মেধা, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদোন্নতি হয়নি অনেক পুলিশ কর্মকর্তার। রাজনৈতিক পরিচয়, আঞ্চলিকতা এবং ভিন্নমতের ট্যাগ দিয়ে কয়েকশ যোগ্য কর্মকর্তার ক্যারিয়ার ধ্বংস করা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে বঞ্চিত রাখা, ডাম্পিং স্টেশনে (কম গুরুত্বপূর্ণ পদ) বদলি এবং বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা ছিল যেন স্থায়ী সংস্কৃতি। এর মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পালিয়ে যায় ওই সময়ের উচ্চপর্যায়ের দলবাজ পুলিশ কর্মকর্তারা। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পদোন্নতি দেওয়া হয় বঞ্চিত অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে। তারপরও বঞ্চিত থেকে যায় অনেকে। ওই সময় বঞ্চিতদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ থাকলেও প্রকাশ্যে তা আসেনি। তখন তারা মনে করেন, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের মূল্যায়ন হবে। কিন্তু নতুন সরকারের আমলেও বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন সেসব বঞ্চিতরা। যে কারণে তাদের ক্ষোভ, অসন্তোষ এখন প্রকাশ্যে আসার উপক্রম। দুঃখে-ক্ষোভে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ায় ঘোষণাও এসেছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্যাডার সার্ভিসের নিয়মানুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর কর্মকর্তাদের পদোন্নতি পাওয়ার কথা থাকলেও অতীতে অনেক দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাকে বছরের পর বছর একই পদে বসিয়ে রাখা হয়। কোনো কোনো কর্মকর্তাকে ব্যাচের জুনিয়রদের অধীনে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। এতে করে অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এ ক্ষেত্রে মূল হাতিয়ার ছিল ‘ট্যাগিং’। কারও পরিবার বা দূর সম্পর্কের আত্মীয় যদি ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের হয়ে থাকে, তবে সেই কর্মকর্তার কপালে জুটেছে ‘অসহযোগিতার’ সিলমোহর। এভাবে পুলিশের একটি বড় অংশকে পদোন্নতি না দিয়ে ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) করে কিংবা বিভিন্ন দপ্তরে সংযুক্ত করে রাখা হয়। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব দেওয়ার বদলে তাদের এমন সব জায়গায় বদলি করা হতো, যেখানে কোনো কার্যকর কাজই ছিল না। শুধু তাই নয়, অনেককে চাকরিজীবন শেষ করার আগেই ‘জনস্বার্থ’র দোহাই দিয়ে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়, যা ছিল তাদের পেশাগত ও সামাজিক মর্যাদার ওপর চরম আঘাত। সাম্প্রতিক সময়েও এ ধরনের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। মেধার অবমূল্যায়নে দক্ষ নেতৃত্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে পুলিশ প্রশাসন।
একজন ডিআইজি ক্ষোভ প্রকাশ করে যুগান্তরকে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আমার ব্যাচের অনেকেই যখন অতিরিক্ত আইজি বা ডিআইজি হয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন আমি ছিলাম এসপি। আমার ব্যাচমেটদের বেশির ভাগই বর্তমানে অতিরিক্ত আইজি। অথচ আমাকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে পুলিশ বাহিনীর সংস্কার এবং ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার যে রূপরেখা তৈরি হয়েছিল, তা চরম আস্থার সংকটে পড়েছে। তার মতে, বিগত সরকারের সুবিধাভোগী একটি চক্র এখনো পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে সক্রিয় থেকে পরিকল্পিতভাবে মেধাবী, সৎ ও জাতীয়তাবাদী ঘরানার কর্মকর্তাদের কোণঠাসা করে রাখছে। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ায় বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি বঞ্চিত রাখা হয়েছে বেশিকিছু কর্মকর্তাকে। এতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তৈরি হয়েছে গভীর আস্থার সংকট। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ বা অভিযোগ ছাড়াই ডিআইজি ড. নাজমুল করিম খানকে দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ সদর দপ্তরে রাখা হয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে বারবার প্রতিহিংসার শিকার হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্যতম ডিআইজি ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত আইজিপির দায়িত্ব পালন করলেও অজ্ঞাত কারণে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতি, দুঃশাসন, গুম-খুন এবং পুলিশের ওপর রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সরাসরি বিরোধিতা করায় তিনি ‘বিপ্লবী পুলিশ কর্মকর্তা’ হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। নীতি ও আদর্শের জন্য তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুই দফায় চাকরি হারান। রাজনৈতিক কারণে ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি প্রথমবার চাকরিচ্যুত হন। পরবর্তীতে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে আদালতের রায়ে ২০০২ সালে চাকরিতে পুনর্বহাল হন। ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর তাকে পুনরায় টার্গেট করা হয়। ট্রাফিক অ্যান্ড ড্রাইভিং স্কুলের (টিডিএস) অতিরিক্ত কমান্ড্যান্ট (এসপি) পদে থাকা অবস্থায় তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি ফের পুলিশে ফেরার সুযোগ পান। এসপি পদ থেকে সরাসরি ডিআইজি পদে পদোন্নতি পান। এরপর আবারও বঞ্চনার শিকার হন তিনি। এরই মধ্যে অন্তত তিন দফা তিনি পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্বেচ্ছায় অবসরের এক আবেদনে আবেদনে ৪ জুন সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান ও ডিআইজি আলি আকবর খান বলেন, কর্মজীবনে আমি দীর্ঘ সময় বঞ্চনার শিকার হয়েছি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আমাকে ওএসডি করা হয়। ২০২২ সালের এপ্রিলে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। দীর্ঘ বঞ্চনা শেষে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর চাকরিতে পুনর্বহাল হই। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা পদোন্নতির তালিকায় আমার নাম না থাকায় আমি পুনরায় বৈষম্যের শিকার হয়েছি বলে মনে করছি। তিনি লিখেছেন, নিজের অযোগ্যতা নিয়ে সরকারের বোঝা হওয়ার পরিবর্তে তিনি সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এর ৪৪ ধারা অনুযায়ী স্বেচ্ছায় অবসর নিতে ইচ্ছুক। এ বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জানা যায়, ১৫তম বিসিএস ক্যাডারে যোগদানকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকেই মাঠপর্যায়ে অত্যন্ত দক্ষ হিসাবে পরিচিত। বিগত সরকারের আমলে এই ব্যাচের একটি বড় অংশকে ডিআইজি পদোন্নতি না দিয়ে বছরের পর বছর অতিরিক্ত ডিআইজি বা এসপি করে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোস্টিং করে রাখা হয়েছিল। বতর্মানেও তাদের অনেকে নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন। ১৭, ১৮ ও ২০তম বিসিএস-এই দুই ব্যাচের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বিগত দেড় দশক ধরে চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। বেশ কয়েকজন সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা দফায় দফায় পদোন্নতি বঞ্চিত হন। এছাড়া ১৮ ও ২০ ব্যাচের বেশ কয়েকজন অতিরিক্ত ডিআইজি এবং এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা এখনো ডিআইজি পদে পদোন্নতির অপেক্ষায় আছেন। ২১ ও ২২তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশকে বিগত আমলে ‘বিএনপি-জামায়াত’ বা ‘নির্দিষ্ট অঞ্চলের’ ট্যাগ দিয়ে ক্যারিয়ার ধ্বংস করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই ব্যাচের কয়েকজনকে পুলিশ সুপার (এসপি) ও অতিরিক্ত ডিআইজি করা হলেও, বড় একটি অংশ এখনো পদোন্নতি পাচ্ছেন না। ২৪ এবং ২৫তম বিসিএসের অনেক দক্ষ কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসাবে জেলা পর্যায় ও বিভিন্ন ব্যাটালিয়নে কর্মরত আছেন। কেবল রাজনৈতিক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে বিগত দিনে এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) খারাপ করে দেওয়া হয়েছিল, যার খেসারত এখনো দিচ্ছেন অনেক কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবু নাঈম রোববার রাতে যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি কয়েকদিন আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ উইংয়ের দায়িত্ব নিয়েছি। বিষয়গুলো এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। তাই এ নিয়ে এখন কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’