Image description

প্রশ্নটা পুরনো। বলতে পারেন একই। ’৯০ থেকে ২০২৬। ঘুরে ফিরে একই প্রশ্ন, কখনো কৌতুকে ভরা। বিশ্ব ফুটবল-মঞ্চে বাংলাদেশ নেই। কিন্তু মিডিয়া সেন্টারগুলোতে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হই বারবার। এ নিয়ে সাতবার। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে নেই কেন? কী জবাব দেবো? জবাবের তো কিছু নেই। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ব্রাজিল-মরক্কোর খেলা শুরু হতে যাচ্ছে। মিডিয়া সেন্টার থেকে স্টেডিয়াম কয়েক মিনিটের রাস্তা। দলবেঁধে আমরা যাচ্ছি স্টেডিয়ামে। মরক্কোর একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, ২০ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। বিশ্বকাপ এলেই তোমাদের নাম দুনিয়াব্যাপী মশহুর হয়ে যায়। কতো গল্প, কতো কাহিনী আমরা শুনি। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে মারামারি হয়। অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনাও ঘটে। কিন্তু আখেরে দেখতে পাই- বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি। হাসতে হাসতে বললাম, তুমি বোধ করি ভুল বলছো। বাংলাদেশ আছে। অবশ্যই আছে। কে বললো নেই। সমর্থকদের বিশ্বকাপ হলে আমরা শীর্ষে। হুসেনের জবাব, তুমি ঠিকই বলেছো। বিশ্ব ফুটবল রাঙ্কিংয়ে তোমরা ১৮১তম। অথচ ফুটবল উন্মাদনায় তোমরা বরাবরই এগিয়ে। এবার তো আমার আর কোনো জবাব নেই। কাকে দায়ী করবো।

এই প্রশ্নটা আমার কাছে বাসি। ’৯০ বিশ্বকাপ চলাকালে ম্যারাডোনাকে নিয়ে কি-না ঘটেছিল বাংলাদেশে! বউ তালাকের ঘটনা থেকে শুরু করে দুই গ্রামের মধ্যে মল্লযুদ্ধ হয়েছিল। খবরটি যখন মিডিয়ায় চাউর হয় তখনো এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলাম। আসলে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে নেই কেন? এই প্রশ্নের জবাব কে দেবে। সরকার আসে, সরকার যায়। অনেক কিছু বদলায় কিন্তু ফুটবল বদলায় না। নতুন ফুটবল বস আসেন। পাঁচ বছর রাজত্ব করে বিদায় নেন। পকেট তখন ভারী হয়ে যায়। ফুটবল হালকা হয়। সমালোচনার মুখে পড়ে। একজন তো প্রায় ১৭ বছর রাজত্ব করে গেলেন। ফুটবলের না হলেও তার যে উন্নতি হয়েছে- এ নিয়ে তো কোনো বিতর্ক নেই। ফুটবল দুনিয়ায় এবারো বাংলাদেশ আলোচনায়। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই যে আয়োজন তা ঢাকা থেকেই জেনেছিলাম নেট দুনিয়ার মাধ্যমে। বিশ্বকাপের মঞ্চে এসে প্রায় প্রতিদিনই নানা কিসিমের খবর শুনছি। পাড়া- মহল্লায় যে আয়োজন তা নিয়ে নিয়মিত খবর হচ্ছে। কখনো আনন্দের, কখনো বিরক্তির। পাঁচ লাখ মানুষের দেশ কেপ ভার্দে চলতি বিশ্বকাপে চমক সৃষ্টি করেছে। রুখে দিয়েছে স্পেনের অগ্রযাত্রা। হট ফেভারিটের তালিকায় স্পেন এখনো আছে। মাঝখানে কেপ ভার্দে শিরোনাম হয়েছে। তারা পারলে আমরা কেন অন্তত এশিয়ার ফুটবলে থাকতে পারি না। এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন বাংলাদেশের রাজনীতিকরা। তাদের হাতেই তো ফুটবলের ভাগ্য। পঞ্চান্ন বছরের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাচ্ছি- তারা বদলান, কিন্তু ফুটবল একই জায়গায় থেকে যায়। অন্যের খেলা দেখে আমরা হাততালি দেই, হই আনন্দিত। রক্তের বন্যায় আমাদের শরীর ভেসে যায়। আনন্দ তখন মিইয়ে যায়। তারপরও আমরা ফুটবল নিয়ে মাতামাতি করি। ম্যারাডোনা হাসলে আমরা হাসি। কাঁদলে আমরা কাঁদি। এখন তো মেসিকে নিয়ে।

তবুও আমরা অংশ হই এই বৈশ্বিক ক্রীড়াযজ্ঞের। বিশ্বকাপের মূল ক্ষমতা হচ্ছেÑ বাস্তবতাকে রূপান্তর করে একধরনের কল্পজগৎ তৈরি করা। আমাদের বাস্তবতা হতাশায় ভরা। শুধুমাত্র কল্পনা নিয়েই আমরা বেঁচে আছি। বিশ্বকাপের রূপকার ঔঁষবং জরসবঃ একসময় বলেছিলেন, এটা হচ্ছে একধরনের শক্তিশালী বৈশ্বিক মিলন। একাত্মার অনুভূতিও বটে। যেখানে ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয়তার মানুষ একই আবেগে যুক্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে একসময় ফুটবল জনপ্রিয় ছিল না। হেনরি কিসিঞ্জার ’৯৪ বিশ্বকাপের আয়োজন করে ফুটবলকে জনপ্রিয় করেছেন। ফুটবল এখন যুক্তরাষ্ট্রের বেসবলকে ছাপিয়ে তৃতীয় জনপ্রিয় খেলা। এবার তো যুক্তরাষ্ট্রের টিম একের পর এক চমক দেখিয়ে যাচ্ছে। দেখাবেই না বা কেন? কারণ তারা তো খেলাকে রেখেছে রাজনীতির বাইরে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও ইরান বিশ্বমঞ্চে এক আলোচিত নাম। রাজনীতির মারপ্যাঁচ তাদের গতি রোধ করতে পারেনি। থাকে মেক্সিকোতে আর খেলে যুক্তরাষ্ট্রে। খেলা শেষেই তাদের ধরতে হয় ফিরতি ফ্লাইট। এই অস্বস্তির মধ্যেও তারা বিশ্ব মিডিয়ায়। আরও অনেক দেশ আছে যাদের জনসংখ্যা আমাদের তুলনায় চার ভাগের একভাগ। তারা পারে, আমরা পারি না। আমরা কি তাহলে সারা জীবন দর্শকের ভূমিকায় থাকবো!