স্মরণকালের সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন। তীব্র গরমে ঘরে টেকা দায়। তার ওপর যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল। ব্যবহারের চেয়ে অনেক বেশি বিলের চাপ। প্রতি বছর মে-জুন মাস এলেই এই যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় সাধারণ মানুষকে, যা নিয়ে হইচই হয় কিছুদিন। তারপর সব শান্ত। মাঝখান থেকে গ্রাহকের পকেট কাটে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো।
ঘুরেফিরে বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে কেন এমন ভুতুড়ে বিল? এর কারণ খুঁজতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর অন্তত তিনটি অপকৌশলের তথ্য পেয়েছে আগামীর সময়।
প্রথমত বিতরণ কোম্পানিগুলো বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) বিদ্যুৎ অপচয় ও চুরির মাধ্যমে তৈরি হওয়া মাত্রাতিরিক্ত সিস্টেম লস কমাতে গ্রাহকের কাঁধে বাড়তি বিলের বোঝা চাপানো হয়। দ্বিতীয়ত, জুন ক্লোজিংয়ে বকেয়া মাস কমিয়ে আয় বাড়ানো এবং তৃতীয়ত মিটার রিডারদের গাফিলতি।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৫ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন। যার মধ্যে আরইবির গ্রাহক প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ৫৮ হাজার। মোট গ্রাহকের মধ্যে প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৫৫ লাখ। যাদের ক্ষেত্রে মিটারে ত্রুটি ছাড়া ভুতুড়ে বিলের সুযোগ নেই। তবে বাকি যে বিপুলসংখ্যক পোস্টপেইড গ্রাহক রয়েছেন, সেখানেই মূলত বিদ্যুৎ বিলে কারসাজি হয়। আর বেশিরভাগ পোস্টপেইড গ্রাহকই আরইবির। সংস্থাটি দেশ জুড়ে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
সিস্টেম লস কমানো ও আয় বাড়াতে বাড়তি বিল: বিতরণ কোম্পানিগুলো জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কিনে তা গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণের সময় বৈদ্যুতিক তার, ট্রান্সফরমার এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশের নিজস্ব রোধ বা বাধার কিছু বিদ্যুৎ অপচয় হয়। এই কারিগরি লোকসানই মূলত সিস্টেম লস। বিশ্ব জুড়ে এটি গ্রহণযোগ্য। তবে বাংলাদেশে বিতরণ কোম্পানিগুলোর বিশেষ করে আরইবির সিস্টেম লস অনেক বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরইবির সিস্টেম লসের পরিমাণ ৮.৫১ শতাংশ। আগের বছরে তা ৮.১৬ শতাংশ ছিল। সিস্টেম লস যত বাড়বে আর্থিক ক্ষতিও তত বাড়বে।
নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করা, দীর্ঘ বিতরণ লাইন, ওভারলোডেড ফিডারের পাশাপাশি বিদ্যুৎ চুরি ও অপচয়ের কারণে সিস্টেম লস বেড়ে যায় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। বিতরণ কোম্পানিগুলোর সেই ব্যর্থতা ও দুর্নীতির দায় চাপে গ্রাহকের ওপর। তারা গ্রাহকের কাছ থেকে ব্যবহারের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আদায় করে সিস্টেম লস কমানোর মতো অপকৌশল করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কয়েকজন কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানান, প্রতি বছর সমিতিগুলোকে সিস্টেম লস কমানোর টার্গেট দেয় আরইবি। সেই টার্গেট পূরণ না হলে জুন ক্লোজিংয়ের আগে বাড়তি বিল করারও মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে। যদিও লিখিত নির্দেশনা না থাকায় এর প্রমাণ জোগাড় করা সম্ভব হয়নি।
তাদের বক্তব্য হলো— প্রত্যন্ত এলাকায় গাছপালার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বিতরণ লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণেই এমনিতেই অন্যান্য বিতরণ কোম্পানির তুলনায় সিস্টেম লস বেড়ে যায়। এরপর আবার আরইবির সরবরাহ করা নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারে তা বেড়ে যায় আরও। আবার সমিতিকে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি কিনতে হয় আরইবির কাছ থেকে। সেক্ষেত্রে আরইবি মুনাফা করে। এতে বাজারদরের চেয়ে মূল্য অনেক বেশি। এই বাড়তি দাম বহন করা বেশিরভাগ সমিতির পক্ষে সম্ভব হয় না। তখন রক্ষণাবেক্ষণ কাজে বিঘ্ন হয়। আর এতে বেড়ে যায় সিস্টেম লস।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এই সিস্টেম লস কমানোর তখন একমাত্র উপায় থাকে গ্রাহকের কাঁধে বাড়তি বিলের বোঝা চাপানো। অনেকে আবার আরইবির সুনজরে থাকতে পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধির জন্যও বেছে নেন এই কৌশল।
আরেক কর্মকর্তা বলেছেন, যেসব কর্মকর্তারা একটু চতুর। তারা জুনের দুই-তিন মাস আগে থেকেই অল্প অল্প করে বাড়তি বিল তৈরি করেন, যাতে গ্রাহক বুঝতে না পারেন। অবশ্য কোনো কোনো কর্মকর্তারা এসব অপকর্ম করেন না।
আলাপকালে তারা আরও জানিয়েছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জুলাই মাস থেকে এই বাড়তি বিল আবার সমন্বয় করা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত বিলের কারণে গ্রাহকের স্লাব পরিবর্তনে যে বাড়তি টাকা চলে যায়, তা আর ফেরত আসে না। কারণ স্লাব অনুযায়ী গ্রাহক যত বেশি ব্যবহার করবে, ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দামও তত বাড়তে থাকে।
প্রতি বছর মে-জুনে বাড়তি বিল নিয়ে হইচই হওয়ার পেছনে যে সিস্টেম লস কমানোর কৌশল নেওয়া হয়, তার বেশ কিছু নমুনা আগামীর সময়ের হাতে এসেছে।
এর একটি সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২। এই সমিতির ২০২৪ সালের জুন মাসে সিস্টেম লস ছিল ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। মাত্র এক মাস পর জুলাই মাসে তা এক লাফে বেড়ে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ হয়। পরের বছর জুনে সিস্টেম লস ১১ দশমিক ৮৯ শতাংশ দেখানো হলেও জুলাই মাসে দেখানো হয় ২১ দশমিক ১৬ শতাংশ।
গত বছরের জুন মাসে চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এ সিস্টেম লস ২ দশমিক ২৩ শতাংশ দেখানো হয়। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ।
নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এ ২০২৪ সালের জুনে সিস্টেম লস ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ থেকে জুলাই মাসে সিস্টেম লস বেড়ে হয় প্রায় দ্বিগুণ (৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ)। এর পরের বছর তা যথাক্রমে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং ৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
মানিকগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ২০২৪ সালের জুনে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ সিস্টেম লস থেকে বাড়িয়ে জুলাই মাসে ১১ দশমিক ৭৩ শতাংশ করা হয়। পরের বছর জুন ও জুলাই মাসে তা ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ১০ দশমিক ৬ শতাংশ।
চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩-এ গত বছরের জুন মাসে সিস্টেম লস দেখানো হয় ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। পরের মাসেই তা বেড়ে ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ দাঁড়ায়।
২০২৪ সালের জুন মাসে যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এ সিস্টেম লস ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ দেখানোর পর জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। আর গত বছর সেখানে জুন ও জুলাই মাসে সিস্টেম লস ছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ৩১ এবং ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ।
পল্লী বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিস্টেম লস কমানোর পাশাপাশি বকেয়া কমিয়ে আয় বাড়ানোরও একটি টার্গেট দেয় আরইবি। এই টার্গেট পূরণের জন্যও কোনো কোনো সমিতির ঊর্ধ্বতনরা বাধ্য হয়েই বাড়তি বিল করেন।
মিটার রিডারদের গাফিলতি: বিল তৈরি করেন মিটার রিডাররা। তাদের নিয়োগ চুক্তিভিত্তিক, বেতন তুলনামূলক কম। নিয়ম হলো— প্রত্যেক গ্রাহকের আঙিনায় গিয়ে মিটার রিডিং নেওয়া। কিন্তু বেশিরভাগ রিডার সব গ্রাহকের কাছে যান না। অনেক সময় গ্রাহক যাই ব্যবহার করেন না কেন, আগের মাসের বিলের সঙ্গে আনুমানিক একটা হিসাব ধরে বিল করেন। সেক্ষেত্রে কখনো বিল কম বা বেশি হয়।
আবার এসব মিটার রিডাররা সাধারণত ছয় মাস করে একেক এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। নতুন কেউ এলে তিনি প্রথমবার সব গ্রাহকের কাছে গিয়ে বিল করেন। তখন প্রকৃত রিডিং নেওয়ার সময় গরমিল হয়। জুন ক্লোজিংয়ের সময় এর প্রভাব পড়ে।
বিদ্যুৎ বিভাগের উদ্যোগ: অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ পেয়ে সব বিতরণ সংস্থাকে তা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। একই সঙ্গে গ্রাহককে সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থার কার্যালয়ে গিয়ে কিংবা নির্দিষ্ট হটলাইনে অভিযোগের পরামর্শ দিয়েছে। কাজটি সমন্বয় করছেন বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (সমন্বয়) মোহাম্মদ সানাউল হক। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়টি খুবই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্দেশনা পেয়ে বিতরণ সংস্থাগুলো কাজ করছে। তাদের প্রতিবেদন হাতে পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম আগামীর সময়কে বললেন, আরইবিসহ অন্যান্য বিতরণ সংস্থাগুলোতে সিস্টেম লস কমানোর এই অপকৌশল সম্পর্কে অনেকেই জানেন। কিন্তু কেউ ব্যবস্থা নেয় না। কারণ বিদ্যুৎ খাতে সেবা দেওয়ার পরিবর্তে লুণ্ঠন হচ্ছে। পুরো সিস্টেম অসততার মনোবৃত্তির কাঠামোর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ফলে মানুষ জ্বালানির সুবিচার পাচ্ছে না।
‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তন দরকার। সেই পরিবর্তন হবে জনগণ শক্তিশালী হলে। কিন্তু মানুষের প্রতিবাদ ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। সবাই সবকিছু মেনে নিচ্ছে। এটাই আসলে বড় সংকট’— যোগ করেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা বলছিলেন, সিস্টেম লস কমানো এবং আয় বাড়ানোর জন্য ওপর থেকে চাপ দেওয়ার কারণেই নিচের দিকের কর্মীরা তা বাধ্য হয়ে করেন। আবার তারাই গ্রাহকের রোষের মুখে পড়ছে। কিন্তু যারা এই চাপ দিচ্ছে তাদের কিছুই হচ্ছে না।
মোশাহিদা সুলতানার ভাষায়, আরইবি সমিতিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা পালন করে আসছে। তারা নানাভাবে কর্মীদের চাপ দেয়। সেটা না মানলে বদলি, চাকরিচ্যুতির হুমকি দেয় এবং কখনো কখনো তা করেও। এগুলো বন্ধ করতে হবে। এসব অপকর্মের জন্য ওপরের যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিলে এসব বন্ধ হবে।
মোশাহিদা সুলতানা বলছিলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ ভুতুড়ে বিলের অভিযোগ দিতে বলেছে। কিন্তু এত অভিযোগ কত দিনে তারা নিষ্পত্তি করবে? অভিযোগ দায়ের এবং নিষ্পত্তিতে যে ভোগান্তি, তাতে অনেকেই তো এ পথে না গিয়ে মেনে নিচ্ছেন।
‘এগুলো করে ফল আসবে না। এর চেয়ে বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়, বিক্রয় এবং অন্যান্য পরিসংখ্যান নিয়ে সহজেই এর প্রমাণ করতে পারে বিদ্যুৎ বিভাগ’— যোগ করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক।
ভুতুড়ে বিলের কিছু নমুনা: ঢাকার মিরপুরের শামীম সরণি এলাকায় ডেসকোর গ্রাহক মাহবুব আলম লাবলু। মে মাসে তার বিদ্যুৎ বিল ছিল ৪ হাজার ৬২২ টাকা। জুনে তা বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৯৬৩ টাকা।
লাবলু জানালেন, সাধারণত তার বিদ্যুৎ বিল ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজারের মধ্যেই থাকে। হঠাৎ করে মে এবং জুন মাসে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। অথচ বাসায় বিদ্যুৎ ব্যবহার আগের মতোই রয়েছে।
মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরীতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতার স্টার অ্যাগ্রো প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজের একটি বিল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মার্চ মাসে কারখানাটির বিদ্যুৎ বিল ছিল প্রায় ৪৩ হাজার টাকা। এপ্রিলে ১ লাখ ৬ হাজার টাকা এবং মে মাসে তা আরও বেড়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা হয়।
কারখানাটির একজন কর্মকর্তা জানালেন, অন্যান্য সময়ের চেয়ে এপ্রিল-মে মাসে কারখানার কার্যক্রম তুলনামূলক কম থাকায় বিদ্যুৎ বিল কম হওয়ার কথা। কিন্তু উল্টো বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে।
গোপালগঞ্জের চাঁদমণি রোড এলাকার বাসিন্দা তাজুল ইসলাম চৌধুরী। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের এই গ্রাহক জানালেন, সাধারণত তার সর্বোচ্চ মাসিক বিদ্যুৎ বিল হয় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। কিন্তু এ মাসে বিল এসেছে ১ হাজার ৮১১ টাকা।