একসময় সংক্রামক রোগই ছিল জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। কিন্তু সেই চিত্র দ্রুত বদলেছে। যশোরে নীরবে বিস্তার ঘটছে ক্যানসার, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, কিডনি, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্র ও হৃদরোগ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যেটিকে বলা হয়, নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি)। এসব রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।
সরকারি হাসপাতালে রোগীর দীর্ঘ সারি, চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা, ব্যয়বহুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জেলার বাইরে চিকিৎসার বাধ্যবাধকতা সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে উঠেছে। সরকারি সহায়তার আবেদনও সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। গত অর্থবছরের শেষ ছয় মাসেই যশোরে আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করেছেন ৭৮০ রোগী।
সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো ঘুরে দেখা গেছে, অসংক্রামক রোগে আক্রান্তের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও ক্যানসার, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, কিডনি, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্র ও হৃদরোগ ছড়িয়ে পড়ছে।
যশোর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরের তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তিতে জেলার আট উপজেলা থেকে ক্যানসার, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইসিস, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ৭৮০ জন আবেদন করেছেন সরকারি আর্থিক সহায়তার জন্য। আবেদনকারীদের মধ্যে ক্যানসার আক্রান্ত ৪০৪ জন, স্ট্রোকে প্যারালাইজড ১৪৫, কিডনি রোগী ৯০, জন্মগত হৃদরোগ ৬৫, থ্যালাসেমিয়া ৬০ এবং লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত ১৬ জন।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি আবেদন এসেছে সদর উপজেলা থেকে। যেখানে আবেদনকারীর সংখ্যা ২৩৭। এরপর রয়েছে মনিরামপুর; ১১০ জন, কেশবপুরে ৯১, শার্শায় ৮৫, বাঘারপাড়ায় ৭৩, চৌগাছায় ৪৯, ঝিকরগাছায় ৪৮ এবং অভয়নগরে ৩৩ জন। বাকি ৫৪ জন আবেদন করেছেন শহর সমাজসেবা কার্যালয়ে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি সহায়তার জন্য আবেদন বৃদ্ধির এই চিত্র জেলার অসংক্রামক রোগের প্রকৃত অবস্থাকেই তুলে ধরে।
চিকিৎসকরা বলছেন, এসব রোগ শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, তৈরি করছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটও। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ব্যয়বহুল ওষুধের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চাপে পড়ছে সবচেয়ে বেশি।
রোগীদের অভিযোগ, যশোরে উন্নত পরীক্ষা ও বিশেষায়িত চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেককেই খুলনা কিংবা ঢাকায় যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে কয়েক গুণ।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের এনসিডি কর্নারে দেখা গেছে রোগীদের দীর্ঘ সারি। দায়িত্বরত সিনিয়র স্টাফ নার্স রেশমা খাতুন জানালেন, প্রতিদিন গড়ে ১০০-১২০ রোগী আসেন এখানে চিকিৎসা নিতে।
তবে চিকিৎসার পাশাপাশি ওষুধ সংকট নিয়েও রয়েছে রোগীদের অসন্তোষ। পুলেরহাট এলাকার ফারহানা আফরিনের অভিযোগ, নিয়মিত হাসপাতালে এলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ সবসময় পাওয়া যায় না, চিকিৎসকও সবসময় উপস্থিত থাকেন না।
তবে ভিন্ন কথা বলছেন নুরপুর গ্রামের বেলি বেগম। তার ভাষায়, দুই বছর ধরে নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়ার ফলে উন্নতি হয়েছে তার শারীরিক অবস্থার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, গত এক বছরে বিশ্বে অসংক্রামক রোগে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষের। যার ৮৫ শতাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে। বাংলাদেশেও প্রতি বছর প্রায় ৭১ শতাংশ মৃত্যু ঘটছে এসব রোগে। এতে পরিবারগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন সাফায়েতের মতে, অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি অনেকাংশেই তৈরি হয় ছোটবেলা থেকে। ‘শিশুদের প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা খেলাধুলা বা শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হবে’— বললেন তিনি।
তার পরামর্শ, প্রতিদিন পাঁচ গ্রামের বেশি লবণ খাওয়া উচিত নয়, মাসে দেড় লিটারের বেশি ভোজ্য তেল ব্যবহার না করাই ভালো, প্রতিদিন অন্তত ৪০০ গ্রাম সবজি খাদ্যতালিকায় রাখা প্রয়োজন।
সরকার উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণ করেছে এনসিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি। রোগীদের নিজ নিজ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকেই নিয়মিত ওষুধ সংগ্রহের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে স্থানীয় পর্যায়েই নিশ্চিত করা যায় চিকিৎসাসেবা— জানালেন এই চিকিৎসক।
অসংক্রামক রোগ এখন আর শুধু স্বাস্থ্য খাতের বিষয় নয়; এটি রূপ নিচ্ছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটেও। সরকারি সহায়তার আবেদন বৃদ্ধি, হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ এবং চিকিৎসা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জোরদার না হলে আগামী বছরগুলোয় পরিস্থিতি হতে পারে আরও জটিল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং উপজেলা পর্যায়ে কার্যকর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই নীরব মহামারী মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
অবশ্য এজন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলেছেন যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা। তার ভাষ্য, এসব রোগীর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন ব্যবস্থাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, তামাক ও অ্যালকোহল ব্যবহার এবং পরিবেশ দূষণ কমানো গেলে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।