পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ঘরে ফেরা মানুষের ভিড়। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে শহর থেকে গ্রামে এবং এক জেলা থেকে আরেক জেলায় মানুষের চলাচল বাড়বে কয়েকগুণ। এমন পরিস্থিতিতে দেশে চলমান হাম পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। হাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলেও মত অনেকের। বিশেষ করে আক্রান্ত শিশুদের চলাচল ও জনসমাগমে অংশ নেওয়ার কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গ নিয়ে আরও ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা ৫৪৫।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ঈদের সময় এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় মানুষের চলাচল বেড়ে যায়। যাদের শরীরে হামের ভাইরাস রয়েছে, তারা অজান্তেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। কারণ হামের র্যাশ ওঠার চার দিন আগে থেকেই রোগটি সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে। পরিবারের কারও জ্বর, সর্দি বা নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ থাকলে তাকে নিয়ে ভ্রমণ না করাই ভালো। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি।’
রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা গেছে, হামের ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে। জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ডে চিকিৎসক ও নার্সদের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক অভিভাবককে শিশুদের নিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। হাসপাতালের এক দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স বলেন, ‘আগে অনেক রোগীকে জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা দিয়ে বাসায় পাঠানো যেত। এখন বেশির ভাগ রোগীকেই ভর্তি করতে হচ্ছে। রোগীর অবস্থা আগের তুলনায় বেশ জটিল।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ঈদ উপলক্ষে অভিভাবকদের বিশেষ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। গত শনিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। আক্রান্ত শিশুদের অন্যদের সঙ্গে মেশানো যাবে না। বিশেষ করে ঈদের সময় আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া বা ভিড়ের মধ্যে নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এলে অন্য শিশুরাও সহজে আক্রান্ত হতে পারে। অতীতে টিকা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে বর্তমান পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। তবে এখন টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।’
হামের রোগীদের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও জরুরি স্বাস্থ্যকর্মীদের ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যেসব হাসপাতালে হামের রোগী ভর্তি আছে, সেসব হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের কর্মস্থলে থাকতে হবে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’ এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মা শিশু ও জেনারেল হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ডা. মিশু তালুকদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ঈদুল ফিতরের পরে হামের সংক্রমণ বেড়ে গিয়েছিল। দেশের অধিকাংশ জেলা, উপজেলা, গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছিল রোগী। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে আবারও মানুষের যাতায়াত বাড়ছে। এতে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে প্রায় ১৮ জন পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারে। তাই ঈদে ভ্রমণের আগে পরিবারের সদস্যদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
হাম ও উপসর্গে আরও ১৭ শিশুর মৃত্যু : হাম ও উপসর্গ নিয়ে দেশে আরও ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এটি এক দিনে সর্বোচ্চ হাম ও উপসর্গে শিশু মৃত্যুর ঘটনা। এর মধ্যে ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে, আর একটি শিশুর হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ নিয়ে গত ৭১ দিনে দেশে হাম ও উপসর্গে মৃতের সংখ্যা ৫৪৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৫৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হামে ৮৭ শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম বিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত) হাম ও উপসর্গ নিয়ে যে ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে ৭ শিশুই ঢাকা বিভাগের। এ ছাড়া সিলেট বিভাগে তিনজন, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে দুজন করে এবং ময়মনসিংহে একজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১২৭ জন। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৭ শিশু। তাদের মধ্যে ৪২৭ শিশুই ঢাকা বিভাগের। এরপর আছে চট্টগ্রাম (২০৮), বরিশাল (১২৮) ও খুলনা (৯৫)। গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৪০৫ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে। গত ১৫ মার্চ দেশে প্রথম হাম রোগী শনাক্ত হয়।