মাদারীপুরে ডাসার উপজেলার কর্ণপাড়ায় দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত এবং চারজন আহত হন। ১৫ জুন এ দুর্ঘটনা ঘটলে স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান। অথচ দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসায় মাদারীপুরের শিবচরে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ট্রমা সেন্টার। উদ্বোধনের চার বছর পার হলেও চালু হয়নি সেন্টারটি।
শুধু এই ট্রমা সেন্টার নয়, দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাতে ১৪০ কোটি টাকায় তৈরি ১৮টি ট্রমা সেন্টারের ১২টিই পড়ে আছে অচল অবস্থায়। চালু না হওয়ায় নষ্ট হচ্ছে, চুরি যাচ্ছে যন্ত্রপাতি, আসবাব। অচল পড়ে আছে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, মুন্সিগঞ্জ, সাভার, চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও রাউজান, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের ট্রমা সেন্টার। অন্য হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে, নয়তো কোনোরকম খুঁড়িয়ে চলছে গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া ও কুমিল্লার ট্রমা সেন্টার।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে ট্রমা সেন্টারগুলো চালু করতে পারিনি। সেবাবঞ্চিত হয়েছে মানুষ। আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ট্রমা সেন্টারগুলো চালু করতে মন্ত্রণালয়ে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেব।’
জানা গেছে, প্রতিটি ট্রমা সেন্টারে সাতজন পরামর্শক চিকিৎসক (কনসালট্যান্ট), তিনজন অর্থোপেডিকস সার্জন, দুজন অ্যানেসথেটিস্টসহ (অবেদনবিদ) মোট ১৪ জন চিকিৎসক এবং সব মিলিয়ে ৩৪টি পদ সৃজনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো সেন্টারেই পদ অনুযায়ী জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরঞ্জামও দেওয়া হয়নি। যে হাসপাতাল দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচানোর শেষ ভরসা হওয়ার কথা ছিল, তা পরিণত হয়েছে মাদকসেবীদের আস্তানায়। প্রাণ বাঁচাতে গুরুতর আহত রোগীদের নিয়ে ঢাকায় ছুটে আসতে হয় স্বজনদের। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের উপজেলা হাসপাতালগুলোতে নেওয়া হলে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রেফার্ড করে দেওয়া হয়। অবস্থা গুরুতর হলে কিংবা আইসিইউ দরকার হলে জেলা হাসপাতালেও মেলে না সেবা। বিশেষায়িত হাসপাতালে আনতে গিয়ে পথেই প্রাণ যায় রোগীর।
এ ব্যাপারে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘হার্ট ফাউন্ডেশন ও সিআইপিআরবির ২০২৩ সালের জরিপে দেখা যায়, দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে রোড ক্র্যাশ রোগীরা জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। এ ধরনের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে গাইনিসেবা ছাড়া দুর্ঘটনার জন্য যে ধরনের সেবা প্রয়োজন সেগুলো একেবারই অপ্রতুল। তার ওপর এ ধরনের ট্রমা সেন্টারগুলোর শুধু কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। নতুন কোনো ট্রমা হাসপাতাল কাঠামো না করে উপজেলা-জেলা পর্যায়ের হাসপাতাগুলোয় জরুরি সেবা প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে জরুরি সেবা প্রদানের জন্য যে ধরনের ব্যবস্থা থাকা দরকার তা নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার, ডাক্তার, নার্স প্রয়োজন। বিশেষায়িত হাসপাতালে পৌঁছাতে সময় নষ্ট হয়ে হতাহতের সংখ্যা ও জটিলতা বাড়ার শঙ্কা থাকে। তা ছাড়া আমাদের আইনি কাঠামোয় রোড ক্র্যাশ পরবর্তী রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিতে “গুড সামারিটান ল”র বিষয়টি নেই।
এ আইন থাকলে রোড ক্র্যাশ ঘটার পর হতাহতদের সাহায্য করার কারণে সাহায্যকারী ব্যক্তিকে কোনো ধরনের হয়রানি বা জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হবে না। এ ছাড়া একটি আইনি কাঠামোর প্রয়োজন যেখানে কোনো হাসপাতাল জরুরি সেবার ক্ষেত্রে অর্থের অভাবে রোগীকে ফিরিয়ে দেবে না।’ সিরাজগঞ্জ থেকে আব্দুস সামাদ সায়েম জানান, যমুনা সেতুর পশ্চিমপারে মহাসড়কের পাশে মুলিবাড়ীতে নির্মাণ করা হয়েছে ট্রমা সেন্টার। চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় লোকবল, সরঞ্জামাদির অভাবে দীর্ঘ পাঁচ বছরেও ট্রমা সেন্টারটি চালু হয়নি। পড়ে থেকে অবকাঠামো নষ্ট আর ভবনের মালামাল চুরি হচ্ছে। যমুনা সেতু পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম জানান, হাইওয়েতে প্রায়ই দুর্ঘটনায় মানুষের হাত-পা ভেঙে যায়, গুরুতর আহত হন। এমনকি হাসপাতালে নেওয়ার পথে অনেকে মারা যান। সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. নুরুল আমীন বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি চালু করার জন্য জনবল ও ওষুধের প্রয়োজনীয় চাহিদা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। নিরাপত্তাপ্রহরী থাকার পরও রক্ষা করা যাচ্ছে না মূল্যবান যন্ত্রপাতি।’
হবিগঞ্জ থেকে জাকারিয়া চৌধুরী জানান, ভবন নির্মাণের এক যুগ পেরিয়ে গেলেও চালু হয়নি বাহুবল ট্রমা সেন্টারটি। ফলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহতদের সিলেট নয়তো ঢাকায় যেতে হচ্ছে। কিশোরগঞ্জ থেকে সাইফউদ্দীন আহমেদ লেনিন জানান, ভৈরবে নির্মিত ট্রমা সেন্টারটি ছয় বছরেও চালু হয়নি। অযত্নে নষ্ট হচ্ছে আসবাব ও যন্ত্রাংশ। ভৈরব হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সুমন কুমার চৌধুরী বলেন, প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ছোটবড় দুর্ঘটনা ঘটছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আহতদের ঢাকায় পাঠাতে হয়। মাদারীপুর থেকে বেলাল রিজভী জানান, মাদকসেবীরা ট্রমা সেন্টারের এসিসহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করেছে।
মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ডা. শরিফুল আবেদীন কমল বলেন, ‘হাসপাতালটি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের চাহিদা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।’ মুন্সিগঞ্জ থেকে আবু সাঈদ সৌরভ জানান, মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার শোলঘরে ২০১৮ সালে নির্মিত ২০ শয্যার ট্রমা সেন্টারটি আট বছর পেরিয়ে গেলেও চালু হয়নি। ২ কোটি ২৯ লাখ টাকায় নির্মিত ভবন এখন পরিত্যক্ত, মাদকসেবীদের আড্ডাখানা। প্রতিনিয়ত ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। বগুড়া থেকে আবদুর রহমান টুলু জানান, শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ট্রমা সেন্টারের ভবন নির্মাণ করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি। শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমিরুল ইসলাম জানান, ট্রমা সেন্টারের ভবন নির্মিত হয়েছে। তবে সেখানে এখনো কোনো জনবল, প্রয়োজনীয় আসবাব ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়নি।
টাঙ্গাইল থেকে মো. নাসির উদ্দিন জানান, টাঙ্গাইলে ২০১১ সালে অত্যাধুনিক ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হলেও লোকবল, চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে অচল পড়ে আছে। জেলার একমাত্র ট্রমা সেন্টারে চলছে হাসপাতালের অন্য বিভাগের কাজ। শরীয়তপুর থেকে রোকনুজ্জামান পারভেজ জানান, জাজিরা উপজেলার একমাত্র ট্রমা সেন্টারটি এক যুগেও সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত হয়নি ও অনুমোদন পায়নি। ফলে প্রয়োজনীয় জনবল ও পদ সৃষ্টি না হওয়ায় কাক্সিক্ষত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না মানুষ। সুনামগঞ্জ থেকে মাসুম হেলাল জানান, সুনামগঞ্জের ট্রমা সেন্টার উদ্বোধনের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শুরু হয়নি সেবাকার্যক্রম। জেলা সিভিল সার্জন জসিম উদ্দিন বলেন, ‘প্রয়োজনীয় জনবল অনুমোদনের জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি।’
সাভার থেকে নাজমুল হুদা জানান, নির্মাণের এক যুগেও চালু হয়নি ঢাকার ধামরাইয়ের ট্রমা সেন্টার। ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আহমেদুল হক তিতাস বলেন, ‘আমরা চিঠি পাঠিয়েছি।’ ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে আসাদুজ্জামান সুমন জানান, ভালুকায় ১৯ বছরেও চালু হয়নি ট্রমা সেন্টার, নষ্ট হচ্ছে দামি যন্ত্রপাতি। মানিকগঞ্জ থেকে কাবুল উদ্দিন খান জানান, লোকবলের অভাবে ট্রমা সেন্টারে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। সিভিল সার্জন আইভী ফেরদৌস জানান, শিবালয় কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করার সময় ট্রমা সেন্টারে সংযুক্ত করা হয়। চার পদ ফাঁকা থাকার কারণে সেবা কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। গোপালগঞ্জ থেকে আমিনুল হাসান শাহীন জানান, সাড়ে ছয় বছর কেটে গেলেও পরিপূর্ণভাবে চালু হয়নি ট্রমা সেন্টারের কার্যক্রম। কোনোরকমে চালু রাখা হয়েছে বহির্বিভাগ। কুমিল্লা থেকে মহিউদ্দিন মোল্লা জানান, দাউদকান্দির শহীদনগর ট্রমা সেন্টারটি দুই দশকেও পুরোপুরি চালু হয়নি। তিন তলা ভবনের নিচতলায় জরুরি বিভাগ এবং চিকিৎসক-নার্সদের কক্ষ মিলিয়ে সীমিত পরিসরে কিছু সেবা চলছে।