জুন থেকে আগস্ট-তিন মাসের জন্য ৯ লাখ ৩০ হাজার টন ডিজেল এবং জেট ফুয়েল কিনতে যাচ্ছে সরকার। এতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। তবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়া এবং ইনসুরেন্সের প্রিমিয়াম বাবদ অতিরিক্ত ব্যয় হবে ৭০০ কোটি টাকার বেশি। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ৯ লাখ ৩০ হাজার টন জ্বালানি কেনার দরপত্রে এই দর পেয়েছে। দুই প্যাকেজে এই তেল কেনা হচ্ছে।
টেন্ডারের দুই প্যাকেজের সবকটিতে তেল বিক্রির কাজ পেতে যাচ্ছে এ খাতের বিতর্কিত সরবরাহকারী ডা. এজাজুর রহমানের প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিপিসিতে দুটি প্যাকেজে তেল সরবরাহে ৭টির বেশি প্রতিষ্ঠান দরপত্র ক্রয় করে। কিন্তু এবার রহস্যজনকভাবে ডা. এজাজের প্রতিষ্ঠান ছাড়া তেমন কেউ অংশ নেয়নি। সুতরাং আগামী তিন মাসের তেল সরবরাহ তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ডা. এজাজ ২০০৯ সাল থেকে বিপিসিতে জ্বালানি তেলের ব্যবসা করে আসছেন। তাকে আওয়ামী লীগ সরকার আমলের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ঘনিষ্ঠজন হিসাবে সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন।
বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী সম্প্রতি এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, বিপিসির তেল সরবরাহের সিন্ডিকেট ভাঙতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে সংশ্লিষ্টদের বলা হচ্ছে। এজন্য নতুন নতুন কোম্পানি বাংলাদেশে তেল সরবরাহে আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু কেন জানি কোন শক্তিবলে বিপিসিতে এক ব্যক্তির সিন্ডিকেটের বাইরে কেউ তেল সরবরাহ দিতে পারে না। বিপিসি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর পর ডা. এজাজের কোম্পানিগুলো মার্চে তেল সরবরাহে অস্বীকৃতি জানিয়ে বাংলাদেশকে বিপাকে ফেলে। যার কারণে সরকারকে রেশনিং করতে হয়েছে এবং দেশের মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, গত সপ্তাহে দুইটি প্যাকেজে জ্বালানি তেল কেনার দরপত্র খোলা হয়েছে। প্যাকেজ-১-এ ৪ লাখ ৮৬ হাজার টন পরিশোধিত ডিজেল এবং জেট ফুয়েল কেনার প্রস্তাব। এই প্যাকেজে ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর লিমিটেড সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে। ইউনিপ্যাকের প্রস্তাবে ডিজেল প্রতি ব্যারেল প্রায় ১৫৪ ডলার এবং জেট ফুয়েল ১৫০ ডলারের বেশি দর দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে প্রিমিয়াম (জাহাজ ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ) প্রতি ব্যারেলের জন্য গড়ে সাড়ে ১৩ ডলার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ৪ লাখ ৮৬ হাজার টন ডিজেল এবং জেট ফুয়েল ও প্রিমিয়ামে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা।
প্যাকেজ-২-এ ৪ লাখ ২৫ হাজার টন পরিশোধিত ডিজেল এবং জেট ফুয়েল কেনার প্রস্তাবে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে ভিটল এশিয়া লিমিটেড। প্রতি ব্যারেল ডিজেল এবং জেট ফুয়েলের জন্য তেলের দাম দেওয়া হয়েছে (এই দাম নির্দিষ্ট নয়, প্যাল্টার্সের সূচক অনুযায়ী সরবরাহের সময় কমবেশি হতে পারে) ১৫২ থেকে ১৫৩ ডলার। প্রিমিয়াম ধরা হয়েছে ১৩ ডলারের বেশি। এই ৪ লাখ ২৫ হাজার টন তেল কিনতে সরকারের ব্যয় হবে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা। জানা যায়, চলতি সপ্তাহের বুধবারের ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভায় এই ৯ লাখ ৩০ হাজার টন তেল কেনার প্রস্তাব পাঠাতে পারে জ্বালানি বিভাগ।
প্রিমিয়াম কত বেড়েছে : জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বিভিন্ন প্যাকেজে যে তেল কেনা হচ্ছে, সেখানে বিপিসিকে প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে প্রতি ব্যারেলে সাড়ে ৫ ডলার। সেখানে এবার প্রিমিয়াম দিতে হবে ১৩ ডলারের বেশি। অর্থাৎ প্রতি ব্যারেলে শুধু প্রিমিয়াম বেড়েছে প্রায় ৮ ডলার। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এই প্রিমিয়াম বেড়েছে বলে জানা গেছে। সরকারি কর্মকর্তা এবং অন্যরা জানান, ৯ লাখ ৩০ হাজার টনের এই দুই প্যাকেজে শুধু প্রিমিয়াম খাতে সরকারকে অতিরিক্ত দিতে হবে ৭০০ কোটি টাকা।
দুই প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় এজেন্ট ডা. এজাজ : জ্বালানি তেল কেনার প্রস্তাবে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসাবে কাজ পাওয়া ইউনিপ্যাক এবং ভিটল এশিয়া নামের এ দুই প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় এজেন্ট ডা. এজাজ হোসেন। বিপিসিতে তেল সরবরাহের জন্য তালিকাভুক্ত কোম্পানি আছে ১১টি। এর মধ্যে ৬টির স্থানীয় এজেন্ট হচ্ছে ডা. এজাজের কোম্পানি। আবার স্থানীয় এজেন্টের এই অফিস কাওরান বাজারের বিপিসির অফিসের একই ভবনে। সংশ্লিষ্টরা জানান, তেল খাতের সাবেক কর্মকর্তাদের বিশেষ করে তেল ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িতদের এই অফিসে নিয়োগ দেওয়া হয়। এমন ১০ জন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এখন তার অফিসে কাজ করেন। সম্প্রতি বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, ২০২৫-২০২৬ সালে বিভিন্ন প্যাকেজের মাধ্যমে (দরপত্রের মাধ্যমে) জ্বালানি তেল কেনা হয় ২৭ লাখ ১০ হাজার টন। এর মধ্যে ডা. এজাজের কোম্পানিগুলো পেয়েছে ১৮ লাখ ৪০ হাজার টন কাজের অর্ডার। এর বাইরে সরকার টু সরকার (জি টু জি) মাধ্যমে ৫৫ হাজার টনের মতো তেল কেনা হয়েছে। যার মধ্যে ডা. এজাজের ৬টি প্রতিষ্ঠান তেল সরবরাহের কাজ পেয়েছে ৪৩ লাখ টনের মতো। অর্থাৎ, দেশে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, বিপিসির মাধ্যমে তার প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি করা হয় এক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।
বিপিসির সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমিন উল আহসান ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-আন্দোলনের পর এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ আমলে শুধু তেল পরিবহণ ভাড়া অর্থাৎ প্রিমিয়াম দিয়ে বছরে হাজার কোটি টাকা আয় করেছে একটি সিন্ডিকেট। কারণ, ৫ আগস্টের আগে প্রতি ব্যারেল তেল আমদানির প্রিমিয়াম ছিল ১০ ডলার। ইউনূস সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর সেই প্রিমিয়াম রাতারাতি নেমে আসে সাড়ে ৫ ডলারে। সরকারি কর্মকর্তারা জানান, প্রতি বছরের মতো এবার ৬ মাসের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। আপাতত দুই প্যাকেজে তেল কেনা হচ্ছে তিন মাসের জন্য। কারণ, যুদ্ধের কারণে এখন তেলের দাম এবং প্রিমিয়াম অনেক বেশি। সরকার মনে করছে, এই তিন মাসের মধ্যে হরমুজ খুলে দিলে তেলের দাম এবং জাহাজ ভাড়া অনেক কমবে।