বাংলাদেশে একটি শিশুর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রথম শর্তই যেন ‘বাবার নাম’। জন্মনিবন্ধন, স্কুলে ভর্তি, পাসপোর্ট কিংবা উত্তরাধিকার- সবখানেই পিতৃপরিচয় বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই চেনা বাস্তবতার আড়ালে গত দুই দশকে দেশে জন্ম নিয়েছে এমন হাজারো শিশু, যাদের কোনো পিতৃপরিচয় নেই। ধর্ষণের শিকার হয়ে, বিয়ের প্রলোভনে সম্পর্কের পর প্রতারণা, পিতৃত্ব অস্বীকার কিংবা লোকলজ্জার ভয়ে পরিত্যক্ত হয়ে ‘অজ্ঞাত পিতা’ পরিচয়ে বেড়ে উঠছে এ শিশুরা। আদালতের নানা নির্দেশনা ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর লড়াই সত্ত্বেও আইনের অস্পষ্টতার কারণে এ শিশুদের বড় অংশই এখনো আইনি স্বীকৃতি, সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত।
এক যুগে সিআইডিতে ৪২০০ মামলা, মিলছে না ৪০% ডিএনএ : দেশে পিতৃপরিচয়হীন শিশুদের কোনো কেন্দ্রীয় ডেটাবেস নেই। তবে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিএনএ ল্যাবের পরিসংখ্যান একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। গত প্রায় এক যুগে পিতৃত্ব নির্ধারণের জন্য এ ল্যাবে মোট ৪ হাজার ২০১টি মামলা এসেছে। ল্যাবের তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ সালে যেখানে মাত্র ৪১টি মামলা এসেছিল, সেখানে বিগত বছরগুলোতে তা ব্যাপক হারে বেড়েছে। ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ৬৩৮টি, ২০২৩ সালে ৫২৬টি, ২০২৪ সালে ৫০৮টি, গত বছরে ৪৬১টি এবং চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত আরও ১২২টি মামলা সিআইডির ল্যাবে এসেছে। তবে ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে এক ভিন্ন জটিলতা। সিআইডির অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিএনএ অ্যানালিস্ট নুসরাত ইয়াসমিন জানান, কোনো নারী সন্তানের বাবা হিসেবে কাউকে অভিযুক্ত করে মামলা করলে আদালত ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেন। কিন্তু পরীক্ষা শেষে দেখা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে ডিএনএর মিল পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সামাজিক চাপ বা অন্য কোনো কারণে অনেক সময় প্রকৃত পিতাকে আড়াল করার প্রবণতা থাকে।
আইনি লড়াই ও ছোটমণি নিবাসের বাস্তবতা : বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) জানায়, ২০১৬ থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত পিতৃত্ব নির্ধারণ ও ধর্ষণসহ পারিবারিক আদালতে তারা ৪ হাজার ২৫০টি মামলা পরিচালনা করেছেন। বর্তমানে দেশের ১৯টি জেলায় তাদের ১ হাজার ৩৩৬টি মামলা চলমান রয়েছে। পরিচয়হীন শিশুর একটি বড় অংশ আশ্রয় পাচ্ছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘ছোটমণি নিবাস’গুলোতে। বর্তমানে বরিশালে ১০২টি, আজিমপুরে (ঢাকা) ৩৮টি, সিলেটে ২৭টি, চট্টগ্রামে ১৯টি, খুলনায় ১৮টি এবং রাজশাহীতে ১৩টি শিশু রয়েছে। এদের মধ্যে অনেক শিশুকে আদালতের মাধ্যমে দত্তক দেওয়া হলেও একটি বড় অংশ ‘পরিচয়হীন’ হিসেবেই বড় হচ্ছে।
আইনের অস্পষ্টতা ও অন্তহীন সংকট : আইন অনুযায়ী ভরণ-পোষণের দায় রাষ্ট্র নিলেও এ শিশুদের নাগরিক অধিকারের সংকট কাটছে না। ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী সুলতান মাহমুদ বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন আইন অনুযায়ী ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুর ব্যয়ভার পিতা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র বহন করবে। কিন্তু যার পিতার পরিচয় কখনোই পাওয়া যাবে না, তার জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা সরকারি ফরমে পিতার স্থানে কী লেখা হবে- তা নিয়ে প্রচলিত আইনে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই।
এশা ও বাগেরহাটের ঘটনা : অন্তরালের ট্র্যাজেডি : প্রেম ও বিয়ের আশ্বাসে সম্পর্কের পর পুরুষদের দায় এড়ানোর বহু ঘটনা আদালতে গড়াচ্ছে। ২০২৩ সালের আগস্টে বাগেরহাটের ২০০৪ সালের একটি ধর্ষণ মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ২০ বছর পর সন্তানের ডিএনএ টেস্টের নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট। সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটে টাঙ্গাইলের কলেজছাত্রী এশাকে কেন্দ্র করে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে তৎকালীন শহর আওয়ামী লীগ নেতার ভাই গোলাম কিবরিয়া বড় মনিরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন অন্তঃসত্ত্বা এশা। সন্তানের জন্মের পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে আপিল বিভাগে জমা দেওয়া ডিএনএ রিপোর্টে বলা হয়, নবজাতকের বাবা অভিযুক্ত বড় মনির নন।
তবে মৃত্যুর আগে এশা অভিযোগ করেছিলেন, প্রভাব খাটিয়ে ডিএনএ রিপোর্ট বদলে ফেলা হয়েছে। এ অভিযোগের রেশ কাটতে না কাটতেই ২০২৩ সালের ১৮ নভেম্বর রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় এশার। বর্তমানে তার তিন বছর বয়সি সন্তানটিকে নিজের সন্তানের মতো বড় করছেন এশার বড় বোন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার বোনকে মেরে ফেলা হয়েছে। ফরেনসিক রিপোর্ট প্রভাব খাটিয়ে সরানো হয়েছে। আমি আমার বোনের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিচার চাই। বাস্তবতা হলো, মামলা, ডিএনএ টেস্ট আর আইনি মারপ্যাঁচের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে এই নিষ্পাপ শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব ও নাগরিক ভবিষ্যৎ। পিতৃপরিচয়ের এ প্রাচীন আইনি দেয়াল ভাঙা না গেলে রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় এদের অন্তর্ভুক্তি কখনোই পূর্ণতা পাবে না বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।