Image description
প্রধানমন্ত্রীর সফরে পরাশক্তির দৃষ্টি

মেরুকরণের এই বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো পরাশক্তিগুলো যখন যারযার দল ভারী করতে ব্যস্ত তখনই ইন্দো-প্যাসিফিকের অন্যতম অংশীদার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যাচ্ছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক নানা অংশীদারত্বে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্য পশ্চিমা দেশগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই এই সফরে কি ঘটতে যাচ্ছে তা ওই সব দেশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন উভয় দেশের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সামরিক ও উন্নয়মূলক অংশীদার বাংলাদেশ। অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তি ও প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে সীমান্তে পুশইন, তিস্তা ও গঙ্গা পানি চুক্তির ইস্যু ছাড়াও ভিসাসংক্রান্ত জটিলতা আছে। তিস্তা প্রকল্পে চীনের আগ্রহ ভারতের অন্যতম মাথাব্যথার কারণ। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে যায় কিনা তা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত উভয়েরই সংশয় আছে। এমন সব বাস্তবতায় পরাশক্তি ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর চাওয়া-পাওয়ার সমন্বয় করা বর্তমান সরকারের জন্য এক কঠিন ভূরাজনৈতিক পরীক্ষা বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। ফলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকরাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই চীন সফরকে এর শুরু হিসাবে দেখছেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন। যদিও সফরের মূল কার্যক্রম শুরু হবে আজ। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, শ্রমবাজার বিষয়ে গুরুত্বপর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে কুয়ালালামপুরে। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা দেশ এবং ভারতের দৃষ্টি মূলত তারেক রহমানের চীন সফরের দিকে। কারণ ওই সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপক্ষীয় দলিল সই হতে পারে। তার মধ্যে রয়েছে-১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), দুটি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা (অ্যাকশন প্ল্যান) ও একটি প্রটোকল। আছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিংয়ের সঙ্গে তারেক রহমানের একান্ত বৈঠকও।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া-চীন সফর শুরুর ঠিক আগের দিন ছিল শনিবার। ছুটির ওই দিনটিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন, জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি ও ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপ?দেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, এটি ছিল নিয়মিত কূটনৈতিক সাক্ষাৎ। কিন্তু কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রদূতরা তাদের সাক্ষাৎ করার বিষয়ে নানা বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু ছুটির দিন সেসব বিষয় নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যন্ত আসার যৌক্তিক কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা মূলত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের বিষয়ে খোঁজখবর নিতেই শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসেছিলেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, আমাদের এই অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক যে বিবর্তন হচ্ছে এবং সেটি যে আমাদের স্পর্শ করছে তার ইঙ্গিত ইতোমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়গুলো স্পষ্টও হচ্ছে। যেটি মনে হয়েছে, তারা সফরের বিষয়ে জানতেও চান আবার জানাতেও চান।

তিনি বলেন, ভূরাজনৈতিক এই বিবর্তনকে ম্যানেজ করতে হবে। তাই অতীতের বিষয়গুলো নিয়ে যেভাবে ভাবা হচ্ছে এখন আরেকটু ভিন্নভাবে চিন্তা করতে হবে। সেই চিন্তার সূত্র হবে অভ্যন্তরীণ সহমত তৈরি করা, কূটনৈতিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা। সরকারের ভেতরে ও রাজনৈতিকভাবে সমন্বয় বাড়াতে হবে। ভারত-চীন বা যুক্তরাষ্ট্র তারা আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক শক্তি। তাই তাদের সঙ্গে একতালে চলতে গেলে একটু বেশি বুদ্ধিমান হতে হবে। কৌশলগতভাবে আরও মনোযোগী হতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাইরের পৃথিবীতে যে পরিবর্তন হচ্ছে তার উপলব্ধি প্রয়োজন। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পেশাগত পর্যায় পর্যন্ত এই পরিবর্তনগুলোর চরিত্র, প্রতিফলন কি হয় এবং প্রতিক্রিয়া কিভাবে পড়ে তার একটি যথাযথ মূল্যায়ন রাখতে হবে। তবেই আমরা সার্থক ও সক্ষমভাবে এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারব।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, কূটনৈতিক পরিচয় নির্মাণে এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে উত্তরণে তিনি এক বাস্তববাদী ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনে সক্ষম হন; যেখানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আবেগনির্ভর ছিল না। তিনি জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত বাস্তবতার আলোকে সিদ্ধান্ত নিতেন। তার পররাষ্ট্রনীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের স্বার্থ, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা।

বর্তমান পরিস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় জিয়াউর রহমানের সেই নীতিতে আবার ফিরে যাওয়াকে দেশের জন্য মঙ্গলজনক বলে মনে করেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সরকার পথচলা শুরু করেছে খুব বেশি দিন হয়নি। কিন্তু মনে করি; পররাষ্ট্র ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে এ পর্যন্ত সরকার যা করেছে তাতে সঠিক পথেই হাঁটছে। কে কি বলছে সেটা চিন্তা না করে যেটা সুযোগ আসছে সেটিই করছে। প্রধানমন্ত্রী ভুটান হয়ে ভারত সফরের যাওয়ার আলাপ প্রথমে হয়েছিল। কিন্তু ভুটান হয়ে ভারতে যাওয়া হয়তো দিল্লি পছন্দ করেনি। ভারত চাইছিল সফর হোক। সে সুযোগ তারা মিস করেছে। মালয়েশিয়া হয়ে চীন সফরে চীনের কোনো সমস্যা নেই। তাই তিনি চীনে গেছেন। তবে এতে এটি ভাবার কোনো কারণ নেই, বাংলাদেশ চীনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। সেরকম চিন্তা করাটাই সঠিক নয়।

তিনি বলেন-যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত সবার সঙ্গেই আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্কগুলো ভালো রাখতেই হবে। একই ভাবে আমাদের জাপান, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া সবাইকে দরকার। সবার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। কিন্তু কেউ যদি ‘ডিকটেড’ করতে চায় তা মানব না, আমাদের মতো করেই করব। মনে করি, চীনে এই সফরের কারণে বাংলাদেশ বিষয়ে অন্য দেশের আগ্রহ আরও বাড়বে। তার প্রমাণ পাওয়া গেল ছুটির দিনেও কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া দেখে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমানের মতে, ভূরাজনীতির একটি বাস্তবতা আছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেখানে ভারসাম্য কিভাবে বজায় রাখবেন তা তাদের নিজস্ব সামর্থ্য, নেতৃত্ব ও মুন্সিয়ানার ওপর নির্ভর করবে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, চীন সফর সরকার সব বিচার-বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রকল্প সহায়তা, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে যে সম্পর্ক বাংলাদেশের তাতে এ সফর হতেই পারে। এটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। তবে এটি সত্য, ভূরাজনীতির বাস্তবতার মধ্যে একটি পরিবর্তন ঘটেছে। শোনা যাচ্ছে চীনের উদ্যোগে গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশ অংশ নেবে বা সংহতি জানাবে। এতে আমি কোনো সমস্যা দেখি না। সংহতি জানানোর মানে এই নয় যে, বাংলাদেশ চীনের দিকে ঝুঁকে গেল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের উষ্ণতার সম্পর্ক থাকার কারণেই এমন প্রশ্ন উঠছে।

তিনি বলেন, ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন যদি দৃশ্যমান হয়, তখন হয়তো ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে যে প্রশ্নটি আসছে সেটি আর আসবে না। খুশি হতাম; যদি বর্তমান সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন প্রায়োরিটির মধ্যে রাখত। তবে, একেবারে প্রায়োরিটির মধ্যে না রাখলেও ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েনে কিছু বাস্তবতা তো আছেই। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে যেসব দেশ আর্থিকভাবে সহায়তা করে ওইসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা ছিল। সেদিক থেকেও মালয়েশিয়া ও চীন সফর হতে পারে। তবে একটি সফর দিয়ে পররাষ্ট্রনীতির ঝোঁক বোঝা যাবে না।