দেশে হামের প্রাদুর্ভাব যেন কমছেই না। রোববার সকাল থেকে সোমবার সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় মিজেলস ভাইরাসবাহিত হামে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় ভাইরাসটিতে আক্রান্তের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, গত চব্বিশ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা এক হাজার ৪০৫ জন। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ১৮ মে সকাল পর্যন্ত সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ৯১১ জনে। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা ৮৯ জন এবং এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা সাত হাজার ৮৫৬ জন। এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে মোট ৩৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৭৫ জনের।
এমন বাস্তবতায় চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম নিয়ন্ত্রণে আক্রান্তের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশুদের মায়ের বুকের দুগ্ধ পান করানো, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত হাম শনাক্তকরণ, আইসোলেশনও টিকাদান জরুরি। সোমবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) ‘বাংলাদেশে হামের পুনুরুত্থান : আজকের সংক্রমণ ও আগামীদিনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি’ শীর্ষক সেন্ট্রাল সেমিনারে চিকিৎসকরা এ কথা বলেন।
বিএমইউর সেন্ট্রাল সেমিনার সাব-কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারে তিনটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। বিএমইউর শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জেসমিন মোর্শেদ তার উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলেন, হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ কিন্তু টিকা কভারেজের ঘাটতির কারণে প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ৫ বছরের কম বয়সী ও অপুষ্ট শিশুদের ঝুঁকি বেশি এবং জটিলতা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। টিকাদান, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত শনাক্তকরণ, আইসোলেশন ও দ্রুত চিকিৎসাই হাম নিয়ন্ত্রণের মূল উপায়।
ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শারমিন সুলতানা ‘হাম : নির্মূলের স্বপ্ন থেকে প্রাদুর্ভাবের বাস্তবতা’ শীর্ষক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, একসময় বিশ্বব্যাপী টিকাদান কর্মসূচির সফলতার কারণে হাম রোগ নির্মূলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। ব্যাপক টিকাদান, গণসচেতনতা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির ফলে বহু দেশে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। বাংলাদেশেও ইপিআই কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে শিশুর টিকাদান বৃদ্ধি পাওয়ায় হামজনিত মৃত্যু ও জটিলতা অনেকাংশে হ্রাস পায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও বিভিন্ন দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। টিকা গ্রহণে অনীহা, কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়া, অপুষ্টি, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং অভিবাসন ইত্যাদি কারণে অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে সমাজে হার্ড ইমিউনিটি দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
ভাইরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এসএম রাশেদ-উল-ইসলাম তার ‘বাংলাদেশে হামের পুনরুত্থান : আজকের সংক্রমণ, আগামী দিনের ঝুঁকি’ বিষয়ক প্রবন্ধে বলেন, দেশে বর্তমানে সক্রিয় হাম সংক্রমণ চলছে এবং টিকাদান ঘাটতি ও বিলম্বিত ইপিআই ডোজের কারণে শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে। যার ফলে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া (প্রায় ৩৯ শতাংশ), ডায়রিয়া (২৯-৩৮ শতাংশ), এনসেফালাইটিস (১:১০০০), কানের সংক্রমণ ও ভিটামিন এ ঘাটতির কারণে অন্ধত্ব দেখা দেয়। এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মৃত্যুহার প্রায় ১৪.৪ শতাংশ যা টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে সর্বাধিক। টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে রোগ তুলনামূলকভাবে হালকা হয় এবং মৃত্যুহার কমে যায়। অন্যদিকে টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে জটিলতা ও মৃত্যুহার সর্বাধিক।
সেন্ট্রাল সেমিনার সাব-কমিটির সভাপতি ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আফজালুন নেছার সভাপতিত্বে এবং ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. খালেদ মাহবুব মুর্শেদ (মামুন)-এর সঞ্চালনায় সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, গবেষক, রেসিডেন্ট শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।