Image description
জনতার চোখে বাজেট। প্রতিবছর আকার বাড়লেও হিসাব মেলে না খেটে-খাওয়া মানুষের ।

হাতিরঝিলের অদূরে মীরবাগ মোড়ের পাশে ছোট একটি কাঁচাবাজার। খেটে-খাওয়া নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষই এখানে বেশি আসেন। শুক্রবার হওয়ায় অন্যদিনের চেয়ে ভিড় একটু বেশি। সেই বাজারে দাঁড়িয়ে কথা হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে। আগের দিন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার।

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার সেই বিশাল বাজেটের হিসাব-নিকাশ নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা নেই নাজিম উদ্দিনের। যুগান্তরকে তিনি বলেন, বাজেটের অঙ্ক বা হিসাব আমরা বুঝি না। সরকার কত লাখ কোটি টাকার বাজেট দিল তা দিয়ে আমাদের কী হবে?

দুই ছেলে, এক মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে পাশের একটি বাসায় ভাড়া থাকেন নাজিম। বড় ছেলে ক্লাস ফোরে পড়ে। মেয়ে ওয়ানে। রাজধানী শহরে পাঁচজনের এই সংসারের ব্যয় তার চাকরির অল্প টাকার বেতনে চালানো যে কতটা কঠিন তা যেন প্রকাশ পাচ্ছিল নাজিমের প্রতিটি কথাতেই। তিনি বলেন, মাস শেষে বেতনের টাকায় সংসারই চলে না। বাকি হিসাব কখন করব? বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়াও একটাই-‘বাজারে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম একটু কমলেই স্বস্তি পাব।’

৬৫ বছর পেরিয়েও ফুটপাতে মুচির কাজ করছেন ঋষি দাস। রাজধানীর শান্তিনগর মোড়ে রাস্তার খানিকটা আড়ালে তিনি রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করেই কাজ করেন। প্রতিদিন ৪শ থেকে ৬শ টাকা রোজগার। বাজেট সম্পর্কে খুব বেশিকিছু তার জানা নেই। তবে এ পর্যন্ত অসংখ্যবার বাজেটের মতো শব্দগুলো শুনে এসেছেন। যুগান্তরকে তিনি বলেন, বাজেট হলে তার কী লাভ-ক্ষতি তা কোনো দিন টেরও পাননি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ঋষি দাস। এটা জানেন-কাজ করলে চাল, ডাল, সবজি কিনতে পারবেন। কাজ না করলে না খেয়ে থাকতে হয়। বাজেটে তার কী আসে যায়-এ প্রতিবেদকের কাছে এমন প্রশ্নও রাখলেন ঋষি দাস।

প্রতিদিন ভ্যানে সবজি বিক্রি করেন হারুন মিয়া। সেগুনবাগিচা এলাকায় বাসাবাড়িতে ডেকে ডেকে সবজি বিক্রি করে আসছেন। শুক্রবার বৃষ্টির জন্য বিক্রি হয়নি সবজি, পুঁজিই তুলতে পারেননি। কী করবেন, ভেবে পাচ্ছেন না। বাজেট সম্পর্কে জানতে চাইলে বললেন, তিনিও শুনেছেন, বাজেট হয়েছে। কিন্তু এ বাজেটে তার জীবনে কী প্রভাব ফেলবে সে সম্পর্কে তেমন একটা ধারণা নেই তার।

মগবাজার এলাকার একটি টিনশেডের এক রুমের বাসায় স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে ভাড়া থাকেন হারুন। তিনি বলেন, মেয়েটা বড়। ওর বিয়ে দিয়েছি। ছেলেটা ক্লাস সেভেনে পড়ে। পরিবারের একমাত্র উপর্জনক্ষম ব্যক্তি হারুন মিয়া বলেন, বাজেট নিয়ে আমাদের কী হবে আমাদের তো কাজ ছাড়া আর জীবন চলবে না। প্রতিদিন যা রোজগার করি তা দিয়েই সংসার চলে।

শুধু নাজিম উদ্দিন, ঋষি দাস বা হারুন মিয়াই নন। বিশাল অঙ্কের সরকারি আয়-ব্যয়ের হিসাব বা জাতীয় বাজেটের মারপ্যাঁচ সাধারণ ও খেটে খাওয়া প্রায় প্রতিটি মানুষের কাছেই এক ‘গোলকধাঁধা’। সাধারণ মানুষের মতে, বাজেটের হিসাবের চেয়ে তাদের কাছে দিনশেষে চাল, ডাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামটাই বড় বাস্তবতা। তাদের কাছে বাজেটের সফলতার মাপকাঠি কোনো বড় প্রকল্প বা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নয়; বরং বাজারে গিয়ে কম দামে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারা এবং মাস শেষে ধার না করে সংসার চালাতে পারা।

রাজধানীর কাওরান বাজারের পাশে রেললাইন ঘেঁষে ছোট্ট পান দোকান নিয়ে বসে আছেন বিলকিস বেগম। আগে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করতেন। এখন পানের বাক্স নিয়ে বসেছেন। প্রতিদিন ৫শ থেকে ৬শ টাকা বিক্রি হয়। এতে দেড়শ টাকা লাভ থাকে। তা দিয়ে কোনোমতো বেঁচে থাকেন। থাকেন ঝুপড়ি ঘরে। প্রায়ই ভেঙে ফেলে সংশ্লিষ্টরা। আবার গড়েন, ভাঙা-গড়ার মধ্যে জীবন চলে। বাজেটের কথা জিজ্ঞাসা করতেই ক্ষোভ প্রকাশ করে উত্তর দেন, ‘বাজেট দিয়া আমরা কী করমু। বাজেট কি আমগো কিছু দিব’

তবে বাজেট নিয়ে কিছুটা ব্যতিক্রম কথা শোনা গেল ইউসূফ আলীর মুখে। তিনি মতিঝিল এজিবি কলোনি কাঁচাবাজার এলাকায় সবজি বিক্রি করেন। তার সামনে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রসঙ্গ তুললেই একটানা বললেন বেশকিছু কথা। তার দাবি, ‘বড় বাজেট লুটপাটের ফন্দি। উন্নয়নের নামে শুরু হয় লুটপাট ও দুর্নীতি। বিদেশে টাকা পাচার করে। বাড়ি-গাড়ি করে। তারা কেউ আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে না। এই বাজেট দিয়ে আমার কোনো লাভ নেই।’

একজন সাধারণ সবজি বিক্রেতার মুখে এমন কথা শুনে কৌতূহল বাড়ে। তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে শুরুতে কিছুটা ইতস্তত বোধ করেন। পরে জানান, তিনি মাস্টার ডিগ্রি শেষ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। চাকরি চলে যাওয়ার পর এ ব্যবসা শুরু করেছেন। এখন এটা করেই তার চার সদস্যদের সংসার চলে। ইউসূফ আলী বলেন, বাজেট ঘোষণা নিয়ে আমাদের কোনো লাভ নেই। এটা হলেই সব পণ্যের দাম বাড়ে। সংসারের খরচ ও অভাব বাড়ে। ব্যবসার পুঁজিতে সংকট দেখা দেয়। কিন্তু আমাদের আয় বৃদ্ধি পায় না।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন মানিকনগর এলাকার সবজি বিক্রেতা আবুল বাসার। তিনি যুগান্তরকে বলেন, শুধু বাজেট ঘোষণা ও বাস্তবায়ন দিয়ে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ যে সরকারই হোক-দেশ ও দেশের মানুষের জন্যই বাজেট ঘোষণা করে। কিন্তু আমরা কেউ ভালো নই। বিশেষ করে আমাদের অনেকের চিন্তা-কিভাবে দ্রুত টাকা-পয়সার মালিক হওয়া যায়। এজন্য শুরু হয় দুর্নীতি। এসব দুর্নীতির লাগাম টানতে না পারলে বাজেট আমাদের জন্য বাড়তি চাপ।

রামপুরা হাজীপাড়া এলাকার মুদি দোকানদার তাপস যুগান্তরকে বলেন, আমি অল্প শিক্ষিত মানুষ। সরকারের বাজেটের হিসাব খুব বেশি বুঝি না। কিন্তু বাজেট ঘোষণার পর বেশকিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। এসব নিয়ে ক্রেতারা মাঝে মধ্যে আমাদের সঙ্গে ঝামেলা করে। অনেকে অতিরিক্ত মূল্য দিতে চায় না। অনেক বছর ধরে অ্যাজমা ও জটিল রোগ পারকিনসন্স ডিজিজে ভুগছেন ইয়াছিন আলী শেখ (৬০)। শুক্রবার সকালে অসুস্থ স্ত্রী ও নিজের ওষুধ কিনতে স্থানীয় ফার্মেসিতে যান তিনি। এ সময় ওষুধ কেনায় পকেটে টান পড়ায় ছেলের কাছে ফোন করে কিছু টাকা চান। মুঠোফোনে ছেলের সঙ্গে কথোপকথন শেষ হওয়ার পর তার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। ইয়াছিন আলী জানান, তার পরিবারে মাসে গড়ে ১০ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। সব ওষুধ কিনতে গেলে সংসারের নিত্যপণ্য কিনতে হিমশিম খেতে হয়। পুষ্টিকর খাবারও কিনতে পারেন না।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, গ্যাস্ট্রিকের মতো সাধারণ রোগের চিকিৎসায় এক পাতা সারজেল ক্যাপসুলের দাম ১১০ টাকা। সারা বছরই ওষুধের দাম বাড়তে থাকে। ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে যত ওষুধ লেখেন সব কিনতে পারেন না। দেখা যাবে এক ওষুধের দাম কমলেও অন্য দশটির দাম বাড়বে। তাই শত শত কোটি টাকার বাজেট দিলেও সাধারণ রোগীদের কোনো উপকার হবে বলে মনে হয় না।