জলাবদ্ধতা রাজধানী ঢাকার আদি সমস্যা। দফায় দফায় ঢাকায় নতুন মেয়র আসে, প্রশাসক আসে। বছর জুড়ে নানা পদক্ষেপ নেয় জলাবদ্ধতা নিরসনে। তবুও সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় ঢাকা। অনেক এলাকায় হাঁটু সমান বা তারও বেশি পানি জমে যায়। উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে ৬৫টি খাল থাকলেও সেগুলো অনেকটাই হুমকির মুখে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও অনেকটাই নাজুক।
সম্প্রতি বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকার এমন ১৪১টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থানগুলোর মধ্যে ১০৮টি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং ৩৩টি অবস্থিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়।
গত মঙ্গলবার সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকার জলাবদ্ধতার সমস্যা নিরসন প্রসঙ্গে বলেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ১০৮টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ হটস্পট চিহ্নিত করে সেগুলোর স্থায়ী সমাধানে কাজ করছে। একইসঙ্গে ১০টি অঞ্চলে ২১টি কুইক রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। এসব দল নিয়মিত পিট, ক্যাচপিট, ড্রেনেজ লাইন ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো পরিষ্কার করছে, যার ফলে বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা দ্রুত কমে এসেছে।
তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিএনসিসি ১১০ দশমিক ৯৩ কিলোমিটার রাস্তা এবং ১০৫ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার নর্দমা নির্মাণ ও উন্নয়ন করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও ১১৫ কিলোমিটার রাস্তা এবং ১২০ কিলোমিটার নর্দমা নির্মাণ ও উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। মন্ত্রী বলেন, খালের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে ৩৬০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়মিত খাল পরিষ্কারের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। এ ছাড়া ২৯টি খাল ও একটি রেগুলেটিং পন্ডের সীমানা নির্ধারণ এবং খালের পাশে এক হাজার ১৮১টি সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়েছে, যাতে অবৈধ দখল রোধ করা যায়।
এর আগে, ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের সময়ে জলাবদ্ধতা নিরাময় শীর্ষক ব্লু নেটওয়ার্ক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হাতে নেয়। যেখানে, খাল ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসা থেকে ডিএনসিসি’র কাছে ন্যস্ত করা হয়। এর বাইরেও প্রায় ১ হাজার ২৫০ কিলোমিটার ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার করার কর্মসূচি, বর্ষা মৌসুমের বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ড্রেন ও কালভার্ট পরিষ্কার করা, লাখ লাখ টন বর্জ্য খাল থেকে অপসারণসহ নানা ধরনের কাজ করছে বলে সিটি করপোরেশন জানায়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এর সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান মানবজমিনকে বলেন, আমরা শহর করার জন্য পানি চক্র নষ্ট করে ফেলেছি। পানিচক্রের সিম্পল লজিক হচ্ছে যে, যখন জলীয় বাষ্প হয়, সেটা মেঘ হয়ে বৃষ্টি পড়ে। বৃষ্টির পানি ‘পানি’ হওয়ার পরে দুইটা ঘটনা ঘটে। একটা হচ্ছে যে, গড়িয়ে হচ্ছে যে নিচের দিকে চলে যায়। আরেকটা হচ্ছে যে, ইনফিল্ট্রেশন হয়ে গ্রাউন্ড ওয়াটারে চলে আসে।
তিনি বলেন, ঢাকায় ইনফিল্ট্রেশন হওয়ার জায়গা নাই, সব আমরা পাকা করে ফেলেছি। শহরে যে ন্যাচারাল ড্রেনেজ সিস্টেম ছিল, অনেকগুলো খাল ছিল, সেই খালগুলো আমরা নষ্ট করে ফেলেছি। ফলে ড্রেনেজ সিস্টেমের ক্যাপাসিটি অনেক কমে গেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মানবজমিনকে বলেন, বৃষ্টি হলে পানি জমবে, জলাবদ্ধতা হবেই। কিন্তু পানি তাড়াতাড়ি নেমে যাওয়ার জায়গা থাকতে হবে। এগুলো ভরাট হয়ে গেছে। সেই জায়গাগুলো যেমন বক্স কালভার্ট, যা যুগ যুগ ধরে কোনো ধরনের পরিষ্কার করা হয় না। খালগুলো একদম মাটি জমাট হয়ে সিমেন্টের মতো শক্ত হয়ে গেছে। এগুলো যদি অন্ততপক্ষে দুই বছর অন্তর অন্তর খনন বা পরিচর্যা, মনিটরিংয়ের মধ্যে রেখে পরিষ্কার করতো, এমন পরিস্থিতি হতো না। এখন সব খালই ভরাট। যখনই ভারীবর্ষণ হয়, তখন আমাদের উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রায় ৪০০-র মতো কুইক রেসপন্স টিম স্পটে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ওই এলাকার ময়লা-আবর্জনা, ক্যাচ ইনলেট যেখানে থাকে, সেখানে প্লাস্টিক জমা হয়ে যায় সেসব সরিয়ে দিয়ে আসে। ফলে পানি নেমে যায়।
আমরা এখন খালগুলো পরিষ্কার করছি। এই খালগুলো পরিষ্কার করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করছি। সেখানে আবার অবৈধভাবে খালের উপরে অবৈধ স্থাপনা তৈরি হয়ে গেছে। এটা নিয়েও আমরা কাজ করছি। উত্তর সিটির ২৯টি খাল রয়েছে, সবগুলো একসঙ্গে উদ্ধার হয়তো সম্ভব নয়। বড় খালগুলো দেখে দেখে, যেখানে হটস্পট এবং যে খালের উপর হটস্পটগুলো নির্ভর করে সেখানে আগে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে। খাল যখন উদ্ধার হয়ে যাবে পানি প্রবাহ সচল থাকবে। তখন আর এই জলাবদ্ধতা থাকবে না, ৯০ শতাংশ কমে যাবে।
সিটি করপোরেশনে পর্যাপ্ত জনবল নেই, টেকনিক্যাল জনবল সংকট রয়েছে জানিয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার পরে এই কথাগুলো বলেছি যে, আমাদের যেই পরিমাণ জনবল এবং কর্মী দরকার জলাবদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতা, মশক নিয়ন্ত্রণে- সেই পরিমাণ কর্মী আমাদের নাই। আমরা ইতিমধ্যে কিছু নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছি এসব কাজ করার জন্য। অফিশিয়াল কাজ, রাস্তায় পরিচ্ছন্ন কাজ, আউটসোর্সিংয়ের জন্য আমরা বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি।