Image description

রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় না ঝুঁকে জনসম্পৃক্ত মেগা প্রকল্পে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। যার প্রতিফলন দেখা গেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। তিন লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দের ৩৬ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে সাত মেগা প্রকল্পে। বিগত সরকারের আমলের এসব প্রকল্প বিদ্যুৎ বিতরণ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও পরিবহণব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। জনসম্পৃক্ততার কারণে এসব প্রকল্প বিশেষ গুরুত্ব পেলেও অনিয়ম ও দুর্নীতির যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো পর্যবেক্ষণ করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে বাংলাদেশের উন্নয়ন সংস্কৃতিতে দেখা গেছে, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে বিগত সরকারের ‘ফ্ল্যাগশিপ’ প্রকল্পের লাগাম টেনে ধরে। অথবা বরাদ্দ কমিয়ে ফেলে রাখা হয়। এবারের উন্নয়ন বাজেটে তা করা হয়নি। উলটো জনসম্পৃক্ত মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তব্যে বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে তথাকথিত উন্নয়নের নামে অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল করা হয়েছে এবং অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ ও ঋণনির্ভর অর্থায়নের কারণে অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। আমরা সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাই। প্রকল্পের প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল যাচাই করা এখন মূল লক্ষ্য।

প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প। এই প্রকল্পে ১৫ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় ৫৪ দশমিক ৮১ শতাংশ বেশি। প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো উদ্যোগ হিসাবে বিবেচিত। গত বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৬৮ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং ব্যয় হয়েছে ৯৪ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।

বরাদ্দের হিসাবে এর পরের অবস্থানে রয়েছে ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৫ (উত্তরা রুট) প্রকল্প। প্রায় ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকার এই প্রকল্পে আগামী অর্থবছরে ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে সাত বছরে প্রকল্পটির অগ্রগতি মাত্র ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ হওয়ায় এর বাস্তবায়ন গতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারপরও বরাদ্দ প্রায় চারগুণ বাড়ানো হয়েছে।

মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পেও বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকার এই প্রকল্পে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় চার গুণের বেশি। একই সঙ্গে ঢাকা এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পে ৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ৩৮৮ দশমিক ১০ শতাংশ বৃদ্ধি। তবে ৫৩ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকার এ প্রকল্পটির অগ্রগতি এখনো ৯ দশমিক ২৯ শতাংশের মধ্যেই সীমিত।

অন্যদিকে জনসেবামুখী খাতেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে ৩ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পে ২ হাজার ৩৯৩ কোটি এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় ফিডিং কর্মসূচিতে ২ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকায়, যা ২১৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

পরিবহণ খাতে প্রায় সম্পন্ন হওয়া ঢাকা এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পে ১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা-সিলেট করিডর এবং চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথ প্রকল্পেও বরাদ্দ অব্যাহত রয়েছে। তবে কিছু বড় প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেন প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।

অন্যদিকে ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ ৬ দশমিক ৭৯ গুণ বেড়ে ১ হাজার ১৪৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা বরাদ্দ বৃদ্ধির দিক থেকে অন্যতম।

এদিকে সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীত সরকারের সময়ে নেওয়া অনেক মেগা প্রকল্পে একতরফা ও বিতর্কিত শর্ত যুক্ত ছিল। ফলে বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। এতে বার্ষিক ভর্তুকি ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ‘ভ্যালু ফর মানি’ ও ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ নীতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রকল্পের প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল যাচাই করা এখন মূল লক্ষ্য।

সরকার জানিয়েছে, ঋণ ব্যবস্থাপনা সংস্কার, উচ্চ রিটার্নসমৃদ্ধ খাতে বিনিয়োগ এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঠামো আধুনিকায়নের মাধ্যমে উন্নয়ন ব্যয়ের গুণগত মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া নতুন বড় প্রকল্প হিসাবে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদিত এই প্রকল্প আগামী সাত বছরে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ১৯ জেলার ১২০টি উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে বলে সরকার আশা করছে।

সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত এডিপিতে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ধারাবাহিক বরাদ্দের পাশাপাশি জনসম্পৃক্ত খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। তবে কিছু প্রকল্পে অগ্রগতি কম হলেও বরাদ্দ বৃদ্ধির ধারা বাস্তবায়ন দক্ষতা ও উন্নয়ন অগ্রাধিকারের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।