Image description

অলিউল্লাহ নোমান

শনিবার সকালেই (স্থানীয় সময়) নজরে আসে খেলাফত মজলিস (আযাদ-কাদের বাচ্চু) ১১ দলীয় জোট থেকে সরে গেছে। খবরটা দেখে আমাদের শ্রদ্ধেয় আবদুল কাদের বাচ্চু ( আহমদ আবদুল কাদের) ভাইয়ের ছেড়ে যাওয়ার কিছু চিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠল। 
তখন আমি মাদ্রাসায় ৭/৮-এর ছাত্র। ইসলামী ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি, আমাদের এলাকার অতি সাধারণ পরিবারের বাচ্চু ভাই।  ভাল ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল বিতারকিক। আমাদের ক্লাশে শিক্ষকরা পড়ালেখায় উৎসাহ দিতে বাচ্চু ভাইয়ের উদাহরণ দিতেন। বলতেন,অতি সাধারণ পরিবারের ছেলে বাচ্চু যদি শিবিরের সভাপতি হতে পারে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল বিতর্ক করতে জানে তোমরাও পারবে। সেখান থেকে বাচ্চু ভাইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। 

কিন্তু কিছুদিন পরেই দেখি তিনি শিবির ভেঙে দুই ভাগ করেন। প্রতিষ্ঠা করেন যুবশিবির। ইসলামী ছাত্রশিবিরের অনেক মেধাবীরা তখন তার সাথে যোগ দেয়। 
ছাত্র শিবিরেও দুই ভাগ। একভাগ যুবশিবিরের সাথে। মূল শিবির রয়ে যায় জামায়াতে ইসলামীর সাথে। 
ঢাকার আলুবাজার ম‍্যাস তাদের নিয়ন্ত্রণে। 
বেশিদিন এভাবে আগাতে পারলেন না। হাফেজ্জি হুজুরের সাথে গেলেন। 
সেখানেও বেশিদিন সুবিধা করতে পারেন নি।তার পক্ষের শিবির ও যুবশিবির বিলুপ্ত করে শায়খুল হাদিসকে নিয়ে গঠন করলেন খেলাফত মজলিস। ছাত্র সংগঠন তৈরি করলেন ছাত্র মজলিস নামে। 
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব হলেন। তবে শায়খুল হাদিসের সাথেও ঠিকতে পারেননি। দুইভাগ হল খেলাফত মজলিস। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নামে দলটির সভাপতি পদে শায়খুল হাদিস রয়ে গেলেন। বাচ্চু ভাই বের হয়ে গঠন করলেন খেলাফত মজলিস নামে আরেকটি দল। অর্থাৎ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নামের মূল দল রয়ে গেল শায়খুল হাদীসের হাতে। তিনি বের হয়ে বাংলাদেশ শব্দ বাদ দিয়ে শুধু খেলাফত মজলিস নামে দল গঠন করলেন। 
চার দলীয় জোটের সাথে ছিল মূল খেলাফত মজলিস। শায়খুল হাদিস জোট থেকে বের হয়ে গেলে তিনি চার দলীয় জোটে রয়ে গেলেন। পরবর্তীতে ১৮ দলীয় জোট গঠন হলে সেখানেও ছিলেন। 
শেখ হাসিনার ফ‍্যাসিবাদের সময় কারাগারে নেওয়া হলে আপস করে মুক্তি নেন। ফ‍্যাসিবাদি সরকারের সাথে সমঝোতা অনুযায়ী কারাগার থেকে মুক্তির আগে ১৮ দলীয় জোট ত‍্যাগের ঘোষণা দেওয়া হয় তার দলের পক্ষ থেকে। এরপরই তিনি মুক্তি পান। 

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইসলামী দল গুলো নিয়ে ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনের জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলে সেখানে শরীক হন। 

নির্বাচন ঘনিয়ে আসলেও এলাকায় তার কোন রকমের নির্বাচনী যোগাযোগ। যাতায়াত বা জনসংযোগ নেই। 

জামায়াতে ইসলামী এই আসনে দলটির জেলা আমীর প্রবীন রাজনীতিবিদ মাওলানা মোখলেসুর রহমানকে মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি ব‍্যাপক জনসংযোগ করছিলেন। 

নির্বাচনের আগে নভেম্বরের মাঝামাঝি জামায়াতে ইসলামীর মুহতারাম আমীর আমাকে হঠাৎ করেই একদিন ফোন দেন। ফোনে তিনি আমাকে বললেন তোমাকে লোকজন এমপি বানাতে চায়। তোমার অভিমত কি। সঙ্গে সঙ্গে আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম। আপনি আমাকে এমপি বানাবেন কিভাবে! আমার এলাকায় তো আপনাদের নির্বাচনী জোটের বড় নেতা আবদুল কাদের বাচ্চু ভাই আছেন। মুহতারাম আমীরে জামায়াত আমাকে তখন বললেন বাচ্চু ভাই’র সাথে কথা হয়েছে। এলাকা থেকে নির্বাচন করবেন না। তাই ঢাকা থেকে একটি আসনে তাকে চিন্তা করা হচ্ছে। 

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি মুহতারাম আমীরে জামায়াত নিশ্চয়ই আমাকে অসত্য বলেননি। তখন আমি বললাম এমন যদি হয়, তাহলে আমি চিন্তা করে দেখি। তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন দেশে গিয়ে আত্মীয়স্বজন ও ব‍্যক্তিগত এবং পারিবারিক শুভানুধ্যায়ীদের মতামত জানতে। এরমধ্যেই দলীয় প্রচার বিভাগের প্রধান মুহতারাম জোবায়ের ভাই লন্ডনে আসলে তার সাথেও বিস্তারিত কথা হয় এ প্রসঙ্গে। তাৎক্ষণিক আমি টিকেট করে দেশে যাই। 

দেশে গিয়ে আত্মীয়স্বজন, শুভানুধ্যায়ীদের সাথে ব‍্যাপক যোগাযোগ করি। দেখা করি। পাড়াপ্রতিবেশি মুরুব্বিদের সাথে কথা বলি। 
সপ্তাহের বেশি দেশে কাটিয়ে লন্ডনে ফিরি। 
আবারো আমীরে জামায়াত ফোন দিয়ে ফলোআপ জানতে চান। আমি তখন সম্মতি দেই। তখন তিনি আমাকে দ্রুত দেশে ফিরতে বলেন। 

আমি নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে দেশে ফিরি। ডিসেম্বরের ৩০ তারিখ আমার মনোনয়ন জলে চুড়ান্ত হয় দলের মজলিশে সূরা ও নির্বাহী কমিটির বৈঠকে। বৈঠক শেষে আমিরে জামায়াত আমাকে চুড়ান্ত মনোনয়নের বিষয়টি অবহিত করেন। 

আমি রাতেই এলাকায় যাই। তখনো অফিসিয়ালি ঘোষণা হয়নি। যেহেতু আমার এখানে দলের জেলা আমির আগেই দলের মনোনীত প্রার্থী। তিনি আবার আমার শিক্ষক। একটু বিব্রতকর অবস্থায় ছিলাম। 

সিদ্ধান্ত বল জোবায়ের ভাই এলাকায় গিয়ে স্থানীয় রোকন ও দুই থানার কার্যকরী কমিটির সাথে বৈঠক করে সেখানে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন। তিনি রাতেই ঢাকা থেকে সিলেটে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। পরের দিন সন্ধ্যায় শায়েস্তাগন্জ পুরান বাজারে মিটিংয়ে জোবায়ের ভাই ঘোষণা দেন আমাকে প্রার্থী হিসেবে। আমার শিক্ষক মুহতারাম জেলা আমীর মাওলানা মোখলেসুর রহমান সদয় চিত্তে দলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। পরবর্তীতে আমাকে সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখেন। 

আমি সকলের সহযোগিতা ও সমর্থন নিয়ে ব‍্যাপক জনসংযোগ করার চেষ্টা অব্যাহত রাখি। যেহেতু সময় একেবারেই কম ছিল। তাই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অবিরাম জনসংযোগ চালাই। 

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে হঠাৎ করে আমার কানে আসে বাচ্চু ভাই এখন এই আসন চাচ্ছে। আমি সেটা বেশি পাত্তা দেইনি। আমার দৃঢ বিশ্বাস ছিল মুহতারাম আমি যেহেতু আগে বাচ্চু ভাইয়ের সাথে কথা বলেছেন এ আসনের বিষয়ে তিনি এখন এটা কেমন করে চাচ্ছেন। ইসলামী আন্দোলন, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার কথা ছাত্রজীবন থেকে বলে আসছেন। এখন হঠাৎ করে তিনি এমনটা করবেন আমি বিশ্বাস করি না। 

শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিনের আগের দিন (অর্থাৎ পরের দিন মনোনয়ন দাখিলের শেষ তারিখ) আমাকে ঢাকায় তলব করা হল। জানানো হল বাচ্চু ভাই হঠাৎ করে এ আসনের জন্য জোট ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। এই মুহূর্তে জোটের স্বার্থে আমাকে ত‍্যগ স্বীকার করতে হবে। বিনা বাক্যে সব মেনে নিয়েছিলাম। যদিও এর আগেই নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী আমার বৃটিশ নাগরিকত্ব ত‍্যাগের আবেদনও জমা দিয়েছিলাম বৃটিশ কর্তৃপক্ষের বরাবরে। সবকিছু চূড়ান্ত করে মনোনয়ন জমা দেওয়ার প্রস্তুতিও চুড়ান্ত করেছিলাম। 

আল্লাহ রহমত করেছে, নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন বৃটিশ সরকার চুড়ান্ত করার আগে প্রত‍্যাহার করতে সক্ষম হয়েছি। নতুবা। আম-ছালা সবই গোল্লায় যেতো।

বাচ্চু ভাই শেষ বেলায় আসনের জন‍্য মরিয়া হয়ে যাওয়ার পেছনে এলাকায় নানা কথা চাউর রয়েছে। যেহেতু আমার হাতে প্রমান নাই। আর এসব অনৈতিক লেনদেন স্বাক্ষী-প্রমান রেখে কেউ করেন না তাই আমি এখানে কিছুই বলতে চাই না। এলাকার মানুষজন মুখে মুখে সেটা প্রচার আছে। এভাবেই থাকুক। 

জুলাই সনদ বাস্তবায় এখন বড় ইস্যু। এই রাষ্ট্রকে মেরামত করতে হলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিকল্প নাই। ঠিক এমন মুহূর্তে যখন ঐক্য আরো মজবুত হওয়ার কথা। তখন বাচ্চু ভাই জোট ছাড়ার ঘোষণা দিলেন!  
তার রাজনৈতিক চরিত্র বিবেচনার ভার এখন আপনাদের হাতেই ছেড়ে দিলাম।