স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মালিকানায় যাওয়ার কথা ছিল এমন সম্পদ কীভাবে বহুজাতিক তামাক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে গেল, তা নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের (বিএটি) বিরুদ্ধে প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জালিয়াতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল ও অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে সংস্থাটি। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ইতোমধ্যে জয়েন্ট স্টক কোম্পানিসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। দুদক সূত্র জানায়, সহকারী পরিচালক সাজিদ-উর-রোমানের নেতৃত্বে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে। অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ ও যাচাই করা হচ্ছে।
দুদক সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম এ প্রতিবেদককে বলেন, ওই অনুসন্ধানের সবশেষ অবস্থা এই মুহূর্তে আমার জানা নেই। তবে অনুসন্ধান কর্মকর্তার কাছে সব আছে। দুদকে জমা হওয়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর করাচিভিত্তিক পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি (পিটিসি) পূর্ব পাকিস্তানে কার্যক্রম শুরু করে। চট্টগ্রাম ও ঢাকায় তাদের বড় দুটি কারখানা গড়ে ওঠে। স্বাধীনতার পর এসব সম্পদ আইন অনুযায়ী ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি’ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার কথা ছিল। পিটিসি পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণও গ্রহণ করেছিল। এরপরও রাজনৈতিক প্রভাব ও জালিয়াতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এ প্রক্রিয়ায় তৎকালীন পিটিসির ফাইন্যান্স ম্যানেজার এবং পরবর্তীকালে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা জামালুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট ভূমিকা রেখেছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ প্রক্রিয়ার কারণে ৫৫ বছরে বাংলাদেশ ২০-৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তামাক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো এর বাংলাদেশে কার্যক্রমের ইতিহাস শত বছরের বেশি পুরোনো। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, ১৯১০ সালে ‘ইম্পেরিয়াল টোব্যাকো’ নামে এ অঞ্চলে কার্যক্রম শুরু হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এর নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি করা হয়। পরে ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি ‘ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ’ নামে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে কোম্পানিটি দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অন্যতম বৃহৎ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। তাদের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে- বেনসন অ্যান্ড হেজেস, জন প্লেয়ার গোল্ড লিফ, লাকি স্ট্রাইক, ক্যাপস্টান, স্টার, ডার্বি ও হলিউড। দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, অনুসন্ধান শুরুর পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে যে স্বাধীনতার পর পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, রাষ্ট্রীয় সম্পদ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া কতটা বৈধ ছিল এবং বহুজাতিক কোম্পানির মালিকানা পরিবর্তনের পেছনে কোনো জালিয়াতি হয়েছিল কি না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২১ মে দুদকের সহকারী পরিচালক সাজিদ-উর-রোমান ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিয়ে কোম্পানিটির নথি তলব করে। ওই চিঠিতে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেডের বাংলাদেশ অংশের বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেডের ঢাকা ও চট্টগ্রাম ফ্যাক্টরি দুটির মালিকানা কীভাবে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি পেল সে সংক্রান্ত রেকর্ডপত্রের ছায়ালিপি সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। ১৫ জুনের মধ্যে ওইসব নথি সরবরাহের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। একই তারিখে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের নিবন্ধকের কাছেও পৃথক চিঠি দেওয়া হয়েছে। এই চিঠিতে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানির নিবন্ধন সংক্রান্ত রেকর্ড, অথরাইজড ক্যাপিটাল, পেইড আপ ক্যাপিটাল, শেয়ার সংখ্যা, পরিচালকবৃন্দ, পরিচালকদের সম্মতিপত্র এবং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব রেকর্ডপত্র চাওয়া হয়েছে।