Image description

পীরগাছা উপজেলা সাবেক চেয়ারম্যান ও রংপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফসার আলীর পুত্র সাইদুল ইসলাম সাঈদী ও পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও ছাওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজির হোসেনের পুত্র আসাদুজ্জামান আসাদ বিসিএস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন একাধিকবার। কিন্তু পুলিশি ভেরিফিকেশনে তাদের নাম বাদ দেয়া হয়। ‘বিএনপি’ পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাদের বিসিএস ক্যাডারে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হয়। ২০২৪ সালেও বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর পুলিশি ভেরিফিকেশনে তারা বাদ পড়েন। বিসিএসে চাকরি পাওয়া মেধাবী তরুণ সাঈদী ও আসাদ রংপুরের এসপি বিপ্লব কুমার সরকারের সঙ্গে দেখা করে তাদের নাম পুলিশি ভেরিফিকেশনে বাদ না দেয়ার অনুরোধ করেন। বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত মেধাবী দুই তরুণকে পুলিশের এসপি বিপ্লব সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘শেখ হাসিনা আমাকে রংপুরে এসপি করে পাঠিয়েছেন বিএনপি পরিবারের সদস্যদের বিসিএসে চাকরি দেয়ার জন্য নয়। বিসিএসে আপনাদের চাকরি হবে না, অন্য চাকরি খুঁজে নিন।’ অবশ্য জুলাই অভ্যুত্থানের এক সপ্তাহ পর তারা বিসিএস ক্যাডারে চাকরিতে যোগদান করার সুযোগ পান। রংপুরের পীরগাছার আফসার উদ্দিন আহমদ ও নজীর হোসেনের পুত্রের মতো সারা দেশের বিএনপি-জামায়াত পরিবারের লাখ লাখ মেধাবী ছেলেমেয়ে লেখাপড়া শেষ করে আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাজনৈতিক কারণে সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বলেছিলেন, ‘তোমরা বিসিএসের রিটেন পরীক্ষা দাও, বাকিটা আমি দেখব।’ আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপি-জামায়াত পরিবারের ছেলেমেয়েদের পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ প্রতিটি সেক্টরে বিএনপি চেতনায় বিশ্বাসীরা নানাভাবে অবহেলিত, নিগৃহীত এবং বঞ্চিত হন। এদের মধ্যে বেবি নাজনীনসহ অনেক শিল্পী দেশে সুবিধা করতে না পেরে বছরের পর বছর বিদেশে থাকতে বাধ্য হন। আবার রুমানা ইসলাম কনকচাঁপা, মনির খানসহ অনেক শিল্পী, সংস্কৃতিসেবী দেশে থাকলেও উপেক্ষিত হয়েছেন। আর যারা আওয়ামী লীগ অনুসারী মুজিব বন্দনায় অভ্যস্ত সেই তারানা হালিম, সুবর্ণা মুস্তফা, শমী কায়সার, রোকেয়া প্রাচী, ফেরদৌস, রিয়াজ, মমতাজ, তারিক আনাম, লিয়াকত আলী লাকী, শাওন, মাহিয়া মাহিরা সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন, মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন। যারা মন্ত্রী এমপি হতে পারেননি তারা সাংস্কৃতি অঙ্গনে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। প্রতিটি পাতানো নির্বাচনে জনগণের প্রত্যাশার বিপরীতে আওয়ামী লীগের পক্ষে নৌকার প্রার্থীর প্রচারণা চালিয়েছেন। এমনকি এই সুবিধাবাদী শিল্পীরা বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানের অফিস বালুর ট্রাক দিয়ে অবরোধ করে রেখেছিলেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পাল্টে যায় দৃশ্যপট। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এখন তথাকথিত ‘নিরপেক্ষতা’ এবং ‘প্রতিহিংসাপরায়ণ না হওয়ার ভালোমানুষি’ দেখাতে ‘সবার জন্য সরকার’ আওয়াজ তোলা হচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির রাজনীতি করলেও ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে সমঝোতা করে চলেছেন, গা বাঁচিয়ে ছিলেন, মাঠে-ঘাটে জুলুম-নির্যাতন সহ্য করতে হয়নি যাদের; তারাই মূলত ভালোমানুষি দেখাতে নিরপেক্ষতার কথা বলছেন। এমনকি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের যারা ‘সামনে-পেছনে’ ছিলেন না, ১৪’শ ছাত্র-জনতাকে হত্যার দৃশ্যে যাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়নি; তারা মন্ত্রী-এমপি হয়ে এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে ‘সাবেক প্রেসিডেন্ট ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতো নিরপেক্ষতার ভান ধরে শেখ মুজিবের কবর জিয়ারতের মতোই ‘বিএনপি সরকার সবার’ আওয়াজ তুলছেন। আর এ সুযোগ নিতে শুরু করেছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের অলিগার্করা। আর বিএনপি চেতনা ধারণ করার (অপরাধে!) ১৮ বছর জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে বঞ্চিত থেকেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ‘কিছু একটা পাওয়ার প্রত্যাশায়’ স্বপ্ন দেখছেন তাদের শোনানো হচ্ছে ‘সরকারের নিরপেক্ষতার’ গল্প। আর সে সুযোগে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ফ্যাসিস্টের অলিগার্ক শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীরা। মন্ত্রী-এমপিদের পরিবার ও স্বজনরা ঠিকই পকেট ভরাচ্ছেন।

ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় শেখ হাসিনা জাতির ঘাড়ে ১৫ বছর আট মাস চেপে ছিল। এ সময় বিএনপি, ইসলামী ধারার রাজনৈতিক দল এবং জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষের উপর স্টিমরোলার চালিয়েছে। একদিন বিএনপিপন্থী সংস্কৃতিসেবীরা ছিলেন অবহেলিত, বঞ্চিত; অন্যদিকে জাহিদ হাসান, শমী কায়সার, রোকেয়া প্রাচী, অরুণা বিশ্বাস, শাকিল খান, শাহরিয়ার নাজিম জয়, জ্যোতিকা জ্যোতি, সায়মন সাদিক, তানভীন সুইটি, মীর সাব্বির, বিজরী বরকতুল্লাহ, মাজনুন মিজান, রিয়াজ, পূর্ণিমা, ফেরদৌস, নাদিয়া আহমেদ, লিয়াকত আলী লাকী, রবি চৌধুরী, মেহের আফরোজ শাওন, মাহিয়া মাহি গংরা মুজিব বন্দনার নামে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। বিগত বিতর্কিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে জনগণের প্রত্যাশার বিরুদ্ধে অবস্থার নিয়ে নৌকা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন।

এমনকি ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা যখন ঢাকার রাজপথে রক্তে রঞ্জিত করে; তখন ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ঢাকার রাজপথে নেমেছিলেন শিল্পী-নায়ক-নায়িকা পরিচয়ধারী এই ব্যক্তিরা। এদের অনেকেই জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে হাসিনার গুণগান করতেন; আন্দোলন দমাতে হাসিনাকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিতেন। হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা জুলাই অভ্যুত্থানে পালালেও এই শিল্পীরা এখনো দেশে থেকে হাসিনার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন নিরবচ্ছিন্নভাবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা ঝড় তুলছেন ফ্যাসিস্টের পক্ষে। এমনকি জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য তারা নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় চালিয়ে যাচ্ছেন বাধাহীনভাবে। এদের মধ্যে শমী কায়সার, রোকেয়া প্রাচী, মুন্নি সাহাকে কিছুদিন আগে গ্রেফতার করা হলেও রহস্যজনকভাবে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের অলিগার্ক হিসেবে পরিচিত শাইখ সিরাজকে পুরস্কৃত করা হয়েছে।

সোমা ইসলাম নামের পলাতক এক উপস্থাপিকাকে দিল্লি-কলকাতা ঘুরিয়ে এনে চ্যানেলে বসানো হয়েছে জুলাই নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করতে। বিএনপির তথাকথিত নিরপেক্ষতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে চেষ্টা করছে এই উপস্থাপিকা। মূলত বিএনপির কিছু তথাকথিত প্রগতিশীল নেতা এবং পর্দার আড়ালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে চলা নেতা মন্ত্রী-এমপি হয়ে এখন নিরপেক্ষতার মুখোশ ধারণ করছেন। সে সুযোগে জুলাই অভ্যুত্থানে বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে যাচ্ছে কিছু আওয়ামী অলিগার্ক। এদের মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছেন প্রখ্যাত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও আওয়ামী লীগের গাজীপুরের এক নেতার ডিভোর্সি স্ত্রী দ্বিতীয় শ্রেণির নায়িকা মাহিয়া মাহি। এই দুই বিতর্কিত অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ ‘আইসিটি’ অপরাধ পিবিআইকে তদন্তের অজুহাতে মামলা না নিয়ে জিড়ি নিয়েছে।

জানা যায়, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কটাক্ষ করার অভিযোগে অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও মাহিয়া মাহিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। গত ৩ জুলাই রাতে ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’ নামের একটি সংগঠনের তিন নেতা শাহবাগ থানায় অভিযোগটি দাখিল করেন। শাহবাগ থানার ডিউটি অফিসার উপপরিদর্শক (এসআই) স্বপন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তারা অভিনেত্রী শাওন ও চিত্রনায়িকা মাহির বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েছিলেন। তবে যাচাই-বাছাইয়ের পর লিখিত অভিযোগ নেয়া হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর তা তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এসআই রায়হানকে। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।’

দায়ের করা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়Ñ জুলাই অভ্যুত্থানে ১৪’শ শহীদ এবং ৩০ হাজারেরও অধিক আহত বিপ্লবী মানুষের রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে, সম্প্রতি কয়েকজন ব্যক্তি প্রকাশ্যে জুলাই আন্দোলন, এর স্মৃতিচিহ্ন এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে অবমাননাকর কর্মকা- ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন।

প্রথমত, শান্তা ফারজানা নামের এক ব্যক্তি জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে জুতা নিক্ষেপ ও আঘাত করার একটি ভিডিও নিজের ফেসবুক আইডিতে প্রকাশ করেছেন। এটি শহীদদের স্মৃতির প্রতি চরম অবমাননাকর এবং জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয়ত, মেহের আফরোজ শাওন (শওনের মা তহুরা আলী আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন) বিভিন্ন ভিডিওবার্তায় জুলাই আন্দোলনকে ‘পরিকল্পিত’ বা ‘সাজানো ঘটনা’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং রাষ্ট্র ও জুলাই আন্দোলন সম্পর্কে অবমাননাকর বক্তব্য দিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

তৃতীয়ত, চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি (মাহিকে নিয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের ভাইরাল ভিডিও) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডিতে এমন কিছু বক্তব্য দিয়েছেন, যেখানে তিনি জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনকে কটাক্ষ করে তাদের কর্মকা-কে ‘অভিনয়’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বক্তব্যে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হেয় করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। গত ১ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত জুলাই মাসের বর্ষপূর্তির সূচনালগ্নে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি আপত্তিকর পোস্ট দেন অভিনেত্রী ও নির্মাতা মেহের আফরোজ শাওন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘আজ যেহেতু পয়লা জুলাই, তাই আমিও লিখলাম ‘জুলাই সিআইডি’। একটি অশ্লীল শব্দকে ভার্চুয়াল জগতে ‘সিআইডি’ লেখা হয়। তার এই পোস্টটি ঘিরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগের অলিগার্ক শাওন, মাহিদের খুঁটির জোর কোথায়? জুলাই অভ্যুত্থানকে অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে গালিগালাজ করছে; তারা নির্বিঘেœ পলাতক হাসিনার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর সাহস দেখাচ্ছেন। অথচ ফ্যাসিস্ট শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছর জুলুম-নির্যাতনের শিকার ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের অনেককেই ‘চাঁদাবাজ’ ট্যাগ দেয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। বিএনপির মাঠ পর্যায়ের একাধিক নেতা জানালেন, সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপি নিজেদের পদ-পদবি বাগিয়ে নিয়ে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে একদিকে বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে ‘নিরপেক্ষ’ হওয়ার ভাব দেখাচ্ছেন, অন্যদিকে বিএনপির নির্যাতিত নেতাকর্মী ও ফ্যাসিস্টের অলিগার্কদের ‘সমানে সমান’ প্রচারণা চালাচ্ছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটা চলে না।

এদিকে জুলাই আন্দোলন নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য ও কটাক্ষের অভিযোগে সাংবাদিক আনিস আলমগীর, অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহিসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। গতকাল ৫ জুলাই এনসিপি কেন্দ্রীয় সদস্য এস এম সুইট ইবি থানায় এ অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে নাম থাকা অন্যরা হলেনÑ শান্তা ফারজানা, সোমা ইসলাম ও মোমিন মেহেদী।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, জুলাই আন্দোলনে প্রায় এক হাজার ৪০০ জন নিহত এবং ৩০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। আন্দোলনটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও সম্প্রতি কয়েকজন ব্যক্তি জুলাই আন্দোলন, এর স্মৃতিচিহ্ন এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে প্রকাশ্যে অবমাননাকর মন্তব্য ও কটাক্ষ করছেন।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, শান্তা ফারজানা জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে জুতা নিক্ষেপ করেছেন। এ ছাড়া অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জুলাই আন্দোলনকে সাজানো ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে বিভিন্ন অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া সাংবাদিক আনিস আলমগীর, সোমা ইসলাম ও মোমিন মেহেদীর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে জুলাই আন্দোলন নিয়ে কটাক্ষমূলক মন্তব্য করার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।

আগামী অক্টোবর-নভেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। বিএনপি মহাসচিব স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচন অক্টোবর-নভেম্বর শুরু হতে পারে বলে বক্তব্য দিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচন পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হলেও জামায়াত-এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে পড়েছেন। ক্ষমতাসীন বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও নিজেদের মতো করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরই মধ্যে পদ-পদবি বাগিয়ে নেয়ার পর কিছু মন্ত্রী-এমপি নিরপেক্ষতার ভান করছেন। সবার জন্য সবকিছু ওপেন করে দিচ্ছেন। সাংস্কৃতি অঙ্গন থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত একই অবস্থা। অথচ ছাত্রদল-যুবদলের নেতারা বছরের পর বছর ‘সব কিছুতেই নিষিদ্ধ’ ছিলেন। ব্যবসা হারিয়ে বছরের পর বছর এখানে-সেখানে কাটিয়েছেন। লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখে দূর-দূরান্তের শহরে গিয়ে রিকশা, সিএনজি, বাইক চালিয়ে জীবন কাটিয়েছেন।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য খুইয়ে দেশান্তরি হতে বাধ্য হয়েছিলেন। হামলা-মামলা, কারাগারে কাটিয়েছেন হাজারো নেতাকর্মী। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তারা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গিয়ে কেউ হারানো সম্পদ উদ্ধার করছেন, কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, কেউ হারানো জমিজমা উদ্ধার করছেন। সেগুলোকে সুকৌশলে দখলদারি, চাঁদাবাজি ট্যাগ দিয়ে তাদের নিবৃত্ত করে তথাকথিত নিরপেক্ষতার নামে আওয়ামী লীগের অলিগার্কদেরও বিএনপির নেতাকর্মীদের মতোই সুযোগ-সুবিধা দিতে ‘ওপেন’ রাখতে চাচ্ছেন। আবার সিনেমা, টেলিভিশন, বাংলা একাডেমি, নজরুল একাডেমি, শিশু একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপি অনুসারী হওয়ায় দীর্ঘদিন ‘নিষিদ্ধ’ ছিলেন; সেখানেও ‘সংস্কৃতি অঙ্গনে দলবাজি নয়’ সাইনবোর্ড লাগিয়ে সবার জন্য সবকিছু খুলে দিচ্ছে। ফলে দীর্ঘ দেড়যুগ শেখ হাসিনাকে খুশি করতে যারা বেগম খালেদা জিয়াকে গালিগালাজ করেছে, তারেক রহমানকে গালিগালাজ করার প্রতিযোগিতা করেছে, তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন বঞ্চিত থাকা বিএনপি অনুসারী সংস্কৃতিসেবীদের একাকার করা হচ্ছে।

কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের দলীয় নেতাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চত করতে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা গংরা সব কিছুতেই দলীয় রাজনীতিকে প্রাধান্য দিতেন। ফলে কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সব সেক্টরের নেতাকর্মী ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করেছে; আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে। যার কারণ জুলাই অভ্যুত্থানে হাসিনা পালানো এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পরও আওয়ামী লীগের ব্যানারে মিছিল হচ্ছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে শেখ হাসিনা নিজের অনুসারী সৃষ্টি করে গেছেন। কিন্তু দীর্ঘ ২০ বছর পর ক্ষমতায় এসে বিএনপির মন্ত্রী-এমপিরা নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ঠিকই নিচ্ছেন; কিন্তু দলীয় নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করে ‘দলনিরপেক্ষ প্রশাসন’ চালানোর ভাব ধরেছেন। এতে একদিকে দীর্ঘদিন থেকে জুলুম-নির্যাতন সহ্য করা দলীয় নেতাকর্মীদের স্বপ্ন ভাঙছে এবং তাদের নামের সঙ্গে চাঁদাবাজ ট্যাগ লাগছে; অন্যদিকে হাসিনার অলিগার্করাও প্রকাশ্যে চলে আসছেন। এভাবে চলতে থাকলে সামনের স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপিকে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে। বিএনপির জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতাই বলতে শুরু করেছেন, ক্ষমতা কেবল মন্ত্রী-এমপি ও তাদের আত্মীয়-স্বজনরা ভোগ করবেন আর নেতাকর্মীরা দলীয় আনুগত্যে কেবল তাদের সেবা দিয়ে যাবেনÑ সেটি হবে না। তথাকথিত নিরপেক্ষতার ভান করে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করা হলে স্থানীয় নির্বাচনে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য।