আট বছর আগে রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রী এলাকায় গৃহকর্মী হাওয়া আক্তারকে নির্যাতনের মামলায় মানবাধিকারকর্মী মোস্তাকিন শরীফ এবং তার স্ত্রী জান্নাতুল নাঈমাকে গত ২৮ জুন সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর খিলগাঁও থানার দক্ষিণ বনশ্রী এলাকার একটি বাসা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় ১৪ বছর বয়সি হাওয়া আক্তারকে মোস্তাকিন শরীফের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়। জানা যায়, কাজের ভুলের অজুহাতে হাওয়াকে প্রায়ই গালিগালাজ, লোহার খুন্তি ও রড দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। শিশুটিকে তার পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গেও দেখা করতে দেওয়া হতো না। শিশু গৃহকর্মী হাওয়া আক্তারের নির্যাতনের মামলায় অপরাধীদের শাস্তি পেতেই আট বছর লেগে গিয়েছে। এ ধরনের অনেক ঘটনায় দেশে মামলা পর্যন্ত হয় না। আবার টাকার বিনিময়ে আপোস হয়ে যায় অনেক গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলা। সামান্য ত্রুটি পেলেই গৃহকর্ত্রী বা গৃহকর্তারা গৃহকর্মীদের ওপর চালায় অকথ্য নির্যাতন। চড়-থাপ্পড়, লাথি-ঘুষিতেই থামে না অমানবিকতা।
গায়ে গরম খুন্তি, জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে, চিমটি দিয়ে গায়ের মাংস তুলে নিয়ে, মাথা ফাটিয়ে ও হাত-পা ভেঙে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। দিন-রাত গাধার খাটুনি খাটিয়েও দেওয়া হয় না পর্যাপ্ত খাবার। কাজের ভুলে মাথার চুল কেটে দেওয়া, গরম পানি দিয়ে শরীর ঝলসে দেয়া, ঘরবন্দি করে রাখা হয় গৃহকর্মীদের। কখনোবা ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয় গৃহকর্মীদের। চার দেয়ালেই চাপা পড়ে যায় তাদের আর্তনাদ। এই নির্যাতন বন্ধে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারহীনতার কারণেই দোষীরা বারবার গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের সাহস পাচ্ছে। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি ২০১৫ থাকলেও এর বাস্তবায়ন নেই। গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন বন্ধে নির্যাতনকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে সুবিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি সরকারের কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বেশ কয়েকটি গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় দেখা যায়, যারা গৃহকর্মী নির্যাতনের সঙ্গে যুুক্ত এদের কেউ পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কেউ বিমানের সাবেক এমডি, সরকারি সংস্থার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, কেউ আইটি ইঞ্জিনিয়ার, আছেন মানবাধিকারকর্মীও।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আসামিরা ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণের নামে আর্থিক সুবিধা দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। গ্রেপ্তারের পর আসামিরা জামিনে মুক্ত হয়ে আসেন। আবার বিচার কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিল্স-এর ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি বাস্তবায়ন নিরীক্ষা এবং উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, আবাসিক শ্রমিকদের ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৬৪ শতাংশ গৃহশ্রমিক জানান, তাদের কোনো সাপ্তাহিক বা মাসিক ছুটি নেই। ৩১ দশমিক ৫৮ শতাংশ আবাসিক ও ৩৬ দশমিক ৪২ শতাংশ অনাবাসিক গৃহশ্রমিক বলেছেন তাদের শারীরিক ও মানসিক চাপ নিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে শ্রম দিতে হচ্ছে। আবাসিক শ্রমিকদের ৪১ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং অনাবাসিক শ্রমিকদের ২৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ গালিগালাজের শিকার হন। ১৮ বছরের কম বয়সিদের ৫০ শতাংশই কোনো না কোনো ধরনের নিপীড়নের শিকার হন। ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ আবাসিক এবং দশমিক ৫৮ শতাংশ অনাবাসিক গৃহশ্রমিক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরে পাঁচজন গৃহকর্মী নির্যাতিত এবং দুজনকে হত্যা করা হয়। আর ২০২৫ সালে ৯ জনকে হত্যা, পাঁচজন নির্যাতন এবং তিনজন আত্মহত্যা করেন। আর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৪০ জন। এর মধ্যে আইনি প্রক্রিয়ায় গিয়েছে মাত্র ৫০টি ঘটনা। অর্থাৎ প্রায় ৬৫ শতাংশ নির্যাতনের ঘটনাই আদালত কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথিতে পৌঁছায় না।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে শিশু গৃহকর্মী রিক্তা মনিকে গত ১৯ জুন ভবন থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় পাউবোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সবিবুর রহমান (৪৬) ও তার স্ত্রী ফারাহ নুসরাত (৪০) গ্রেপ্তার হয়েছেন। ভুক্তভোগী রিক্তার বয়স ৯ বছর। শিশুটিকে সবিবুর ও তার স্ত্রী ফারাহ শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করত। ১৯ জুন সকালে ধানমন্ডির ওই বাসার ১১ তলা ভবনের বারান্দা থেকে রিক্ত নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করে। এর আগে ১৮ জুন খুলনার সোনাডাঙ্গায় এক গৃহকর্মীকে গরম কড়াই দিয়ে ছ্যাঁকা দিয়ে নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়। এ ঘটনায় সোনাডাঙ্গা থানায় কর্মরত পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক সঞ্জয় মিত্র ও তার স্ত্রী এএসআই পপি মিত্রকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাত থেকে তরকারি পড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে সেই গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতন চালান পপি মিত্র।
ভুক্তভোগীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে পুরোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। এ ছাড়া ১১ বছরের এক শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে করা মামলায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাফিকুর রহমান এবং তার স্ত্রী বীথিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ২৮ এপ্রিল ৫ হাজার টাকার মুচলেকায় আদালত এই দম্পতির জামিন মঞ্জুর করে। জানা যায়, আসামিরা এই শিশু গৃহকর্মীকে মারধর, খুন্তি গরম করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দিয়ে গুরুতর জখম করে। গত ১৯ মে রাজধানীর মিরপুরে মোছা. মাইমুনা (১০) নামে এক শিশু গৃহকর্মীকে দীর্ঘদিন নির্যাতনের পর হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় আইটি ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবরার ফাইয়াজ ও অ্যাডভোকেট মেহনাজ অনন্যা নামের দম্পতিকে আটক করে পুলিশ। অভিযোগ আছে, শিশুটিকে নিয়মিত নির্যাতন এবং অনাহারে রাখা হতো। শিশুটির শরীরজুড়ে ছিল একাধিক আঘাতের চিহ্ন।