Image description

রাজশাহীর সিটি হাটে এখন ক্রেতা-বিক্রেতার উপচে পড়া ভিড়। প্রতিদিন ২৫-৩০ হাজার গবাদি পশু হাতবদল হচ্ছে এ হাটে। সেসব চলে যাচ্ছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন পশুর হাটে। তবে এ সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পরিবহন খাতকে চাঁদাবাজির অভিযোগে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ট্রাকচালকদের অভিযোগ, পথে পথে তাঁদের হাইওয়ে পুলিশ ও রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের দিতে হচ্ছে চাঁদা। ঢাকায় পৌঁছাতেই দিতে হচ্ছে কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা। চট্টগ্রামে গেলে খরচ আরও ২ থেকে ৫ হাজার টাকা বেড়ে যায়। চাঁদা না দিলেই হতে হয় হয়রান কিংবা লাঞ্ছিত।

রবিবার সকালে রাজশাহীর সিটি হাটে গিয়ে দেশের নানান প্রান্ত থেকে আসা ট্রাকচালকদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা মহাসড়কে বেপরোয়া চাঁদাবাজির বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে পরবর্তীতে আরও বেশি হয়রানির ভয়ে তাঁরা গণমাধ্যমে নিজেদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন। তাঁরা জানান, কখনো পুলিশের চেকিংয়ের নামে, আবার কখনো রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারকারী কিছু ব্যক্তি এ টাকা আদায় করছেন। চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে না চাইলে চালকদের হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনেরও শিকার হতে হচ্ছে।

এদিকে ঈদের আগে প্রতিদিনই রাজশাহীর সিটি হাটে ২৫ থেকে ৩০ হাজার গরু, ছাগল ও মহিষ বিক্রি হচ্ছে। রাত গভীর হলে একের পর এক ট্রাক ঢাকা, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্দেশে যাত্রা করে। প্রতি রাতে ৪৫০ থেকে ৫০০ পশুবাহী ট্রাক সিটি হাট থেকে গন্তব্যে যাচ্ছে। চালকদের অভিযোগ, রাজশাহী সিটি হাট থেকে পশুবাহী ট্রাক বের হওয়ার পরই চালকদের প্রথম বাধার মুখে পড়তে হয় মহানগরীর উপকণ্ঠ বেলপুকুর এলাকায়। সেখানে পুলিশ সদস্যরা যানবাহন থামিয়ে ট্রাকপ্রতি ৫০০ টাকা আদায় করেন। একই স্থানে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কিছু নেতা-কর্মীর নাম ব্যবহার করে আরও ৩০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। বেলপুকুর অতিক্রম করে সামনে পুঠিয়ায় পবা হাইওয়ে থানা এলাকায় আবারও টাকা দিতে বাধ্য করা হয়।

সেখানে হাইওয়ে পুলিশের জন্য ৫০০ এবং দলীয় পরিচয়ে স্থানীয় চাঁদাবাজদের জন্য আরও ২০০ টাকা গুনতে হয় চালকদের। এরপর নাটোরের বনপাড়ায় হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পৃথকভাবে চাঁদা আদায় করেন। বনপাড়া ছাড়িয়ে সিরাজগঞ্জের যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তে পৌঁছালে টহল পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের নামে আলাদাভাবে ৫০০ টাকা করে আদায় করা হয় বলেও দাবি তাদের। যমুনা সেতু পার হওয়ার পর টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা ও সখীপুরে যানজট কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির অভিযোগ আছে। চালকদের ভাষ্য, এসব স্থানে হাইওয়ে পুলিশ ট্রাকপ্রতি ৫০০ এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারকারীরা ২০০ টাকা করে আদায় করেন। একই ভাবে গোড়াই এলাকাতেও চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়। গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকায় পৌঁছালে হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা একই হারে টাকা আদায় করেন বলে জানিয়েছেন চালকরা।

রাজধানীর গাবতলী প্রবেশের পর চাঁদাবাজি আরও বেড়ে যায় বলে অভিযোগ চালকদের। গাবতলীর পাশাপাশি শনিরআখড়া, মদনপুর, গাউছিয়া ও আড়াইহাজার এলাকায় হাইওয়ে পুলিশ ট্রাক থামিয়ে প্রতিটি যানবাহন থেকে ৫০০ টাকা করে আদায় করে বলে দাবি তাঁদের। আবার চট্টগ্রামের পথে কুমিল্লা, ফেনী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন অংশে আরও পাঁচ থেকে সাতটি স্থানে একই কায়দায় ট্রাকপ্রতি ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। ট্রাকমালিকরা বলছেন, এখন রাজশাহী থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটি পশুবাহী ট্রাকের ভাড়া প্রায় ৪০ হাজার এবং চট্টগ্রাম পর্যন্ত ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু পথে বিভিন্ন স্থানে চাঁদা দিতে গিয়ে আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যায়। জ্বালানির উচ্চমূল্য, শ্রমিক ব্যয় ও অন্যান্য পরিচালন খরচের সঙ্গে এই অতিরিক্ত চাপ যুক্ত হওয়ায় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজশাহী ট্রাকমালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক সাদরুল ইসলাম বলেন, ‘চালকরা মহাসড়কে চাঁদাবাজির যে চিত্র তুলে ধরছেন সেটিই সত্য। কারণ রাজশাহীর সিটি হাটে সারা দেশ থেকেই ট্রাক আসছে এবং যাচ্ছে। আমার মতে পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নতি হলেও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি।’ বগুড়া হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) আবু তোরাব মোহাম্মদ শামসুল আলম বলেন, মহাসড়কে চাঁদাবাজির বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসেনি। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সত্যতা মিললে কঠোর শাস্তি হবে।