মধ্যরাতে বস্তাবন্দী একটি মরদেহ রেললাইনের ওপর তুলে রেখেছিলেন পতিত আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুম ও খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান। কিছুক্ষণ পর ছুটে আসে একটি ট্রেন। আরেক রাতে জাফলং সীমান্ত থেকে ফেরার পথে গাড়ি থামিয়ে ভারত থেকে আনা দুই বন্দীকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করেন তিনি।
এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী থাকার দাবি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ রোববার বিস্ফোরক জবানবন্দি দিয়েছেন সেনা কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস। এক সময় জিয়াউল আহসানের বডিগার্ড বা রানার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কায়েসের ভাষ্য, মাত্র এক বছর তিন থেকে চার মাসের মধ্যে তিনি জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে ১৫০ থেকে ২০০ মানুষকে গুলি, ইনজেকশন এবং অন্যান্য উপায়ে হত্যা করতে দেখেছেন। তার দাবি, বিবেকের তাড়নায় তিনি এই জবানবন্দি দিয়েছেন। কারণ, তিনি দেশের জন্য শপথ গ্রহণ করেছেন, দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়।
৪৩ বছর বয়সী ইমরুল কায়েস জবানবন্দিতে জানান, ২০০১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি র্যাব সদরদপ্তরের গোয়েন্দা শাখায় প্রেষণে কর্মরত ছিলেন। ২০০৪ সালে কমান্ডো প্রশিক্ষণের সময় থেকেই জিয়াউল আহসানের সঙ্গে তার পরিচয় এবং পরবর্তীতে সেই সম্পর্কের সূত্রেই তাকে র্যাবের গোয়েন্দা পরিচালক জিয়াউল আহসানের ‘রানার’ বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
কায়েস জানান, ওই দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি জিয়াউল আহসানের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেন এবং ধীরে ধীরে এমন সব ঘটনার সাক্ষী হন, যা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। তার ভাষায়, ‘আমি দেশের জন্য শপথ গ্রহণ করেছি, প্রশিক্ষণও নিয়েছি। তবে তা কখনই দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়।’
জবানবন্দিতে কায়েস দাবি করেন, রানার হিসেবে যোগ দেওয়ার মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিনের মাথায় গভীর রাতে তাকে র্যাব-১ কার্যালয়ের সামনে ডেকে পাঠানো হয়। সেখানে দুটি কালো হাইয়েস মাইক্রোবাসে করে তাকে টঙ্গীর দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। একটি নির্জন রেলক্রসিংয়ের কাছে গাড়ির ডিকি খুলে তিনি বুঝতে পারেন, যেটিকে বস্তা বলা হয়েছিল সেটি আসলে একটি ঠান্ডা হয়ে যাওয়া মরদেহ।
তিনি জানান, প্রথমে তিনি ভয় পেয়ে যান। পরে অন্যদের সহায়তায় লাশটি রেললাইনের পাশে নিয়ে রাখলেও জিয়াউল আহসান ও অন্যরা সেটিকে রেললাইনের ওপর তুলে রাখেন। কিছুক্ষণ পর একটি ট্রেন সেটির ওপর দিয়ে চলে যায়। এই ঘটনার পর পাঁচ থেকে সাত দিন তিনি স্বাভাবিক থাকতে পারেননি। ‘নিজের কাছে খুব খারাপ লাগছিল যে, আমি কোথায় আসলাম, কীভাবে চাকরি করব,’ বলেন তিনি।
এর কিছুদিন পর সুন্দরবনে একটি অভিযানে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন কায়েস। তার দাবি, নদীপথে অভিযানস্থলে পৌঁছানোর পর জঙ্গলের ভেতর থেকে কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ আসে। পরে বাহিনীকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযান শেষে তারা জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে গুলিবিদ্ধ কয়েকটি মরদেহ, জলদস্যুদের ব্যবহৃত ঘাঁটি, পর্যবেক্ষণ পোস্ট এবং দুটি নৌকা দেখতে পান। নৌকায় খাদ্যসামগ্রী, মদের বোতল, সিগারেট এবং একটি ছাগল ছিল, যেটি পরে জবাই করে খাওয়া হয়। পুরো ঘটনাটি তার কাছে ‘একটি সাজানো অপারেশন’ বলে মনে হয়েছিল বলে আদালতে জানান তিনি।
বিডিআর বিদ্রোহের পর পরিচালিত ‘অপারেশন রেবেল হান্টের’ প্রসঙ্গ টেনে কায়েস বলেন, জিয়াউল আহসান তাকে জানিয়েছিলেন, নিহত ব্যক্তিরা বিদ্রোহী বিডিআর সদস্য। তার দাবি, এসব ব্যক্তিকে কখনো ইনজেকশন পুশ করে হত্যা করা হতো, আবার কখনো সিমেন্টভর্তি বস্তা বেঁধে মাথায় গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো যাতে মরদেহ ভেসে না ওঠে।
২০১১ সালের রমজানের শেষ দিকে উত্তরায় চারজনকে কথিত ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার ঘটনাকেও তিনি সাজানো অভিযান বলে দাবি করেন। কায়েসের ভাষ্য, ইফতারের ঠিক আগে তাকে ক্যামেরা নিয়ে ঘটনাস্থলে যেতে বলা হয় এবং সেখানে পৌঁছে তিনি চারটি মরদেহ দেখতে পান, যাদের সম্পর্কে পরে বলা হয় তারা ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
২০১২ সালের শুরুতে ১১ জন বন্দিকে নিয়ে পোস্তগোলা আর্মি ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় যাওয়ার একটি ঘটনার বর্ণনাও দেন কায়েস। তার দাবি, বন্দিদের একটি নৌকায় তোলা হয়। একজন নদীতে ঝাঁপ দিলে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে তিনি পানিতে নেমে তাকে ধরে আনেন। এরপর নদীর মাঝখানে নিয়ে ১১ জনকেই হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
একই বছরের মাঝামাঝি জাফলং সীমান্তে একটি অভিযানের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। কায়েসের দাবি, বাংলাদেশ থেকে নেওয়া দুই বন্দির বিনিময়ে ভারতীয় পক্ষের কাছ থেকে আরও দুই ব্যক্তিকে গ্রহণ করা হয়। ঢাকায় ফেরার পথে জিয়াউল আহসান প্রথমে একজনকে, পরে আরেকজনকে গাড়ি থেকে নামিয়ে রাস্তার পাশে মাথায় গুলি করে হত্যা করেন।
জবানবন্দিতে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও উঠে আসে। কায়েস বলেন, ২০১২ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে একটি অভিযানে অংশ নিতে গিয়ে তিনি জানতেন না কাকে ‘পিক’ করা হবে। পরে ছুটিতে থাকা অবস্থায় সংবাদমাধ্যমে ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার খবর দেখেন। কর্মস্থলে ফিরে তিনি শুনেছেন, অস্ত্রাগারের রেজিস্টার ও সিসিটিভি ফুটেজ নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। একদিন জিয়াউল আহসানকে ফোনে বলতে শুনেছেন, ‘স্যার, আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে গলফ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে?’
এর কিছুদিন পর আরেকটি ঘটনায়, কায়েসের ভাষ্য অনুযায়ী, র্যাব-৪-এর সেফ হাউস থেকে আনা এক বন্দিকে নির্জন এলাকায় নামিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করেন জিয়াউল আহসান। তার দাবি, নিহত ব্যক্তির মাথায় ঘন চুল থাকায় গুলির পর আগুন ধরে যায় এবং উপস্থিত কয়েকজন তা দেখে হাসাহাসি করেন। পরে নিহতের হাত ও চোখ বাঁধা গামছা খুলে নিয়ে সবাই ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ পর কাঁচপুর সেতুর ওপর আরেকটি অভিযানের কথাও বলেন কায়েস। তার দাবি, সেখানে দুই বন্দিকে পর্যায়ক্রমে গাড়ি থেকে নামিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। এরপর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়ার আগে একজনের লুঙ্গি খুলে নেওয়া হয়। একই কায়দায় দ্বিতীয় ব্যক্তিকেও হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
বরিশালের পাথরঘাটা এলাকায় বলেশ্বর নদীর মোহনায় পরিচালিত একাধিক অভিযানের বর্ণনায় কায়েস দাবি করেন, সেখানে বন্দিদের সিমেন্টভর্তি বস্তা বেঁধে গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়ার আগে কমান্ডো নাইফ দিয়ে তাদের পেট চিরে ফেলা হতো, যাতে লাশ ভেসে না ওঠে।
জবানবন্দির শেষদিকে কায়েস বলেন, জিয়াউল আহসানের সঙ্গে দেড় বছরের কম সময় কাজ করার মধ্যে তিনি বিভিন্ন উপায়ে ১৫০ থেকে ২০০ মানুষকে হত্যা করতে দেখেছেন। তার দাবি, গুলি ছাড়াও অন্তত ১০ থেকে ১২ জনকে ইনজেকশন পুশ করে হত্যা করা হয়েছিল। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং বলেন, ‘আমি বিবেকের তাড়নায় এবং সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে জবানবন্দি দিয়েছি। আমি এখন নিরাপত্তা চাই।’