বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হতে পারে এমন কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তাকে আর প্রশাসনে রাখা হচ্ছে না। নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, সরকার প্রথমদিকে পরিস্থিতি গুছিয়ে নেওয়ার স্বার্থে অনেক বিষয় দেখেও কৌশলগত কারণে এড়িয়ে গেছে। তবে ক্ষমতার মেয়াদের প্রথম পাঁচ মাস পার হওয়ার পর এখন কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা গোষ্ঠীর কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বা বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সুযোগ দিতে রাজি নয় সরকার। পাশাপাশি আস্থা বা বিশ্বাসযোগ্য নয় এমন কাউকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন বা অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।
এছাড়া ‘ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র’ হিসাবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারের আস্থাভাজন নয় এমন কাউকে রাখা হবে না। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী এবং এখনো গোপন যোগাযোগ থাকতে পারে এমন সন্দেহভাজনদের রাখা হবে না গুরুত্বপূর্ণ বা স্পর্শকাতর কোনো পদে। সূত্র জানাচ্ছে, এজন্য আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিতদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তবে সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, আওয়ামী ঘনিষ্ঠদের ওপর কড়া নজর থাকলেও এ বিষয়ে এখনই তাড়াহুড়ো করে কোনো পদক্ষেপ নিতে চায় না সরকার। সংশ্লিষ্টরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, সঠিক বিচার-বিশ্লেষণ এবং সতর্ক বিবেচনার মাধ্যমেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর নানা অভিযোগে ইতোমধ্যে ৬৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর আওয়ামী ঘনিষ্ঠতা এবং নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে আরও অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে। একইভাবে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনের ৯ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও সরকারের ১৩ জন সচিব, ২২ জন জেলা প্রশাসক ও চুক্তিভিত্তিক ১০১ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
জানা গেছে, সরকারের পর্যালোচনায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে বিবেচিত হওয়ায় সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনকে সরে দাঁড়ানোর জন্য বার্তা দেওয়া হলে শুক্রবার তিনি পদত্যাগ করেন। এছাড়া দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন-এমন সব শক্তি ও ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এখনই কারও নাম প্রকাশ করতে রাজি হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারের সিনিয়র একাধিক মন্ত্রী যুগান্তরকে বলেন, সরকার পরিবর্তন হলে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পরিবর্তনও একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কারা থাকবে বা থাকবে না সেটিও যথাসময়ে স্পষ্ট হবে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো আবেগের বিষয় নয়। পূর্ববর্তী সরকারের দোসররা এখনো দেশের ভেতরে ও বাইরে বসে সরকারের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করার জন্য মুখিয়ে আছে। তাই প্রশাসনে সংস্কার ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের অপসারণ অত্যন্ত জরুরি।
সূত্র জানায়, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সরকার অত্যন্ত ধীরস্থির এবং সতর্ক কৌশল অবলম্বন করছে। বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, রাষ্ট্রপতির মতো শীর্ষ সাংবিধানিক পদে নির্বাচনে অতীতে ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর ছিল না। তাই ন্যূনতম ঝুঁকি রয়েছে এমন কাউকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করা হবে না। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করা হয়েছিল। কিন্তু পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতভেদের কারণে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়, যা রাজনৈতিকভাবে বিএনপির জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল। বি. চৌধুরীর পর অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে রাষ্ট্রপতি করার ফলাফলও বিএনপির অনুকূলে যায়নি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন ও পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটে তার বিচক্ষণতার অভাবে বিএনপিকে কঠিন সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছিল। তাই অতীত অভিজ্ঞতা এবং অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কোনো প্রকার ‘ঝুঁকি’ নেবেন না। নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, সরকার একজন বিচক্ষণ, অভিজ্ঞ এবং দলের নীতি ও দর্শনে শতভাগ বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিকে এই পদে নিয়ে আসবে।
সূত্রমতে, সরকারের এই কর্মকৌশল শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বাইরের ভূরাজনৈতিক তৎপরতাও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে পরিচিত ভারতের প্রভাবশালী একজন সাংবাদিক ও বিশ্লেষকের একটি ফেসবুক পোস্ট এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ সম্প্রতি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে; যা দেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি প্রথমে সামনে আসে ২২ জুলাই।
ওই দিনই ভারতের সাংবাদিক তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘তিন দিন আগে এক চ্যানেলে বলেছিলাম বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বদল হচ্ছেন।’ এছাড়া বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় একটি পদের দিকেও তিনি ইঙ্গিত করেন। ফলে শুধু ফেসবুকেই নয়, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ভৌগোলিক ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ সংশ্লিষ্ট বলে দেশের রাজনীতিতে আলোচনা উঠেছে।
সম্প্রতি ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা জানিয়ে কর্মীদের বার্তা দেওয়ার ঘটনাকে সরকার নিছক রাজনৈতিক ‘স্টান্টবাজি’ হিসাবে দেখছে না। সরকার এই বক্তব্যের তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করছে। সামনে ৫ আগস্ট তথা জুলাই অভ্যুত্থানের দিনক্ষণ রয়েছে। এছাড়া ১৫ আগস্ট রয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী। এই দুটি দিনক্ষণকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ পরিস্থিতি ‘ঘোলাটে’ করার চেষ্টা করে কিনা সরকারসংশ্লিষ্টরা তাও খতিয়ে দেখছে।
এছাড়া রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টা পরেই অত্যন্ত স্পর্শকাতর জায়গা মেট্রো স্টেশনের নিচ থেকে বোমা উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। সরকারসংশ্লিষ্টরা এসব ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সঙ্গে কারা যোগাযোগ রক্ষা করছে, এসব ঘটনার নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ডদের খুঁজে বের করতে মাঠে নেমেছে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
সরকারের প্রভাবশালী একজন মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য যুগান্তরকে জানান, সবকিছুই সরকারের পর্যবেক্ষণ ও নজরদারিতে আছে। কারা সরকারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, আর কারা অনুগত থেকে দেশের জন্য কাজ করবে, তা নির্ধারণে কোনো তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে।
জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, আমরা কোনো ধরনের প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, যারা রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে রাষ্ট্রের ক্ষতি করতে চায়, আমরা তাদের কোলে বসিয়ে রাখব। বিচার-বিশ্লেষণ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে যারা ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত হবেন, তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো ঠিক হবে না।
একই সঙ্গে সরিয়ে দেওয়াটা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা। সবকিছু মিলিয়ে, যে কোনো মূল্যে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং কোনো প্রকার অপ্রীতিকর পরিস্থিতি রুখে দিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এখন কঠিন ও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। রাষ্ট্রপ্রধানের মতো অতি স্পর্শকাতর পদে যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচন এবং আগস্ট মাসকে কেন্দ্র করে যে কোনো সম্ভাব্য চক্রান্ত প্রতিহত করাই এখন দেশবাসীর বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, গণ-অভ্যুত্থান ও নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ায় পুরোনো রেজিমের (সরকারের) অবশিষ্টাংশ ক্ষমতায় থাকাটা বাস্তবসম্মত বা মানানসই নয়। এটি নতুন ও পুরোনো-দুপক্ষের জন্যই অস্বস্তিকর। ফলে নতুন সরকার সব পদে নিজস্ব বা পছন্দের লোক বসাবে, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।
তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের পরপরই রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দিলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারত। রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সুবিধার্থেই তাকে সাময়িকভাবে রেখে দেওয়া হয়েছিল।
আলতাফ পারভেজ মনে করেন, বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদটি মূলত প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে, এটি কোনো চরম ক্ষমতাধর পদ নয়। বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে নিজস্ব লোক বসানোর মাধ্যমে শাসন ক্ষমতায় তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে চাইছে। গুরুত্বপূর্ণ সব রাষ্ট্রীয় পদে নিজেদের আস্থাভাজন লোক নিযুক্ত হলে ভবিষ্যতে সরকার কোনো বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়বে না।