Image description
নগরের বাইরে ৪ বাস টার্মিনাল । রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী, ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়া হবে শহরের বাইরে। যাবে হেমায়েতপুর, টঙ্গী, কাঁচপুর ও কেরানীগঞ্জে । বাস্তবায়নে সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই বছর।

রাজধানীর চারটি আন্তজেলা বাস টার্মিনাল দ্রুত নগরের বাইরে সরানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নতুন টার্মিনালের জন্য জমি দেখা হচ্ছে। সরকার বলছে, এর ফলে রাজধানীর যানজট কমবে, সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরবে এবং নগরবাসীর ভোগান্তি কমবে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, বাস টার্মিনাল সরানো হলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দূরপাল্লার যাত্রীদের টার্মিনালে যাওয়া এবং টার্মিনাল থেকে বাসায় ফেরা। তাই নগর ও টার্মিনালের মধ্যে গণপরিবহনের সংযোগ নিশ্চিত না করে শুধু টার্মিনাল সরালে যাত্রীদের নতুন ভোগান্তি তৈরি হতে পারে। কারণ, বর্তমানে নগরে গণপরিবহন অপ্রতুল ও লক্কড়ঝক্কড়। টার্মিনাল নগরের বাইরে গেলে গণপরিবহনের চাহিদা কয়েক গুণ বাড়বে।

বর্তমানে রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদে তিনটি মূল বাস টার্মিনাল অবস্থিত। এ ছাড়া ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল থেকেও কয়েকটি জেলার বাস চলাচল করে। এই চার টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করে। টার্মিনালগুলো রাজধানীর ভেতরে থাকায় বিপুলসংখ্যক দূরপাল্লার বাস শহরে প্রবেশ করে। দূরপাল্লার অনেক বাস শহরের ভেতর দিয়ে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তেও যাচ্ছে। এ ছাড়া টার্মিনালসংলগ্ন এলাকায় সড়কের পাশে বাসের অসংখ্য কাউন্টার গড়ে উঠেছে। এসব কাউন্টারের সামনে দীর্ঘক্ষণ বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলার কারণে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি ফুলবাড়িয়া ও গুলিস্তানে রয়েছে নগরে চলাচল করা বাসস্ট্যান্ড। এতে নগরে তীব্র যানজটের পাশাপাশি পরিবেশদূষণ এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নগরে যানজট কমাতে রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশমুখে আন্তজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণের ধারণা দীর্ঘদিনের। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল কাঁচপুরে সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার পর চারটি আন্তজেলা বাস টার্মিনাল সরানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কোথায় টার্মিনাল হবে, কবে নির্মাণ শেষ হবে এবং যাত্রীদের নতুন টার্মিনালে যাতায়াতের জন্য কী ধরনের সংযোগ ব্যবস্থা থাকবে, সে বিষয়ে এখনো পরিকল্পনা চলছে।

সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে, মহাখালী টার্মিনাল টঙ্গীতে, গাবতলী টার্মিনাল হেমায়েতপুরে এবং সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী টার্মিনাল কাঁচপুরে স্থায়ীভাবে স্থানান্তর করা হবে। একই সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা বাস কাউন্টারগুলোও সীমিত করে নির্দিষ্ট স্থানে আনার চিন্তা রয়েছে।

সূত্র জানায়, স্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে রাজধানীর বাইরে কয়েকটি অস্থায়ী ডিপো স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে মহাখালীর বিকল্প হিসেবে পূর্বাচলে এবং ফুলবাড়িয়ার বিকল্প হিসেবে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারের কাছে একটি ডিপো করার চিন্তা চলছে। এসব ডিপোতে বাস অবস্থান করবে, স্থায়ী টার্মিনাল হওয়ার আগপর্যন্ত যাত্রী পরিবহন কার্যক্রম আপাতত পুরোনো টার্মিনাল থেকেই চলবে। ডিপো থেকে বাস যাত্রী পরিবহনের আগে টার্মিনালে আসবে। চারটি স্থায়ী টার্মিনাল হওয়ার পর যাত্রী ওঠানো ও নামানোর সব কার্যক্রম ওসব নতুন টার্মিনালেই হবে।

সড়ক, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, আগামী দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে ঢাকার বাস টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। এতে নগরীর যানজট কমবে এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনা আরও শৃঙ্খল হবে।

টার্মিনাল সরানোর প্রস্তুতি কত দূর

সড়ক বিভাগ, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, সম্ভাব্য টার্মিনালগুলোর জন্য উপযুক্ত জায়গা খোঁজা চলছে। প্রাথমিক পর্যায়ের কাজগুলো শুরু হয়েছে। তবে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো কম।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। তবে বিষয়গুলো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। কাঁচপুরে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ১২ একর জমি রয়েছে। তবে সেখানে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের ওপর বিধিনিষেধ থাকায় জমিটি সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এটি পরে ভূমি মন্ত্রণালয়ে যাবে। তবে নতুন বাস টার্মিনালের নকশা ইতিমধ্যে প্রস্তুত রয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান প্রকৌশলী বলেন, গাবতলী বাস টার্মিনাল হেমায়েতপুরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য প্রায় ৪৩ একর জমি নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে। তবে জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি। মহাখালী বাস টার্মিনাল পূর্বাচলে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এটি ডিএনসিসি বাস্তবায়ন করছে না, এটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজউকের।

বাস টার্মিনাল-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টার্মিনাল স্থানান্তরের ঘোষণা যতটা স্পষ্ট, যাত্রী পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে সরকারি পরিকল্পনা ততটা পরিষ্কার নয়। রাজধানীতে এখনো বাস রুট রেশনালাইজেশন বাস্তবায়ন হয়নি। নগর বাস ব্যবস্থাপনাতেও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার বিদ্যমান বাস টার্মিনালগুলো ইতিমধ্যে শহরের প্রান্তে অবস্থিত। সেগুলোকে আরও আধুনিক ও বহুতল টার্মিনালে রূপান্তর করে সক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়াই একমাত্র সমাধান নয়।

বড় চ্যালেঞ্জ যাত্রীদের নতুন টার্মিনালে যাতায়াত

চারটি বাস টার্মিনালই রাজধানীর বাইরে নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নগরের ভেতর থেকে যাত্রীরা নতুন টার্মিনালে পৌঁছাবে কীভাবে বা টার্মিনাল থেকে বাসায় ফিরবে কীভাবে?

বিশ্বের বিভিন্ন শহরে আন্তনগর বাস টার্মিনাল সাধারণত শহরের প্রান্তে বা বাইরে থাকে। তবে সেসব টার্মিনালের সঙ্গে মেট্রোরেল, কমিউটার ট্রেন, বিআরটি, সিটি বাস বা শাটল বাসের সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা থাকে। ফলে যাত্রীরা সহজেই শহর থেকে টার্মিনালে যাতায়াত করতে পারে। কিন্তু ঢাকায় এখনো সেই ধরনের সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ফলে টার্মিনাল সরানোর আগে শহর-টার্মিনাল যাতায়াতের সুবিধা নিশ্চিত করাটাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন পরিবহন ও নগর বিশেষজ্ঞরা।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, শুধু টার্মিনাল স্থানান্তর করলেই হবে না। যাত্রীদের জন্য নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত সংযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় আন্তজেলা বাস থেকে নামা যাত্রীরা ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা নতুন করে যানজট সৃষ্টি করতে পারে। রাতের যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর বাইরে স্থায়ী টার্মিনাল চালুর পর যাত্রীদের জন্য টার্মিনালভিত্তিক গণপরিবহনব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ পুলিশি নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধাও রাখা হবে।

কার্যকর গণপরিবহন সংযোগ ছাড়া ভোগান্তির আশঙ্কা

সরকারের ধারণা, আন্তজেলা বাস টার্মিনাল সরানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীতে দূরপাল্লার বাসের প্রবেশ কমবে। এতে গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ এলাকার দীর্ঘদিনের যানজট কিছুটা কমতে পারে। একই সঙ্গে টার্মিনালকেন্দ্রিক অব্যবস্থাপনাও কমবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর গণপরিবহন সংযোগ ছাড়া টার্মিনাল স্থানান্তর করলে যাত্রীভোগান্তি বাড়বে। তাই নতুন টার্মিনাল চালুর আগে প্রয়োজনীয় সংযোগ ও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, টার্মিনাল সরাতে হলে সব ধরনের সুবিধাসহ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় যাত্রীদের ভোগান্তি, নিরাপত্তাঝুঁকি ও ব্যয় বাড়বে।

নগর-পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, গণপরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত না করে টার্মিনাল আরও দূরে সরিয়ে নিলে যানজট কমার পরিবর্তে বাড়তেও পারে। কারণ, যাত্রীদের ছোট ছোট যানবাহনে করে টার্মিনালে যেতে হবে এবং শহরে আসতে হবে। এতে যাতায়াত ব্যয় ও ভোগান্তি দুটিই বাড়বে।