Image description
  • ৯০ শতাংশই অবৈধ সংযোগ
  • দুই বছরে সরকারের ক্ষতি ৪ হাজার কোটি টাকা
  •  ২ বছরে ৯ লাখ অবৈধ গ্যাসসংযোগ বিচ্ছিন্ন

মাটির ওপর দিয়ে ধুলাবালু ও যানবাহনের কোলাহল। কিন্তু ঠিক তার কয়েক ফুট নিচেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর মরণফাঁদ। রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে মাটির নিচে জালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে অবৈধ গ্যাস লাইন। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের যৌথ প্রযোজনায় গড়ে উঠেছে এই সমান্তরাল গ্যাস সাম্রাজ্য।

আধুনিক প্রযুক্তি বা জিও-ম্যাপিংয়ের তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণ অন্ধকার উপায়ে মাইলের পর মাইল টেনে নেয়া হয়েছে এসব বিপজ্জনক লাইন। ফলে একদিকে রাষ্ট্র হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব, অন্য দিকে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে যেকোনো সময় বিস্ফোরণের আতঙ্কে। কিছু বোঝার আগেই নিমিষেই পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে মানুষের জীবন ।

সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো বলছে অতিরিক্ত গ্যাস অপচয় এবং অবৈধ সংযোগ ও চুরির কারণে সাড়ে তিন থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে সরকার। তিতাস সূত্র বলছে, গত দুই বছরে প্রায় ৯ লাখ অবৈধ গ্যাসসংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে ৯০ শতাংশই অবৈধ সংযোগ রয়েছে ।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, তিতাস গ্যাসের দীর্ঘদিনের পুরনো জরাজীর্ণ সঞ্চালন লাইনে অসংখ্য লিকেজ, জোড়াতালি দিয়ে লিকেজ মেরামত, চুলার লুজ কনেকশন, বাসাবাড়িতে গ্যাস লাইনে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং গ্রাহক সচেতনতার অভাবে একের পর এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটছে। গ্যাসে বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে ঝরে পড়ছে অনেক তাজা প্রাণ। অবৈধ এসব সংযোগ বেশি ঢাকার পাশাপাশি গাজীপুর, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার এলাকায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো ঘটনা ঘটলেই তিতাস কর্তৃপক্ষ গ্রাহকের ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্ব শেষ করে।

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অফিস সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে গত ছয় বছরে দুই শতাধিক বিস্ফোরণে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই শতাধিক।

সর্বশেষ গত রোববার ও সোমবার শুধু নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার লাকি বাজার ও গিরিধারা এলাকায় দু’টি বিস্ফোরণের ঘটনায় গৃহকর্তা আবুল কালাম, তার স্ত্রী ও তিন সন্তান দগ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাঁচজন মারা যান। স্থানীয়রা বলেন, গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে নিমিষেই একটি পরিবার শেষ হয়ে গেল। গিরিধারা এলাকায় বিস্ফোরণে মারা গেছেন দুইজন।

অন্ধকার সিন্ডিকেটের ভৌগোলিক বিস্তার : অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া ও নরসিংদীর মতো শিল্পাঞ্চলগুলোতে অবৈধ গ্যাসসংযোগের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। তিতাসের বৈধ পাইপলাইনের নকশাকে বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে এই সিন্ডিকেট নিজস্ব কায়দায় ‘ভূগর্ভস্থ মানচিত্র’ বা জিও-ম্যাপিং তৈরি করেছে। কোথায় মূল লাইন আছে, সেখান থেকে কিভাবে শাখা লাইন বের করা যাবে- তার নিখুঁত হিসাব থাকে এই চক্রের কাছে।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা বা গাজীপুরের টঙ্গী ও কোনাবাড়ি এলাকার একাধিক স্পটে দেখা গেছে, তিতাসের উচ্চচাপ সম্পন্ন মূল পাইপলাইন থেকে রাতের আঁধারে সংযোগ কেটে সাবলাইন বের করা হয়েছে। এই সাবলাইনগুলো দুই থেকে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে চলে গেছে বিভিন্ন আবাসিক এলাকা এবং নামসর্বস্ব বাণিজ্যিক কারখানায়। তিতাসের মেইন গ্রিডের সমান্তরালে চলা এই অবৈধ লাইনের কোনো সরকারি নথিপত্র নেই। কিন্তু সিন্ডিকেটের নিজস্ব খাতায় এর প্রতিটি ইঞ্চি জায়গার হিসাব বা ‘ম্যানুয়াল ম্যাপিং’ রয়েছে।

যেভাবে কাজ করে তিতাস ও লোকাল সিন্ডিকেট : অবৈধ বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি তিতাসের কিছু টেকনিশিয়ান, প্রকৌশলী এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত ‘লুম্পেন সিন্ডিকেট’। সংযোগ দেয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুসংগঠিত। তার মধ্যে তথ্য পাচার ও রুট নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিতাসের অসাধু কর্মকর্তারা প্রথমে সরকারি পাইপলাইনের আসল জিও-ম্যাপিং বা রুট ম্যাপ সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেয়। কোথায় গ্যাস চাপ বেশি এবং কোন এলাকায় নজরদারি কম, তা চিহ্নিত করা হয়। এরপর পাইপ ও সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্রে অবৈধ সংযোগে ব্যবহৃত নিম্নমানের পাইপ, রাইজার এবং রেগুলেটর তিতাসেরই ঠিকাদারের মাধ্যমে কালোবাজারে কেনা হয়। রাতের আঁধারে খননের প্রক্রিয়ার পর স্থানীয় মাস্তান ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের পাহারায় মাঝরাতে রাস্তা খনন করা হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কয়েক কিলোমিটার এলাকায় মাটির নিচে পাইপ বসিয়ে তা ঢেকে দেয়া হয়।

ভুয়া অনুমোদন ও টোকেন বাণিজ্য : গ্রাহকদের বিশ্বাস গড়তে সিন্ডিকেট তিতাসের ভুয়া সিল-স্বাক্ষরযুক্ত রসিদ বা ‘টোকেন’ দেয়। প্রতি মাসে এই টোকেনের মাধ্যমেই লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। রাজস্বের মহাসর্বনাশের সিন্ডিকেটের মূল লক্ষ্য থাকে বাণিজ্যিক ও শিল্প সংযোগ। একটি তৈরী পোশাক কারখানা, ওয়াশিং প্ল্যান্ট বা ইটভাটায় বৈধ সংযোগ নিতে যেখানে বিপুল টাকা এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়, সেখানে এই সিন্ডিকেট মাত্র কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে কয়েক দিনে গ্যাস এনে দেয়।

টঙ্গীর একটি ওয়াশিং কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে তিতাসের কোনো মিটার নেই। অথচ মাটির নিচ থেকে মোটা পাইপের মাধ্যমে উচ্চচাপে গ্যাস পুড়ছে। স্থানীয়রা জানান, এই কারখানার মালিক প্রতি মাসে তিতাসের অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় এক নেতার পকেটে প্রায় দুই লাখ টাকা দেন।

এ দিকে আবাসিক এলাকার চিত্র আরো ভয়াবহ। ঢাকা, গাজীপুরের টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ সাভার আশুলিয়া কেরানীগঞ্জসহ আশপাশের সাব-আরবান এলাকায় বহুতল ভবনগুলোতে প্রতি ফ্ল্যাট থেকে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা নিয়ে অবৈধ সংযোগ দেয়া হয়েছে। তিতাস মাঝে মধ্যে লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে লাইন কেটে দিলেও, পরদিনই তিতাসের সেই কর্মীদের সহযোগিতায় লাইন আবার জোড়া লেগে যায়।

জিও-ম্যাপিং ও ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার : বর্তমান যুগে যেকোনো গ্যাস বা বিদ্যুৎ লাইনের জন্য জিও-ম্যাপিং বা জিআইএস বাধ্যতামূলক। এর মাধ্যমে মাটির নিচে কোথায় কোন পাইপলাইন আছে তা কম্পিউটারে দেখা যায়। কিন্তু তিতাসের এই অসাধু চক্র ইচ্ছাকৃতভাবেই তাদের পুরো বিতরণ ব্যবস্থার শতভাগ জিও-ম্যাপিং সম্পন্ন করতে দিচ্ছে না। ডিজিটাল ম্যাপিং সম্পন্ন হলে যেকোনো অবৈধ সংযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ক্রিনে ভেসে উঠবে। কিন্তু এই সংস্কার আটকে রাখা হয়েছে সিন্ডিকেটের স্বার্থে। তারা মাটির নিচের অন্ধকারকে ব্যবহার করে এই বাণিজ্য টিকিয়ে রেখেছে। যেখানে বৈধ ম্যাপ শেষ হয়, ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয় সিন্ডিকেটের অবৈধ ‘অদৃশ্য ম্যাপ’।

জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর বসবাস : অবৈধ ও অপরিকল্পিত গ্যাস লাইনের কারণে পুরো ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল এখন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়েছে। সরকারি লাইনে যে মানের পাইপ বা ঝালাই প্রয়োজন, অবৈধ লাইনে তার কিছুই মানা হয় না। সাধারণ প্লাস্টিক বা নিম্নমানের লোহার পাইপ দিয়ে গ্যাস নেয়া হচ্ছে।

ফলে মাটির নিচে অনবরত গ্যাস লিকেজ হচ্ছে। এই লিকেজ হওয়া গ্যাস ড্রেন, সুয়ারেজ লাইন এবং ভবনের বেজমেন্টে জমা হচ্ছে। সামান্য আগুন বা বৈদ্যুতিক স্পার্ক থেকে ঘটছে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মগবাজার, সায়েন্স ল্যাব, ফতুল্লা এবং নারায়ণগঞ্জের মসজিদে ঘটে যাওয়া গ্যাস বিস্ফোরণের পেছনে এই অবৈধ ও লিকেজ হওয়া লাইনগুলোই দায়ী ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতামত, রাষ্ট্রীয় ক্ষতি ও সমাধানের পথ: বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ গ্যাস লাইনের কারণে তিতাস প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার সিস্টেম লস বা গ্যাস চুরির শিকার হচ্ছে। এই চুরির দায় চাপানো হচ্ছে সাধারণ বৈধ গ্রাহকদের ওপর, বারবার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে। এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে হলে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করতে হলে এখনই কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান : শুধু বাইরের দালাল ধরলে হবে না। তিতাসের যেসব প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা এই সিন্ডিকেটের মাস্টারমাইন্ড, তাদের চিহ্নিত করে চাকরিচ্যুত ও ফৌজদারি আইনের আওতায় আনতে হবে।

যৌথ টাস্কফোর্স গঠন : আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বুয়েটের বিশেষজ্ঞ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বয়ে একটি স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠন করে নিয়মিত ড্রোন ও সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে অবৈধ লাইন শনাক্ত করে তা স্থায়ীভাবে উপড়ে ফেলতে হবে। মাটির নিচের এই জালের বিস্তার যদি এখনই রুখে দেয়া না যায়, তবে যেকোনো দিন বড় ধরনের কোনো নগর বিপর্যয় বা বড়সড় অগ্নিকাণ্ড পুরো রাজধানী স্তব্ধ করে দিতে পারে। জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি রক্ষার স্বার্থে এই লুম্পেন সিন্ডিকেটকে উপড়ে ফেলার এখনই সময়।

এ প্রসঙ্গে জানতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।