আসন্ন বাজেটে শুধু করহার নয়, করের আওতা বাড়ানোর ছক থাকবে। রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানমন্ডি ও উত্তরার পাশাপাশি চট্টগ্রামের খুলশীর মতো বিভাগীয় শহরের অভিজাত এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের কর নথি যাচাই করতে ডোর-টু-ডোর জরিপ চালানোর পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এনফোর্সমেন্ট বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একইভাবে অভিজাত এলাকার বিপণিবিতান থেকে ভ্যাট আদায় কঠোরভাবে মনিটরিং করা হবে।
সুশীল সমাজ, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ পেশাজীবীদের অভিযোগ-যারা কর দেয়, এনবিআর শুধু তাদের ওপরই করের বোঝা চাপায়। এ তকমা ঘুচাতে চাচ্ছে এনবিআর। তাই করদাতার সংখ্যা বাড়াতে দেশের সব অভিজাত এলাকায় আগামী অর্থবছরে সাঁড়াশি কর জরিপ চালাবে এনবিআর। করজাল বৃদ্ধি এবং সম্পদ কর আদায়ে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে।
বাজেটসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী বছর সম্পদ কর আদায়ে বেশি জোর দেওয়া হবে। এ খাত থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য জমির মৌজামূল্য বাজারভিত্তিক করতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে কাজও শুরু হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায় মনে করে, কেবল প্রগ্রেসিভ করব্যবস্থার মাধ্যমে কর ন্যায্যতা বাড়ানো সম্ভব।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর সংস্কারের প্রধান বাধা রাজনৈতিক অর্থনীতির কাঠামো। আয়করব্যবস্থার আওতা সংকীর্ণ রেখে দীর্ঘদিন একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে করজালের বাইরে রাখা হয়েছে। বিএনপি এ বৈষম্যমূলক কাঠামোর অবসান ঘটাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। উচ্চ-আয়ের ব্যক্তি, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও সম্পত্তির মালিকদের করজালের আওতায় আনা হবে এবং ডিজিটাল ব্যবস্থা, তথ্য বিনিময় ও ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষার মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ করা হবে। একই সঙ্গে করছাড় ও প্রণোদনাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনা হবে। এতে আরও বলা হয়, বিএনপি আধুনিক সম্পত্তি কর ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। এতে উৎপাদন ও বিনিয়োগ থেকে সৃষ্ট সম্পদ রাজস্বে রূপান্তরিত হবে এবং কর কাঠামোর ন্যায্যতা বাড়বে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাজেটসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, রাজধানীর বনানী, গুলশানে মাঝারি আকারের ২ হাজার স্কয়ার ফুটের একটি ফ্ল্যাট ৫-৬ কোটি টাকায় বিক্রি হয়। অফিস স্পেসের দাম তো আকাশছোঁয়া, যা উন্নত বিশ্বের চেয়েও কয়েকগুণ। এ লেনদেনগুলো কঠোর মনিটরিং করার মাধ্যমে যথাযথ কর আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে রিটার্নে অপ্রদর্শিত সম্পদের কীভাবে বৈধতা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। অবশ্য প্রথম বাজেটেই কালোটাকা সাদা করার মতো সুযোগ দিয়ে সমালোচনা উসকে দিতে চান না প্রধানমন্ত্রী। তবে অন্য উপায়ে এটি করা যায় কি না, তা ভাবতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে ভ্যাট আদায় বাড়াতে নামিদামি শোরুম, শপিংমল, রেস্টুরেন্টে নজরদারি বাড়ানো হবে। ইতোমধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাজেটের পর মাঠ পর্যায়ে প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
সূত্র জানায়, আগামী বাজেটে কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এজন্য ভিন্ন আঙ্গিকে নতুন শিল্পকে কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হবে। তবে এসব শিল্পে ‘সানসেট ক্লজ’ যুক্ত করে দেওয়া হবে। এরপর ওই শিল্প আর অবকাশ সুবিধা পাবে না। আগে ৩২টি খাত কর অবকাশ সুবিধা পেত, যা অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করে দেয়। এ খাতগুলোর মধ্যে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রেডিয়েন্ট ও রেডিও ফার্মাসিউটিক্যালস; কৃষি যন্ত্রপাতি, অটোমোবাইল; ব্যারিয়ার কন্ট্রাসেপটিভ ও রাবার ল্যাটেক্স; ইলেকট্রনিক্সের মৌলিক উপাদান অর্থাৎ রেজিস্টর, ক্যাপাসিটর, ট্রানজিসটর, ইনটিগ্রেটেড সার্কিট, মাল্টিলেয়ার পিসিবি উৎপাদন খাতের মতো কিছু খাতে নতুন বিনিয়োগে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হ্রাসকৃত হারে কর সুবিধা পেতে পারে।
এ তালিকায় আরও যুক্ত হতে পারে বাইসাইকেল ও এর খুচরা যন্ত্রাংশ; জৈব সার; জৈব প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষিপণ্য; বয়লার; কম্প্রেসর ও এর যন্ত্রাংশ; কম্পিউটার হার্ডওয়্যার; হোম অ্যাপ্লায়েন্স; কীটনাশক ও বালাইনাশক; চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য; স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ; পেট্রোকেমিক্যালস; ফার্মাসিউটিক্যালস; প্লাস্টিক রিসাইক্লিং; টেক্সটাইল যন্ত্রপাতি; খেলনা উৎপাদন; টায়ার উৎপাদন; বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার এবং অটোমোবাইল পার্টস ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন। এছাড়া অটোমেশন ও রোবোটিক্স ডিজাইন, ম্যানুফ্যাকচারিং ও এর পার্টস ও উপাদান; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সিস্টেম ডিজাইন ও ম্যানুফ্যাকচারিং; ন্যানোটেকনোলজিভিত্তিক পণ্য উৎপাদন এ সুবিধার আওতায় আসতে পারে।