দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগকে ঘিরে প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নীরব দৌড়। আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ মুখ না খুললেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা। বিভিন্ন মহলে ঘুরছে একাধিক সাবেক বিচারক, অবসরপ্রাপ্ত আমলা, দুদকের সাবেক কর্মকর্তা এবং সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের নাম। গতকাল গঠিত দুদক সার্চ কমিটি সুপ্রিমকোর্টের জাজেস লাউঞ্জে ১ম সভা করেছে। দুদক কমিশন গঠনের জন্য তারা রাষ্ট্রপতির কাছে নাম প্রস্তাব করবেন।
দুদক, জনপ্রশাসন ও বিচার বিভাগ-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেন। পাশাপাশি সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকার, সাবেক বিচারপতি আসাদুজ্জামান, সাবেক যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর, সাবেক অতিরিক্ত সচিব তাহসিনুর রহমান, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন, দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মুনীর চৌধুরী এবং অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার নামও আলোচনায় রয়েছে। সচিবালয়ের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারের নামও অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় এসেছে।
আলোচনায় যে দুই বিচারক: সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেন ঢাকা মহানগর আদালতে সিনিয়র স্পেশাল জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ আদালতের বিচারক হিসেবে তিনি দুর্নীতি, আর্থিক অপরাধ এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে ২০১৩ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেয়ার রায় দেশ জুড়ে আলোচিত হয়েছিল। পরে তার বিরুদ্ধেও অবৈধ সম্পদের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু হলেও তা নিষ্পত্তি হয়। ২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ওই মামলার রায় দেয়ার আগে তাকে অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন আরেক বিচারক মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকার। ফেনীতে একটি নির্বাচন মামলার রায়কে কেন্দ্র করে তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম তাকে একাধিকবার ডেকে নির্দিষ্ট পক্ষের অনুকূলে রায় দেয়ার চাপ দেন। কিন্তু তিনি তা না করায় তাকে ওএসডি করা হয়।
সার্চ কমিটির হাতে শেষ সিদ্ধান্ত নয়: গত ২২শে জুন পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করেছে সরকার। কমিটি চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদের প্রতিটির বিপরীতে অন্তত দুইজন করে নাম প্রেসিডেন্টের কাছে সুপারিশ করবে। সেখান থেকেই হবে চূড়ান্ত নিয়োগ। তবে দুদকের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আলোচনায় থাকা নামগুলোই যে শেষ পর্যন্ত নিয়োগ পাবেন- এমন নিশ্চয়তা নেই; বরং শেষ মুহূর্তে সম্পূর্ণ নতুন মুখও সামনে আসতে পারে। তাই এখন নজর সার্চ কমিটির সুপারিশ এবং প্রেসিডেন্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। আজ সার্চ কমিটির প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
যেভাবে চেয়ারম্যান-কমিশনার নিয়োগ হয়: আইনের ধারা ৫ অনুযায়ী, একটি স্বতন্ত্র কমিশন হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশন গঠিত হবে। ধারা ৫(২)-এ বলা হয়েছে, কমিশন একজন চেয়ারম্যান ও দু’জন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত হবে। অর্থাৎ, ২০০৪ সালের মূল আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যানসহ কমিশনের সদস্য সংখ্যা তিনজন। চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের বিষয়ে আইনের ধারা ৬(১)-এ বলা হয়েছে, তাদের নিয়োগ দেবেন প্রেসিডেন্ট। তবে প্রেসিডেন্ট সরাসরি কাউকে নিয়োগ দেন না। ধারা ৬(২) অনুযায়ী, বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ দেন। এ ছাড়া ধারা ৬(৩) অনুযায়ী, পাঁচ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদের জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের নাম সুপারিশ করে। ফলে কমিশনের নেতৃত্ব নির্বাচনে একটি স্বাধীন সার্চ কমিটির ভূমিকা নিশ্চিত করা হয়েছে। আইনের ধারা ৭ অনুযায়ী, চেয়ারম্যান বা কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সততা, সুনাম ও পেশাগত দক্ষতার অধিকারী হতে হবে। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইন, পুলিশ, রাজস্ব, হিসাব নিরীক্ষা বা সমজাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মধ্য থেকে তাদের নিয়োগ দেয়ার বিধান রয়েছে। তবে নৈতিক স্খলনজনিত কোনো অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তি এ পদে নিয়োগের যোগ্য নন। আইন অনুযায়ী, চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের মেয়াদ দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছর। তবে ৬৫ বছর বয়স পূর্ণ হলে তারা আর এ পদে বহাল থাকতে পারবেন না।
অপসারণের বিষয়ে আইনের ধারা ১০-এ বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান বা কোনো কমিশনারকে কেবল সংবিধানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের জন্য নির্ধারিত পদ্ধতি ও একই ধরনের কারণের ভিত্তিতেই অপসারণ করা যাবে। অর্থাৎ, নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছামতো তাদের অপসারণের সুযোগ নেই; এ ক্ষেত্রে আইন ও সংবিধানে নির্ধারিত প্রক্রিয়াই অনুসরণ করতে হবে। এ ছাড়া কোনো চেয়ারম্যান বা কমিশনার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে চাইলে তিনি প্রেসিডেন্টের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারবেন।