কন্যাশিশু তো বটেই বিকৃত রুচির মানুষদের যৌন লালসা থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোমলমতি ছেলেশিশুরাও। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ১৫ জন ছেলেশিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এদের মধ্যে ১২ জনের বয়সই ৭ থেকে ১২ বছর। ছেলেশিশুদের নির্যাতনের ঘটনাগুলো তুলনামূলক সামনে কম আসছে। মানবাধিকার কর্মীরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশপাশি ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেও ছেলে শিশুরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তারা আরও জানান, ছেলেশিশুদের এই অপরাধের বিচারপ্রাপ্তিতে দেশে প্রচলিত যে আইন আছে, তার বাস্তবায়নের জায়গাটি বেশ দুর্বল। বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্যে, বাংলাদেশে মেয়েশিশুদের মতো ছেলেশিশুরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ছেলেশিশুটি গুরুতর অসুস্থ হলে বা নির্যাতনে মৃত্যু হলেই বিষয়টি সামনে আসছে। তা না হলে ছেলেশিশুদের যৌন নির্যাতনের ঘটনা খুব একটা সামনে আসে না।
সংস্থাটির মতে, ছেলেশিশুদের যৌন নির্যাতনে আইনি পদক্ষেপ ও বিচার নিয়ে পুলিশ ও আইনজীবীদের মধ্যেও অস্পষ্টতা রয়েছে। সবশেষ ১৯ মে রাজধানীর রামপুরা থানাধীন বনশ্রী এলাকার একটি মাদ্রাসায় ১০ বছরের শিশুকে যৌন নির্যাতন করা হয়। পরে শিশুটির গলায় গামছা প্যাঁচানো ঝুলানো লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। সুরতহাল প্রস্তুতের সময় শিশুটির পায়ুপথে অস্বাভাবিক যৌনাচারের আলামত দেখতে পান তদন্তের কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় পুলিশ মাদ্রাসার আরেক শিক্ষার্থী শিহাব হোসেনকে (১৯) গ্রেপ্তার করে। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানায়, শিহাবের বিরুদ্ধে আরও চার শিক্ষার্থীর সঙ্গে যৌনাচারে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো থেকে পাওয়া তথ্যে, কাওমি মাদ্রাসায় ছেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশির ভাগ দরিদ্র হওয়ায় অপরাধীরা এই শিশুদের সঙ্গে যৌন নির্যাতনের সুযোগ নেয়। ভয় ও নীরবতার কারণে এই শিশুদের ওপর হওয়া যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো খুব একটা সামনে আসে না। জানা যায়, দেশে শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে বিচারের জন্য আইনের দুই নীতি। কন্যাশিশু নির্যাতিত হলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে যেতে হয়। ছেলে শিশু হলে কী হবে তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
এ নিয়ে পুলিশ ও আইনজীবীদের মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। ছেলে শিশুর যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় ‘অস্বাভাবিক অপরাধ’ নামে একটি বিষয়ের উল্লেখ আছে। যেখানে এর স্পষ্টতা নেই। এই ভিন্নতার কারণে অপরাধের প্রবণতা বেড়েই চলছে। ছেলে শিশুদের সঙ্গে হওয়া অপরাধের বিচার করার ক্ষমতা ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে। আর ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের বিচারকে অপরাধীরা হালকাভাবে নেয়। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালক (রাইটস অ্যান্ড গভর্নেন্স) বনশ্রী মিত্র নিয়োগী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রচলিত আইনে ছেলে-মেয়ে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি। ছেলে শিশুর চেয়ে মেয়ে শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঘটনা বেশি বলে ছেলে শিশুর নির্যাতনের ঘটনা সামনে কম আসে। ছেলে শিশুদের এই ঘটনাগুলো খুব একটা প্রকাশও পায় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ঘরেও ছেলে শিশুরা এই নির্যাতনের শিকার হয়। দেশে যে আইন আছে তা বাস্তবায়নের জায়গাটি খুবই দুর্বল। শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী এ অপরাধের বিচার পায় না।