Image description
জাতিসংঘ অধিবেশনে যাবেন সেপ্টেম্বরে

গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর থেকে দেশ পুনর্গঠন এবং কূটনীতিতে গতি ফেরাতে নানামুখী তৎপরতা জোরদার করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। সে লক্ষ্যেই গত জুনে নিজের প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীন সফর সফলভাবে শেষ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই সফরে দুটি দেশের সঙ্গেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও বহুপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম দুই দেশ সফরের সাফল্যের পর সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল—এরপর কোন দেশে সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী? সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আপাতত নতুন কোনো বিদেশ সফরে যাচ্ছেন না তিনি। তবে সৌদি আরব, জাপান, কুয়েত, তুরস্ক, ইউরোপ ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে এরই মধ্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এসব দেশের সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তাদের দেশ সফরের জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের নানাবিধ কারণে এ মুহূর্তে বিদেশ সফরে যাচ্ছেন না।

সরকারের একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, সদ্য সমাপ্ত দীর্ঘ সফর শেষে (মালয়েশিয়া ও চীন) প্রধানমন্ত্রী এখন দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, নীতিনির্ধারণ ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেই বেশি মনোযোগী। তাই আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে নতুন করে অন্য কোনো বিদেশ সফরের পরিকল্পনা আপাতত রাখা হয়নি।

এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব, জাপান ও ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তার মধ্যে গত ৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. আব্দুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়া। সে সময় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের একটি চিঠি প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন সৌদি রাষ্ট্রদূত। চিঠিতে যুবরাজ জানান, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সৌদি আরবের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভ্রাতৃসুলভ মনোভাব দুদেশের সম্পর্কের গভীরতার ইঙ্গিত বহন করে। তিনি দুই দেশের সম্পর্ক বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী সৌদি রাষ্ট্রদূতকে এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য ক্রাউন প্রিন্সের কাছে তার ধন্যবাদ পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করেন। সৌদি রাষ্ট্রদূত আরও জানান, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানও শিগগির বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন। আলোচনাকালে রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সুবিধাজনক সময়ে সৌদি আরব সফরের জন্য তার সরকারের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানান। প্রধানমন্ত্রী এ আমন্ত্রণকে স্বাগত জানিয়ে তা গ্রহণ করেছেন বলে জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

 

এ ছাড়া গত ২৮ জুন ঢাকায় জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জাপান সফরে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহের কথা জানান। পরে গত ১ জুলাই বাংলাদেশ সফরে আসে জাপানের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী শিমাদা তোমাকির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। শিমাদা তোমাকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তাকে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানান।

আগামী সেপ্টেম্বরে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, ভারত সফরের আমন্ত্রণপত্র আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসেছে। আমরা সেটা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠিয়েছি।

আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের ১৮তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্র না হলেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

তবে প্রধানমন্ত্রী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদানের আগে অন্য কোনো দেশ সফরে যাবেন কি না, এ বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল কেউ নিশ্চিত করতে পারছেন না। তারা জানান, আপাতত প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর যাওয়ার কোনো শিডিউল নেই। কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যক্রম দেখে মনে হয় না যে, তিনি সহসাই বিদেশ সফরে যাবেন। আর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং সূত্র জানায়, আগস্টের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে জাতিসংঘে যাওয়ার আগে বা পরে প্রধানমন্ত্রী কুয়েত কিংবা সৌদি আরবে যেতে পারেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কূটনীতির স্বাভাবিক ধারা অব্যাহত রেখে আগামীতে প্রধানমন্ত্রীর বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ দেশ সফরের খসড়া আলোচনায় রয়েছে। সেক্ষেত্রে সামার (গ্রীষ্মকাল) শেষে কুয়েত কিংবা সৌদি আরব অথবা জাপানের মতো প্রভাবশালী দেশ সফরেও যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। নির্ভরযোগ্যসূত্র বলছে, আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র যাবেন প্রধানমন্ত্রী। তবে যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার ঠিক আগে বা পরে প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরব সফর করতে পারেন। কেননা, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ বন্ধুরাষ্ট্রটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও শ্রমবাজার জোরদারে সফরটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পরবর্তী রাষ্ট্রীয় সফরের তালিকায় রয়েছে এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ সেতু বন্ধনকারী দেশ তুরস্ক। সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব সফরের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করতে কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা চলছে।

জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির কালবেলাকে বলেন, দীর্ঘদিন পর একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি বিপুল ভোটে বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে। কেননা, বিগত ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী আমলের নির্বাচনগুলো ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। সে কারণে বর্তমানে নির্বাচিত সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শুভেচ্ছা ও সমর্থন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে বিভিন্ন দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা। এরই মধ্যে অনেক দেশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। অতিসম্প্রতি ঢাকায় সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণের বিষয়টি জানিয়েছেন। সে পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরব সফরে সম্মত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে সৌদি যুবরাজকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি। সৌদি যুবরাজও বাংলাদেশে সফরে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময়সূচি ঠিক হয়নি। দুই দেশের সরকারের পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে তা নির্ধারণ করা হবে।