলাই স্পিরিট সাধারণ মানুষ ধারণ করে। ওই জুলাই কোনোভাবে বৃথা যেতে দেব না। জুলাই স্পিরিট বাস্তবায়নের জন্য ঐক্য ধরে রাখা সবারই দায়িত্ব।