Image description

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী ভিভিআইপি ফ্লাইটে ফের দায়িত্ব পেয়েছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ সাইফুজ্জামান। অথচ বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন গত বছর ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশে আসেন, তখন ভিভিআইপি ফ্লাইটে ফুয়েল সিস্টেমে গুরুতর ত্রুটি চিহ্নিত হয়। যে কারণে মাঝ আকাশে আগুন লাগার ঝুঁকিও তৈরি হয়। এ বিষয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি সাইফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। ইতোমধ্যে তাকে চট্টগ্রামে বদলিও করা হয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে রিলিজ না করে পুনরায় তাকে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী ভিভিআইপি ফ্লাইটে দায়িত্বে দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট অনেকে ক্ষোভ অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকৌশলীর সিদ্ধান্তকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ থাকলে তা আমলে নেওয়া উচিত। ভিভিআইপি দায়িত্ব থেকে এ সময় তাকে বিরত রাখা উচিত ছিল। প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইট সাধারণ কোনো বাণিজ্যিক ফ্লাইট নয়। এখানে জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনৈতিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি সুরক্ষার প্রশ্ন জড়িত।

যুগান্তরের হাতে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চিফ ইঞ্জিনিয়ার (ইঞ্জিনিয়ারিং প্রডাকশন) মো. আলী নাসের স্বাক্ষরিত দায়িত্বপত্রে দেখা যায়, ভিভিআইপি ফ্লাইটের জন্য মোট ছয়জন প্রকৌশল কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুজন সরাসরি সফরসঙ্গী হিসাবে বিমানের সঙ্গে বিদেশ যাচ্ছেন। এই তালিকার প্রথমেই রয়েছে প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ সাইফুজ্জামান খানের নাম। তার সঙ্গে রয়েছেন প্রকৌশলী মো. সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া।

ডিউটি রোস্টার অনুযায়ী, ২১ জুন ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুরগামী ভিভিআইপি ফ্লাইট বিজি-৩৮৬-এ সাইফুজ্জামান সফর করবেন। পরদিন কুয়ালালামপুর থেকে চীনের ডালিয়ানগামী ভিভিআইপি ফ্লাইট বিজি-১৬০১-এর কারিগরি দায়িত্বও তার ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। ডালিয়ানে পৌঁছে সরকারপ্রধানকে বহনকারী উড়োজাহাজের চূড়ান্ত কারিগরি সনদ (টেকনিক্যাল সার্টিফিকেশন) প্রদানের দায়িত্বও তার। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, তদন্তে অভিযুক্ত একজন কর্মকর্তার হাতে কেন আবারও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ভিভিআইপি ফ্লাইটের নিরাপত্তাসংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দায়িত্ব দেওয়া হলো।

এদিকে ১৭ জুন বিমানের উপব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ড. মুহাম্মদ মাহেব হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে সাইফুজ্জামান খানসহ ১৭ জন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়। ওই আদেশে সাইফুজ্জামানকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়। কিন্তু যাকে বদলি করা হয়েছে তাকে আবার প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইটের দায়িত্ব দিয়ে বিদেশ সফরে পাঠানো হলো। এ নিয়ে বিমানের ভেতরে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেকে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে শঙ্কিত।

এ প্রসঙ্গে বিমানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ঘটনায় তদন্ত কমিটি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে, তাহলে তাকে ভিভিআইপি ফ্লাইটের মতো স্পর্শকাতর দায়িত্ব দেওয়া কতটা যৌক্তিক সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তদন্তে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে কেন ফের ভিভিআইপি ফ্লাইটের দায়িত্ব দেওয়া হলো জানতে চাইলে বিমানের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমোডর মো. মনজুর-ই-আলম যুগান্তরকে বলেন, সাইফুজ্জামান খান একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলী। তিনি নিরাপত্তা ছাড়পত্রপ্রাপ্ত। অফিস আদেশ মোতাবেক ২৭ জুন তাকে অব্যাহতি দেওয়া হবে এবং তিনি ১ জুলাই চট্টগ্রামে যোগদান করবেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে যা ছিল : গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী বিশেষ ভিভিআইপি ফ্লাইট বিজি-২০২-এ উড্ডয়নের আগে জ্বালানি ব্যবস্থায় (ফুয়েল সিস্টেম) ত্রুটির সতর্কবার্তা পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে উড়োজাহাজটিকে উড্ডয়নের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

পরবর্তীতে বিমানের তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সাইফুজ্জামান খানের সিদ্ধান্তকে ‘গুরুতর সিদ্ধান্তগত ত্রুটি’ এবং ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া প্রতিবেদনে বিমানের দুই প্রকৌশলী হীরালাল এবং মো. সাইফুজ্জামান খানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়। অথচ সেই হীরালাল এখনো বহাল তবিয়তে আছেন।

একই প্রতিবেদনে প্রকৃত ত্রুটির কারণ শনাক্ত না করে পর্যায়ক্রমে তিনবার জেনারেটর পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ ছিল, ওই ঘটনায় মাঝ আকাশে বড় ধরনের দুর্ঘটনা কিংবা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। যদিও বিমানটি সৌভাগ্যক্রমে শেষ পর্যন্ত নিরাপদে দেশে ফিরে আসে।

এ বিষয়ে জানতে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আক্তার এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাইজার সোহেল আহমেদের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দুজনের কারোরই কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।