রাজধানীর জেলফেরত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা প্রতিপক্ষের টার্গেটে পড়েছে। এরই মধ্যে দুজন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। আরেকজন মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে বর্তমানে আইসিইউতে আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, জেলে যাওয়ার কারণে হারানো ‘অপরাধ সাম্রাজ্য’ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা, আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব, পুরোনো হিসাব-নিকাশ থেকে তারা প্রতিপক্ষের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে।
সর্বশেষ শুক্রবার দুপুরে গুলির নিশানায় পড়েছে একসময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে ‘কাইল্লা পলাশ’ (৫০), জুমার নামাজ শেষে রাজধানীর রামপুরায় বাসার সামনে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার সময় হেলমেট ও মাস্ক পরা দুজন খুব কাছ থেকে তার মাথায় গুলি করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয়েছে।
এর আগে গুলি করে হত্যা করা হয় আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটনকে। গত ২৮ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে রাজধানীর নিউমার্কেট সংলগ্ন বটতলা এলাকায় মোটরসাইকেলে করে আসা দুজন তাকে গুলি করে হত্যা করে। একই কায়দায় হত্যা করা হয় আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে। ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সামনে ফিল্মি স্টাইলে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে।
কেন টার্গেট হচ্ছে তারা: আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক কর্মকর্তার তথ্য মতে, দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এসব শীর্ষ সন্ত্রাসীর নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাদের অনুপস্থিতিতে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, জমি দখল ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন গ্রুপের উত্থান ঘটে। আবার কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকে পুরোনোদের হাতে। কারামুক্তির পর পুরোনো আধিপত্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু করলে স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে তারা।
একসময়কার সহযোগীদের কেউ কেউ প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মেলায়, আবার কেউ নিজেরাই নতুন বলয় গড়ে তোলে। পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত বা পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নির্দেশনাতেও বিভিন্ন গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে গোয়েন্দাদের ধারণা। ফলে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য নিয়ে চলমান দ্বন্দ্ব এবং পুরোনো শত্রুতার কারণে জেলফেরত এসব সন্ত্রাসী প্রতিপক্ষের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা একে একে জামিনে বেরিয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন সাজা শেষ করে ছাড়া পেয়েছে।
হত্যার শিকার হওয়া টিটন ২০০৪ সালে ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর কারাগারেই ছিল। দুই দশক পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট জামিনে বেরিয়ে আসে সে। সেই বছরে আগস্টেই ছাড়া পায় আরও দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী। তারা হলো ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল ও সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাম্পেইন ইমন। কাছাকাছি সময়ে আরও ছাড়া পেয়েছে শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম, আব্বাস আলী, খোরশেদ আলম ওরফে রাসু।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিন ও পরবর্তী সময়ে হত্যার শিকার এবং সবশেষ একজন গুলিবিদ্ধ হওয়া প্রসঙ্গে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, এগুলো সন্ত্রাসীদের নিজেদের মধ্যে আন্তঃকোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হচ্ছে। সবশেষ গুলিবিদ্ধ পলাশ ঈদের আগে জামিন পেয়েছে। তার জামিনের ব্যাপারে আমরা প্রচণ্ড বিরোধিতা করেছিলাম। সে ১৬ বছর কারাগারে ছিল। বের হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই সে হামলার শিকার হলো। সন্ত্রাসীরা একজন অন্যজনকে সহ্য করতে পারে না। এগুলো নিজেদের মধ্যে কোন্দল।
জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর পলাশের চলাফেরা নজরদারির মধ্যে রাখা হচ্ছিল বলে জানান নজরুল ইসলাম। পুলিশের এ কর্মকর্তার ভাষ্য, আমরা পলাশকে নজরদারিতে রেখেছিলাম। ওর যে অনেক প্রতিপক্ষ আছে, কারা কোন দিক থেকে পরিকল্পনা করছে, তাদের তো চোখে রাখা সম্ভব হয়নি। সে জামিনে বেরিয়ে আসার পর আমাদের ডিবির টিম তার বাসায় গিয়েছিল। কোথাও না যাওয়ার জন্য বলে এসেছে আমাদের সদস্যরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার ফলে অপরাধ জগতের ক্ষমতার কাঠামোয় পরিবর্তন আসে। কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী মুক্তি পেয়ে পুরোনো অবস্থান ও প্রভাব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করলে স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে গড়ে ওঠা গ্রুপগুলোর সঙ্গে তার সংঘাত তৈরি হয়। একই সঙ্গে পুরোনো শত্রুতা ও প্রতিশোধের বিষয়ও সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে কারামুক্তির পর এসব ব্যক্তি প্রতিপক্ষের হামলার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
দুই হত্যা মামলার একটিতে নেই গ্রেপ্তার: আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হত্যার নেপথ্যে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তাদের কয়েকজন সহযোগী গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন অধরা।
মামুন হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত সরাসরি জড়িত দুই শুটারসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যায় ব্যবহৃত দুটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের মধ্যে অন্তত দুজন পুলিশকে জানিয়েছে, ২ লাখ টাকার বিনিময়ে তারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তাদের দাবি, পলাতক সন্ত্রাসী রনি ওরফে ‘ভাইগ্না রনি’র নির্দেশে তারা গুলি চালান।
ডিবি জানিয়েছে, এ রনি আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর আশীর্বাদপুষ্ট এবং তার নির্দেশেই রাজধানীর অপরাধজগতের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত হয়। মূলত আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বে এই হত্যাকাণ্ড হয়।
এদিকে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যায় গতকাল পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
পলাশকে গুলি, অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে মামলা: ইয়াসিন খান পলাশকে গুলির ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় তার স্ত্রী মাহমুদ খানম বাদী হয়েছে একটি হত্যাচেষ্টা মামলা করেছেন। হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মামলায় অজ্ঞাতদের আসামি করা হয়েছে। জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, পলাশ কারাগার থেকে বের হওয়ার পর ইন্টারনেট ব্যবসার দেখভাল করছিলেন। এ ব্যবসা আগে তার পরিবারের সদস্যরা চালাতেন।
পলাশের স্ত্রীর বরাত দিয়ে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, তিনি বাসা থেকে খুব একটা বের হতেন না। তার স্ত্রী আমাদের জানিয়েছেন, তিনি বাসাতেই থাকতেন। প্রয়োজনে নিচে যেতেন। কিন্তু বাইরে কোথাও যাওয়া আসা করতেন না।
হামলাকারীরা পলাশকে গুলি করে মোটরসাইকেলে হাতিরঝিল ইউলুপ হয়ে বাড্ডার দিকে পালিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান। তিনি বলেন, জড়িতদের গ্রেপ্তারে থানা পুলিশের পাশাপাশি, ডিবি, সিটিটিসি, র্যাব সবাই কাজ করছে। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তবে আমরা চেষ্টা করছি।