রাজধানীর মোহাম্মদপুরে দিনের বেলায়ও চাপাতি ঠেকিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। আর সন্ধ্যা নামলেই অলিগলিতে নেমে আসে কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসীরা। তাদের হাতে হাতে দেখা যায় চাপাতি, যেন চলছে মহড়া। ভয়ে সন্ধ্যার পরই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দোকানপাট। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে নেমে আসে আরও ভয়ংকর পরিণতি। এতে ভয়ে বাসিন্দারা ঘরের বাইরে বের হওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। ওদের উৎপাতে রাতে চলাচলও প্রায় বন্ধ। এ অবস্থায় পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক ভাড়াটিয়া ও বাসিন্দা মোহাম্মদপুর এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। সরেজমিন দেখা যায়, প্রায় প্রতি বাড়িতেই ঝুলছে টু-লেট সাইনবোর্ড। এতে বিপাকে পড়েছেন বাড়ির মালিকরা। মাসের পর মাস ফাঁকা থাকছে ফ্ল্যাট। শুধু বাড়ির মালিকই নন, মোহাম্মদপুরে ফ্ল্যাট বিক্রিতেও ভাটা পড়েছে বলে জানা যায়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে গিয়ে উল্টো বিপদে পড়ছেন বাসিন্দারা। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে- পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করলেও কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে এসে তারা অভিযোগকারীর ওপর হামলা চালাচ্ছে। এলাকাবাসী বলছেন, বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ ভয়ের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও বিনা বাধায় মাদকের কারবার করতেই কিশোর গ্যাং সদস্যদের দিয়ে নিয়মিত মহড়া দেওয়াচ্ছে। আর এই গ্যাং সদস্যরাই সুযোগ পেলে সামুরাই অথবা চাপাতি ঠেকিয়ে ছিনতাই করছে। স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক নেতা পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ালে তাকেও হামলা করতে দ্বিধা করে না গ্যাং সদস্যরা। গতকাল মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান, মোহাম্মদিয়া হাউজিং, সাত মসজিদ হাউজিং, ভাঙা মসজিদ উদ্যান এলাকা ঘুরে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমন পরিস্থিতিতে মোহাম্মদপুর এলাকা ঘিরে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, মোহাম্মদপুর থানা এলাকা আয়তনে অনেক বড় হওয়ায় পুলিশের পক্ষে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এর ওপর মোহাম্মদপুরে লাখ লাখ উদ্বাস্তু লোক বসবাস করে। বিশেষ করে ভোলা ও বরিশালের নদীভাঙন এলাকার মানুষ অপরাধে জড়াচ্ছে বেশি। এই উদ্বাস্তু লোকদের কারণেই দিন দিন কিশোর গ্যাংগুলোর দল ভারী হচ্ছে।
সরেজমিন চাঁদ উদ্যান, ঢাকা উদ্যান ও সাত মসজিদ হাউজিং এলাকায় দেখা যায়, বেশির ভাগ বাড়িতেই ঝুলছে টু-লেট সাইনবোর্ড। অনেক দোকানেও ভাড়া হওয়ার পোস্টার লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে চাঁদ উদ্যান মোহাম্মদপুর তিন রাস্তা মোড়সংলগ্ন এলাকা হলেও নিরাপত্তা সংকটে এখানেও দেখা গেছে টু-লেটের ছড়াছড়ি। ৪ নম্বর রোডের একটি বাসায় তিনটি টু-লেটের সাইনবোর্ড দেখে বাড়ির মালিকের কাছে কারণ জানতে চাওয়া হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বাড়ির মালিক বলেন, ছয় মাস ধরে দুটি ফ্ল্যাট খালি। আরেকটা দুই মাস ধরে খালি। আমরা ভাড়া দিয়েই চলি। অথচ তিনটি ফ্ল্যাট খালি পড়ে আছে। কোনো ভাড়াটিয়া পাচ্ছি না। এর ওপর কিশোর গ্যাং সদস্যদের দৌরাত্ম্য থামছেই না। দুই দিন আগেও ৩ নম্বর রোডে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে চাপাতি হাতে এক ভাড়াটিয়ার স্কুটি আগলে দাঁড়ায় এক সন্ত্রাসী। তার পকেট থেকে নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ওই ঘটনার ভিডিও দেখিয়ে তিনি আরও বলেন, এখন এই ছিনতাইকারীরা শুধু নগদ টাকা ছিনিয়ে নিচ্ছে। মোবাইল ও অন্য কিছু নেয় না। মোবাইল নিলে সবাই থানায় অভিযোগ করে- এজন্য এটি নতুন কৌশল হতে পারে।
চাঁদ উদ্যানে বসবাসকারী একাধিক বাসিন্দা বলেন, চাঁদ উদ্যান ও ঢাকা উদ্যানসহ ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের পুরো এলাকাই কিলার বাদল ও কাইল্লা সুমনের গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়লে এই এলাকায় যত লুটপাট হয়েছে সবই করে বাদল ও সুমনের গ্যাং। তখন এলাকাবাসী রাত জেগে পাহারা দেওয়া শুরু করে। ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মান্নান হোসেন শাহিনকে চাঁদ উদ্যান বাসাবাড়ি মালিক সমিতির সভাপতি করা হয়। তখন বিএনপি নেতা মান্নানকেও টার্গেট করে সন্ত্রাসীরা। হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে ৪২টি কোপ দেওয়া হয়। কেটে ফেলা হয় পায়ের রগ। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে ফিরলেও এরপর থেকে আর কেউই বাদল-সুমন গ্রুপের বিপক্ষে কথা বলে না। নতুন করে যাতে আর কেউ সাহস না পায়-সেজন্যই চলে মহড়া। ঢাকা উদ্যানের বাসিন্দারা জানান, এ এলাকাটিতে লম্বু মোশারফ ও কবজি কাটা গ্রুপের আনোয়ারের অনুসারীরাই ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোশারফ ও আনোয়ারকে বারবার গ্রেপ্তার করলেও তাদের গ্যাংয়ের কার্যক্রম থেমে থাকে না।
স্থানীয়রা জানান, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান ছাড়াও তিন রাস্তার মোড় থেকে রায়েরবাজার, বসিলা ৪০ ফিট, পুলপাড় বটতলা, বসিলা গার্ডেন সিটি, একতা হাউজিং, নবোদয় হাউজিং, বোটঘাট, সাদেক খান রোড, স্লুুইস গেট এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বেশি। বিশেষ করে পাটালি গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, লারা দে গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, আর্মি আলমগীর গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, নবী গ্রুপ, ডায়মন্ড ও দে ধাক্কা গ্রুপগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আতঙ্কের নাম হয়ে আছে। বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, পুলিশের দুর্বলতাই মোহাম্মদপুরের আইনশৃঙ্খলা ভরাডুবির কারণ। অনেক অপরাধী সকালে গ্রেপ্তার হয়ে বিকালেই আবার এলাকায় ঘুরতে থাকে। ডিএমপির মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি মো. জুয়েল রানা বলেন, মোহাম্মদপুর থানায় গড়ে ৪০ শতাংশ মামলা কমেছে। আগে প্রতি মাসে গড়ে দেড় শতাধিক মামলা হলেও এখন হচ্ছে ৯০টি। অর্থাৎ মামলার সংখ্যাই বলছে অপরাধ অনেকটা কমেছে। তবে এই এলাকাটিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের বসবাস হওয়ায় প্রতিনিয়তই চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে এবং বেশ আলোচিত হয়। তবে পুলিশের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই।