Image description
গ্যাস সংকট

ভোর ৪টার দিকে রাজপথ যখন সবে জাগতে শুরু করে, ততক্ষণে রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোর সামনে জমে উঠেছে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ গাড়ির সারি। চাকা ঘোরেনি এক ইঞ্চিও, ইঞ্জিনের গর্জন স্তব্ধ। স্টিয়ারিংয়ে মাথা রেখে ঝিমাচ্ছেন মধ্যবয়সী চালক নবীন হোসেন। ঘড়ির কাঁটা সকাল সাড়ে ১০টা স্পর্শ করলেও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি। গ্যাস আসবে কি না, তা জানা নেই স্টেশনের কারও। নবীন হোসেনের মতো হাজারো চাকা-ঘোরানো মানুষের জন্য এখন প্রতিটি দিনই এক অনিশ্চিত অপেক্ষার গল্প।

হঠাৎ কেন এই অবস্থা? পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই মিলবে উত্তর। দেশের ২২টি প্রাকৃতিক গ্যাসকূপের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। রাষ্ট্রায়ত্ত এসব কূপ থেকে দৈনিক উৎপাদন করা হয় ৯০০ থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। অথচ চাহিদার বাকি অংশ পূরণ করতে সমপরিমাণ গ্যাস আমদানিকৃত এলএনজি থেকে মেটানো হয়। ফলে কোনো কারণে আমদানি ব্যাহত বা এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে কার্যত ভয়াবহ গ্যাস সংকটে পড়ে পুরো দেশ। দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসের চাহিদা মেটাতে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি প্রক্রিয়া শুরু হয়। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি এলএনজি টার্মিনালের সরবরাহ সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে টার্মিনাল থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। তবে চলতি সপ্তাহে একটি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা গ্রাহকপর্যায়ে চরম প্রভাব ফেলেছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ১৮ জুলাই প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত ও সরবরাহ করা হয়েছে ৯২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, আর এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ৯৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। তবে এলএনজির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত ২২ জুলাই সরবরাহ নেমে আসে ৬২১ মিলিয়ন ঘনফুটে। প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনও কিছুটা কমে ৯০৯ মিলিয়ন ঘনফুটে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে সপ্তাহের ব্যবধানে সার্বিকভাবে গ্যাস সরবরাহ কমেছে অনেকটাই।

রাজধানীর হাতিরঝিল-বাড্ডা সংলগ্ন জামান সিএনজি স্টেশনে গত কয়েকদিনের মতো গতকাল শনিবারও গ্যাস সরবরাহ প্রায় বন্ধ ছিল। মাঝে মধ্যে গ্যাস এলে অপেক্ষমাণ কয়েকটি গাড়িতে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। বাকি সময় কখন গ্যাস আসবে, সেই অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে চালকদের। নবীন হোসেন নামের এক সিএনজিচালক বলেন, ভোর থেকে অপেক্ষা করছি। এখন সকাল সাড়ে ১০টা বাজে, গ্যাস পাওয়ার কোনো খবর নেই। কখন আসবে, সেটাও কেউ বলতে পারছে না। গাড়িতে গ্যাস নেই, তাই অন্য কোথাও যেতে পারছি না। যতক্ষণই লাগুক, এখান থেকেই গ্যাস নিতে হবে। মধ্য বাড্ডার মা সিএনজি স্টেশনেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে চালকরা গ্যাসের অপেক্ষা করছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর প্রায় সব সিএনজি স্টেশনেই একই অবস্থা। গ্যাস এলে সর্বোচ্চ এক থেকে দেড় ঘণ্টা সরবরাহ থাকে, এরপর আবার বন্ধ হয়ে যায়। ভাড়ায় চালিত সিএনজি ও প্রাইভেট গাড়ির চালকরা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে তাদের পরিবারে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। পর্যাপ্ত ট্রিপ দিতে না পারায় আয় কমে গেছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধানের দাবি জানান তারা। গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে যাত্রী পরিবহনেও। রাস্তায় সিএনজির সংখ্যা কমে যাওয়ায় বেড়েছে ভাড়া।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ত্রুটি মেরামতের কাজ চলছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি। সিএনজি স্টেশনের সংকট খুবই সাময়িক, এটি থাকবে না। তিনি আরও বলেন, একটি এফএসআরইউতে (এলএনজির ভাসমান টার্মিনাল) যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। এ কারণেই সিএনজি স্টেশনগুলোতে কিছুটা লাইন দেখা গেছে।