বেসরকারি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব আছে ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এই খাতকে উৎসাহিত করতে সৌর এবং বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নীতিমালাও করেছে সরকার। কিন্তু বেসরকারি কোম্পানিগুলো কত খরচে সেই বিদ্যুৎ (মার্চেন্ট পাওয়ার) এক স্থান থেকে আরেক স্থানে নিয়ে যাবে তার সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি।
এই নিয়ে দেখা দিয়েছে দারুণ জটিলতা। কারণ সরকারি বিতরণ কোম্পানিগুলো এ ব্যাপারে ক্ষতিপূরণসহ প্রতি ইউনিট স্থান ভেদে ৩ দশমিক ৭৩ টাকা পর্যন্ত ট্যারিফ দাবি করেছে। তারা বলছে, বেসরকারি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়লে তারা বিদ্যুতের বড় গ্রাহক হারাবে। এতে করে তাদের রাজস্ব কমে যাবে।
অন্যদিকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে সরকারের নীতিমালায়ও কিছুটা গলদ আছে। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ শনিবার এ ব্যাপারে বলেছেন, মার্চেন্ট পাওয়ারের ব্যাপারে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে। বেসরকারি কোম্পানির উৎপাদিত সৌর বা বায়ু বিদ্যুতের বাড়তি বিদ্যুৎ পিডিবি যে কিনবে সে ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা বা নীতিমালা নেই। এ ব্যাপারে একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা লাগবে। না হলে বেসরকারি কোম্পানি কেন এখানে বিনিয়োগ করবে। এ ছাড়া বিতরণ কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, মার্চেন্ট পাওয়ার ট্যারিফ অনুমোদন বা বেসরকারি কোম্পানির নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করলে সরকারি কোম্পানির বিদ্যুৎ বিক্রি কমে যাবে। এ ছাড়া সঞ্চালনের জন্য একটি হুইলিং চার্জ লাগবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকার আগ্রহী। বাংলাদেশের গার্মেন্টস এবং টেক্সটাইল খাতে চাহিদার সব বিদ্যুৎ ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে উৎপাদিত হতে হবে। নতুবা বাংলাদেশকে কার্বন ট্যাক্স দিতে হবে।
মার্চেন্ট পাওয়ারের ট্যারিফ নির্ধারণ করতে ১ এপ্রিল পিডিবির সাবেক সচিব রাশেদুল হক প্রধান এক প্রস্তাব দিয়েছেন বিইআরসির কাছে। নিয়ম অনুযায়ী সেই প্রস্তাবের ওপর শুনানি এবং মতামত নেওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা করা হয়নি।
মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রাহক পর্যন্ত নিতে সঞ্চালন এবং বিতরণে ‘ওপেন এক্সেস ট্যারিফ’ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সেই ট্যারিফ নির্ধারণের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মার্চেন্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো (নবায়নযোগ্য) সরাসরি বড় গ্রাহকের কাছে (শিল্প) বিদ্যুৎ বিক্রি করলে সংশ্লিষ্ট বিতরণ কোম্পানির রাজস্ব ক্ষতি হবে। কারণ তখন ওই গ্রাহকরা তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনবে। সেই হিসাবে বিতরণ কোম্পানিগুলোর গড় ভর্তুকি অন্তর্ভুক্ত করে এই ট্যারিফ নির্ধারণ করতে হবে। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী দেশের ছয়টি বিতরণ কোম্পানি ১৩২ কেভি থেকে শুরু করে দশমিক ৪ কেভি বিতরণ লাইনে প্রতি ইউনিট ১ দশমিক ১৫ টাকা থেকে ২ দশমিক ৯০ টাকা ট্যারিফ প্রস্তাব করে। এরমধ্যে নেসকোর দশমিক ৪ কেভি লাইনে প্রতি ইউনিট সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৯০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বাইরে সঞ্চালনের জন্য পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ-পিজিসিবিকে দশমিক ৪৬৫ টাকা থেকে দশমিক ৭৮৯ পয়সা প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বাইরেও এনার্জি ম্যানেজমেন্টের জন্য ইউনিট প্রতি ০৫ পয়সা চার্জ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট ট্যারিফ ৩ টাকার বেশি চাওয়া হয়েছে।
বিইআরসি এই প্রস্তাব নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। বিইআরসির চেয়ারম্যান বলেছেন, বিতরণ কোম্পানির বিক্রি কমে যাওয়ার যুক্তি মেনে নেওয়া যায় না।
জানা গেছে, মার্চেন্ট পাওয়ার কেন্দ্রের বিদ্যুৎ বিক্রি করতে ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ নির্ধারণে পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল হকের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে সরকার। সেই কমিটি ১ ফেব্রুয়ারি একটি রিপোর্ট জমা দেয়। সেই রিপোর্টে বলা হয়, সরকারি স্থাপনা (বিতরণ লাইন এবং সঞ্চালন লাইন) ব্যবহার করে বেসরকারি খাতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সুযোগ করে দেওয়া যায়। কিন্তু এতে করে মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ নির্ধারণ হলে বিতরণ কোম্পানিগুলো অনেক উচ্চ ট্যারিফের গ্রাহক হারাবে। তাই ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফে গড় ভর্তুকি (ক্রস সাবসিডি) চার্জ অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। এতে করে বাজারভিত্তিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য উৎসাহিত হয় এবং অন্যদিকে যাতে বিদ্যমান সামাজিক ও আর্থিক ভারসাম্য থাকে।
প্রাণ আরএফএলের উপমহাব্যবস্থাপক তৌহিদুজ্জামান শনিবার যুগান্তরকে বলেছেন, শতকোটি টাকার বেশি ব্যয় করে প্রাণ আরএফএল হবিগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই বিদ্যুৎ দিয়ে হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রাণ-আরএফএলের শিল্প-কারখানা চালু করা হবে। কিন্তু এখন সরকারের মার্চেন্ট পাওয়ারের সঞ্চালনের ট্যারিফ অনুমোদন করেনি। এই নিয়ে বারবার তাগাদাও দেওয়া হয়েছে।
মোবাইল অপারেটর রবির হেড অফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স সাহেদ আলম জানান, রবি তার সব টাওয়ারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করার উদ্যোগ নিয়েছে। যাতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সরকার এখনো মার্চেন্ট পাওয়ারের বিতরণ এবং অন্যান্য খরচ নির্ধারণ করেনি। তাই এই খাতে বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে চিন্তিত রবি আজিয়াটা।
অন্য একটি কোম্পানির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে সব টেক্সটাইল মিলকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করতে হবে। এজন্য শুধু এইচঅ্যান্ডএমের ফ্যাক্টরির চাহিদা হচ্ছে আড়াই হাজার মেগাওয়াট। এখন সরকার সঠিক নীতিমালা না নিলে দেশের বস্ত্র এবং পোশাক খাত দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।