Image description

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনায় প্রথম ১০০ দিন পূর্ণ করল। পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সরকারের জন্য ১০০ দিন খুবই কম সময়। কিন্তু একটি সকাল যেমন দিনের পূর্বাভাস দেয়, তেমনই যেকোনো সরকারের প্রথম ১০০ দিনে বোঝা যায় তার বৈশিষ্ট্য এবং যাত্রাপথ। বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ফ?্যামিলি কার্ড থেকে শুরু করে কৃষক কার্ড, খাল খননসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। সরকার সময় নষ্ট না করে দ্রুত নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সচেষ্ট। তবে প্রথম ১০০ দিনের কর্মসূচির মধ্যে সবচেয়ে যুগান্তকারী এবং উদ্ভাবনী পদক্ষেপ হলো পর্যটন খাতে ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই পর্যটন শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এসব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন বাংলাদেশকে বদলে দিতে পারে। এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দুয়ার উন্মোচিত হতে পারে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও মান নিয়ন্ত্রণে গতি আনতে অর্থমন্ত্রীকে সভাপতি করে উচ্চ পর্যায়ের ‘পর্যটনসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’ গঠন করেছে সরকার।

২৩ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারীকৃত এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। ২১ মে এ প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১৭ সদস্যের এ কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন অর্থমন্ত্রী। কমিটির সদস্যরা হলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী; পররাষ্ট্রমন্ত্রী; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী; সংস্কৃতিমন্ত্রী; ভূমিমন্ত্রী; বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী; বাণিজ্যমন্ত্রী; গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী; পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী; রেলপথমন্ত্রী; নৌপরিবহনমন্ত্রী; বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী; পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী; বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভার এ কমিটিকে সাচিবিক ও কারিগরি সহায়তা দিতে ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব (সিনিয়র সচিবসহ) ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যুক্ত করা হয়েছে।

 এর মধ্যে ভূমি, স্বরাষ্ট্র, অর্থ বিভাগ, রেলপথ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, পররাষ্ট্র, সংস্কৃতি, পরিকল্পনা, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক, পার্বত্য চট্টগ্রাম, স্থানীয় সরকার, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন, নৌপরিবহন, পরিবেশ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবরা কমিটিকে তথ্য ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করবেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে কমিটির তিনটি মূল কাজের ক্ষেত্র বা কর্মপরিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো-এক. বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সার্বিক উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সরকারকে সুনির্দিষ্ট নীতিগত পরামর্শ প্রদান। দুই. দেশের পর্যটন খাতের লুক্কায়িত সম্ভাবনা, নতুন সুযোগ, বিদ্যমান সমস্যা এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জসমূহ নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করে তা সমাধানের পথ বাতলানো। তিন. পর্যটন খাতের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশিবিদেশি এবং সরকারি-বেসরকারি (পিপিপি) বিনিয়োগ ও অংশীদারির ক্ষেত্রসমূূহ সুনির্দিষ্ট করা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর কর্মপন্থা ও কৌশল নির্ধারণ। প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, এ কমিটি কাজের সুবিধার্থে প্রয়োজনে যেকোনো নতুন সদস্যকে ‘কো-অপ্ট’ (অন্তর্ভুক্ত) করতে পারবে। কমিটির সাচিবিক সহায়তার দায়িত্বে থাকবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

এই মন্ত্রিপরিষদ কমিটি কার্যকর হলে এ দেশের অর্থনীতি নতুন মাত্রা পাবে। বাংলাদেশ পর্যটন খাতে এক অফুরন্ত সম্ভাবনার দেশ। প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি এই বাংলাদেশ। রাষ্ট্রের একটু নজরদারি এবং পৃষ্ঠপোষকতা আমাদের পর্যটন শিল্পের বিকাশে অভূতপূর্ব অবদান রাখতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প ছিল উপেক্ষিত, অবহেলিত। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ। নদীমাতৃক ভূখণ্ড, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্রসৈকত, সবুজ বনানী, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি সব মিলিয়ে এটি একটি পর্যটন সম্ভাবনাময় দেশ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই সম্ভাবনা আজও যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা কিংবা নেপালে ছুটে যায়; অথচ বাংলাদেশের কক্সবাজার, সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন, সিলেট বা পাহাড়ি অঞ্চলগুলো পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায় না। প্রশ্ন হচ্ছে-কেন আমরা পারছি না পর্যটনকে অর্থনীতির শক্তিশালী খাতে পরিণত করতে?

বাংলাদেশে পর্যটনের সম্ভাবনা অপরিসীম। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পাহাড়বেষ্টিত পার্বত্য চট্টগ্রাম, চা-বাগানের নগর সিলেট, প্রাচীন নগরগুচ্ছ মহাস্থানগড়, ময়নামতী কিংবা গৌড়-এসব স্থান বিশ্বমানের পর্যটন আকর্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে ইকো ট্যুরিজম, কালচারাল ট্যুরিজম, রিলিজিয়াস ট্যুরিজম ও মেডিকেল ট্যুরিজমে বাংলাদেশ নিজের জায়গা তৈরি করতে পারে। সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বা কাপ্তাই হ্রদকে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনায় উন্নয়ন করলে আন্তর্জাতিক ক্রুজ পর্যটনও সম্ভব। এখন সময় এসেছে পর্যটনকে শুধু অবসর বা আনন্দের খাত হিসেবে না দেখে একটি অর্থনৈতিক শিল্প হিসেবে দেখার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো তাদের জিডিপির বড় অংশ পর্যটন থেকে অর্জন করছে। বাংলাদেশেও যদি বছরে কেবল ১০ লাখ বিদেশি পর্যটককে আকর্ষণ করা যায়, তবে তা থেকে অন্তত ৯ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব অর্জন সম্ভব। এর সঙ্গে যুক্ত হবে স্থানীয় পণ্যের বিক্রি, কারুশিল্পের প্রসার, কৃষিপণ্য সরবরাহ, রেস্তোরাঁ ব্যবসা, পরিবহন, এমনকি তথ্যপ্রযুক্তি খাতও। অর্থাৎ পর্যটন হতে পারে সার্বিক অর্থনৈতিক চক্রের চালিকাশক্তি। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো জায়গার উন্নয়ন যেন তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে পরিকল্পনার শুরু থেকেই। স্থানীয় মানুষকে পর্যটন ব্যবসার অংশীদার করতে হবে, যাতে তারা নিজেদের সংস্কৃতি, খাবার, সংগীত বা হস্তশিল্প দিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারেন।

বাংলাদেশের পর্যটন খাত এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে সীমাহীন সম্ভাবনা, অন্যদিকে বাস্তব সমস্যা। আমরা যদি অবকাঠামো উন্নয়ন, সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও প্রচার জোরদার করতে পারি, তবে বাংলাদেশও দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বিশ্বমানের নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। সেই সময়ের দাবি পূরণ করলেন তারেক রহমান। এই কমিটির প্রধান হিসেবে অর্থমন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে সরকার পর্যটন শিল্পের বিকাশে তার দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশে পর্যটন স্পটগুলোকে বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য ঢেলে সাজানো হলে, শুধু এ খাত থেকেই বছরে ৯ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।

পর্যটনের উন্নয়ন কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। আর এ বাস্তবতা প্রথমবারের মতো একটি সরকার উপলব্ধি করেছে, এটাই আশার কথা। কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ১২টি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের রাখা হয়েছে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে এসব মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের পর্যটন খাতের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করেই এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। যেমন আমাদের অবকাঠামোগত দুর্বলতা একটি বড় বাধা। পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য সড়ক যোগাযোগ, নিরাপদ পরিবহন, মানসম্মত হোটেল, তথ্যকেন্দ্র, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা অপরিহার্য। কিন্তু দেশের অধিকাংশ পর্যটন এলাকায় যাওয়ার রাস্তা এখনো সংকীর্ণ, অনিরাপদ এবং অপরিকল্পিত। কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রেও যানজট, পানিসংকট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দখলদারি বড় সমস্যা। সিলেট বা বান্দরবানের মতো পাহাড়ি অঞ্চলেও পর্যাপ্ত হোটেল বা রিসোর্ট নেই, যেগুলো আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে। 

ফলে স্থানীয় পর্যটক ছাড়া বিদেশিরা তেমন ভরসা পান না। আশা করি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এই মন্ত্রিপরিষদ কমিটি এ সমস্যাগুলোর সমাধানে দ্রুত কাজ শুরু করবে। পর্যটন বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা এখনো পেশাদার নয়। সরকার ও বেসরকারি খাতে অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়, কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন পর্যায়েই গলদ দেখা যায়। অনেক জায়গায় ‘ইকো ট্যুরিজম’ বা ‘কালচারাল ট্যুরিজম’ ধারণা তুলে ধরা হলেও পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতির সুরক্ষা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না। আমাদের পর্যটন খাত এখনো ‘সিজনাল বিজনেস’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেখানে স্থায়ী কর্মসংস্থান বা দীর্ঘমেয়াদি রাজস্বের দিকটি অবহেলিত। এ কমিটির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী পর্যটন শিল্পের বিকাশে একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। এখন এ কমিটির দায়িত্ব হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী পর্যটন শিল্প ঢেলে সাজানো।

বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারে উপস্থাপন করার মতো কার্যকর ব্র্যান্ডিং নেই। বিমানবন্দর, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা বিদেশি সংবাদমাধ্যমে আমাদের পর্যটন নিয়ে কোনো ধারাবাহিক প্রচার দেখা যায় না। নেপাল ‘বিউটিফুল নেপাল’, মালয়েশিয়া ‘ট্রুলি এশিয়া’, শ্রীলঙ্কা ‘ওয়ান্ডার অব এশিয়া’ এ স্লোগানগুলো বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো কোনো একক, প্রভাবশালী পর্যটন ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারেনি। আমরা আশা করি এ কমিটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের পর্যটন ব্র্যান্ড তৈরি করবে। বাংলাদেশের পর্যটন খাত একটি উপেক্ষিত কিন্তু অপার সম্ভাবনাময়। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে এ খাতের উন্নয়নে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এখন সংশ্লিষ্ট মহলের দায়িত্ব একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে এ খাতের বিকাশে কাজ করা। পর্যটন খাতই বদলে দিতে পারে বাংলাদেশকে। এ দেশকে করতে পারে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে পারে।