Image description

দেশে সিনথেটিক মাদকে ভয়াল বিস্তার শুরু হয়েছে। শহর থেকে গ্রামে এটি ছড়িয়ে দিয়েছে মাদক কারবারিরা। বিশেষ করে সিনথেটিক মাদক আইস ও ক্রিস্টাল মেথের বেচাকেনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। আর সবচেয়ে ভাবনার বিষয় এসব ভয়ঙ্কর মাদকে ঝুঁকছে তরুণরাই। কারণ দেশে এই ড্রাগ কেনাবেচার সঙ্গে জড়িতদের প্রায় সবাই তরুণ। মাদকের বিস্তারে সবচেয়ে ঝুঁকিতে ১৬ থেকে ৩০ বছরের তরুণরা। এসব তরুণদের অধিকাংশই নামিদামি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যই সিনথেটিক মাদকের চালান ও মাদকসেবীদের সন্ধান পাচ্ছেন।

ডিএনসি কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে নতুন নতুন রাসায়নিক বা সিনথেটিক মাদকের প্রবেশ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যান্স’ হিসেবে পরিচিত এমডিএমএ, এলএসডি, সিনথেটিক ক্যানাবিনয়েডস, ট্যাপেন্টাডল, বুপ্রেনরফিন এবং কুশ-এর মতো মারাত্মক মাদকের বিস্তার ঘটছে। পাচারকারীরা মাদকের বাজারে বৈচিত্র্য আনছে। বিক্রির কৌশলেও ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিতে চক্রগুলো এখন ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড অ্যাপস এবং অনলাইন ব্ল্যাকমার্কেট বা ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করছে। ফলে অনলাইনে খুব সহজে মাদক লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা জটিল হয়ে উঠছে। পাচারের জন্য স্থলপথের পাশাপাশি নদীপথ, সমুদ্রপথ ও আকাশপথকেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

ডিএনসি বলছে, মাদকাসক্ত ও মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িতদের একটি বিশাল অংশ ১৬-৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী। যুবশক্তি মাদকের জালে জড়িয়ে পড়ায় পারিবারিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে এবং অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহর এবং সীমান্তসংলগ্ন জেলাগুলো মাদক পাচার ও ব্যবহারের প্রধান কেন্দ্র বা ‘হাব’ হিসেবে কাজ করছে।

ডিএনসি’র বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগার এবং বিভাগীয় ফরেনসিক ল্যাবরেটরিগুলোতে ২০২৫ সালে জব্দকৃত মাদকের ১৯ হাজারের বেশি নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নমুনাগুলোর বেশির ভাগের ফলাফলে নিষিদ্ধ মাদক বা নিয়ন্ত্রিত উপাদানের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে ডিএনসি মাদক শনাক্তকরণে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন জিসি-এমএস, এইচপিএলসি এবং এফটিআইআর ব্যবহার করছে। যার ফলে নতুন সিনথেটিক মাদকগুলো দ্রুত ও নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

ডিএনসি সূত্র বলছে, দেশের অবৈধ মাদকের বাজারে এখনো অ্যাম্পেটামিন-টাইপ স্টিমুল্যান্ট, বিশেষ করে ইয়াবা এবং ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের আধিপত্য বেশি। গত এক বছরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত অভিযানে প্রায় চার কোটি ৩৫ লাখ ৬০ হাজার (৪৩.৫ মিলিয়ন) পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এ ছাড়া ভয়াবহ সিনথেটিক মাদক ‘আইস’ বা ক্রিস্টাল মেথের চোরাচালানও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি সৃষ্টি করছে। গাঁজা, হেরোইন, কোডিনযুক্ত সিরাপ (ফেনসিডিল) এবং ইনজেকশনযোগ্য মাদকের বিস্তারও অব্যাহত রয়েছে।

ডিএনসি বলছে, মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের অন্যতম ট্রানজিটে পরিণত করেছে। শুধু তাই নয়, এই মাদকের বিশাল এক বাজারে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট এবং গোল্ডেন ওয়েজের মতো বৈশ্বিক মাদক উৎপাদন কেন্দ্রগুলো থেকে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে মাদক পাঠানো হয়। আর যেসব রুটে মাদক পাঠানো হয় তার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মেহেদী হাসান মানবজমিনকে বলেন, সিনথেটিক মাদকের অনেক চালান ও এর সঙ্গে জড়িতদের আমরা আটক করেছি। আমরা এমডিএমবি, কেটামিন মাদক উদ্ধার করেছি।