তুরাগ নদ থেকে গত ১৭ মে একটি অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। এটি নদী থেকে তুলতে প্রথমে ৩ হাজার টাকায় একজন ডোম ভাড়া করেন দায়িত্বে থাকা একজন এসআই। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়া হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ৪ হাজার টাকা। মর্গের ডোমকে দিতে হয়েছে আরও ১ হাজার টাকা। পরে পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় লাশটি দাফন করতে দেওয়া হয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামে। লাশ ব্যবস্থাপনায় ওই পুলিশ কর্মকর্তার মোট ৮ হাজার টাকা খরচ হলেও এই কাজের জন্য পুলিশে এক টাকাও বরাদ্দ নেই।
এভাবে লাশ উদ্ধার থেকে শুরু করে চাঞ্চল্যকর হত্যা বা মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত-সবখানেই পদে পদে পকেটের টাকা খরচ করতে হয় পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের। সরকারিভাবে মামলার তদন্ত ব্যয় বাবদ যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, বাস্তব খরচের সঙ্গে তার আকাশ-পাতাল ব্যবধান। যেমন-একটি হত্যা মামলার তদন্তে প্রায় ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হলেও বরাদ্দ মেলে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা। অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা পান না ‘সোর্স মানি’ ও পর্যাপ্ত গাড়ি সুবিধা। দৈনন্দিন কাজের স্বাভাবিক গতি ধরে রাখতে, ঊর্ধ্বতনদের খুশি করতে এবং ভালো পদায়ন পেতে বাধ্য হয়েই ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ায় হাঁটতে হয় অনেককে। অবাস্তব এই সিস্টেম আর আর্থিক সংকটের বেড়াজালেই মূলত লুকিয়ে আছে পুলিশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়া ঘুস আর দুর্নীতির বীজ।
তুরাগ থেকে লাশ উদ্ধারকারী সেই এসআই যুগান্তরকে জানান, গত এক বছরে এমন বেশ কয়েকটি লাশ তাকে ব্যবস্থাপনা করতে হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫ হাজার টাকাও লেগেছে। এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, বেতন পাই মাত্র ৪৫ থেকে ৪৬ হাজার টাকা। চাকরি ঠিক রাখতে টাকা ম্যানেজ করতে হয়।
গত ১৬ মে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের অধীন পল্লবী থানার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘ওপেন হাউজ ডে।’ সেখানে স্থানীয় একটি কমিউনিটি সেন্টারে বিভিন্ন পেশার কয়েকশ লোক উপস্থিত ছিলেন। স্টেজ সাজানো, ফুল ও নাস্তা বাবদ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে পুলিশের। কিন্তু এমন অনুষ্ঠানের জন্য পুলিশকে এক টাকাও বরাদ্দ দেওয়া হয় না। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাছির যুগান্তরকে বলেন, কমিউনিটি সেন্টার ফ্রিতেই পেয়েছিলাম। বরাদ্দ না থাকায় আমরা সব অফিসার মিলেই খরচের টাকা দিয়েছি।
বিভিন্ন মহলে আলোচনা আছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়মিত টাকা দিয়েই পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে টিকে থাকতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে কনস্টেবল ও এসআই পদে চাকরি নেওয়ার সময়ও ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা ঘুস লাগে। চাকরিতে যোগ দিয়ে সেই টাকা তুলতে ঘুস খাওয়া শুরু করেন ওইসব পুলিশ সদস্য।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, পুলিশকে যদি সৎ ও দক্ষ রাখতে হয়, মনোবল চাঙা রাখতে হয় তাহলে আর্থিক এসব সংকট সমাধান করতে হবে। থানার তদন্ত কর্মকর্তাদের পেরেশানিটা বেশি থাকে। তাই যা খরচ হবে তাই তাদের দেওয়া উচিত। যেন কোনো কর্মকর্তাকে পকেট থেকে টাকা দিতে না হয়।
তিনি বলেন, সোর্স মানি যাতে যথাযথভাবে ব্যবহার হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কমান্ড লেভেলে তো খুব বেশি কাজকর্ম নেই। আমার মনে হয় তারা মিনিমামটা রেখে, বাকিটা তদন্ত কর্মকর্তাদের দেওয়া উচিত। সরকারেরও বাজেট একটু বৃদ্ধি করা উচিত।
মামলার তদন্ত ব্যয়ের বরাদ্দ অবাস্তব : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন মামলার তদন্ত ব্যয় ২০২১ সালে পুনর্নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ডাকাতি ও হত্যা মামলার জন্য সর্বোচ্চ বরাদ্দ ৬,০০০ টাকা এবং অপহরণ বা মানব পাচার মামলার জন্য ৫,০০০ টাকা। তবে মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই বরাদ্দ একেবারেই অবাস্তব। কারণ একটি হত্যা মামলা তদন্তে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। আর অপহরণ মামলা তদন্তে ভিকটিম উদ্ধারে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়।
এদিকে দস্যুতা ও অপমৃত্যু মামলার ক্ষেত্রে এই বরাদ্দের পরিমাণ ৪,০০০ টাকা। অ্যাসিডসংক্রান্ত মামলা, দ্রুত বিচার আইনে করা মামলা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা, অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্যসংক্রান্ত মামলা তদন্তে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩,০০০ টাকা। নারী ও শিশু নির্যাতন বা ধর্ষণ মামলা, মাদকদ্রব্যসংক্রান্ত মামলা এবং অন্যান্য সাধারণ মামলা তদন্তের জন্য ২,০০০ টাকা বিল নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ তদন্তকারীদের তথ্য বলছে, বরাদ্দের চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি খরচ হয় এসব মামলায়। অতিরিক্ত টাকা ম্যানেজ করেন তদন্ত কর্মকর্তা নিজে।
মানি লন্ডারিং মামলার তদন্তের জন্য ৩ হাজার টাকা বরাদ্দ হলেও বাস্তব খরচ অনেক বেশি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব মামলা তদন্তে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়।
এ ধরনের মামলার তদন্তকারী একজন এসআই হতাশা প্রকাশ করে যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে পুলিশের চাকরিতে যোগ দিই। চাকরির শুরুতে বেতনের বাইরে কোনো টাকা গ্রহণ করিনি। আমার ইচ্ছা ছিল সততার সঙ্গে চাকরি করব। কিন্তু যখন ডিপার্টমেন্টের সিস্টেমগুলো দেখলাম তখন আমি আস্তে আস্তে এগুলোর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম।
সংকটে ধুঁকছে থানা : ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপির) ৫০টি থানায় বিভিন্ন খাতের কার্যক্রম পরিচালনায় বরাদ্দের অর্থ পর্যাপ্ত নয়, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরাদ্দই নেই। এসব সংকটের কারণে পুলিশের অনেকেই ঘুস বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দৈনন্দিন কাজের স্বাভাবিক গতি যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য কোনো না কোনোভাবে ‘ম্যানেজ’ করে সবকিছু চালাতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ নীতিবিরুদ্ধ কাজ করতে বাধ্য হয়।
মামলা তদন্তকারী একাধিক এসআই যুগান্তরকে জানান, ঢাকার বাইরে অভিযানে গিয়ে যদি ১০ হাজার টাকা খরচ হয়, তাহলে তারা বিল পান চার হাজার টাকা। অনেক সময় তাও পাওয়া যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাদীর কাছ থেকে অভিযানের গাড়ি ভাড়াসহ বিভিন্ন খরচ নেওয়া হয়।
ডিএমপির গুরুত্বপূর্ণ একটি থানার ওসি যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের অনেক কিছুই ম্যানেজ করা লাগে, এসব দুঃখের কথা কী বলব।’
সোর্স মানি পান না মাঠপর্যায়ের কর্মর্তারা : মাঠপর্যায়ে তদন্তের কাজটি করে থাকেন এসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তারা। অপরাধী শনাক্তে সোর্স নিয়োগ করতে হয় তাদের। এসব সোর্সকে নিয়মিত টাকা দিতে হয়। এ বিষয়টি মাথায় রেখে পুলিশে সোর্স মানির প্রচলন রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজ করা পুলিশ সদস্যরা কেন সোর্স মানি পান না। পুলিশের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, এই খাতে বরাদ্দের টাকা সিনিয়রদের পকেটে চলে যায়। তাই অনেক কর্মকর্তা নিজের টাকায় সোর্স নিয়োগ করেন। ফলে সেই কর্মকর্তা দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করতে বাধ্য হন।
যানবাহনের ব্যবস্থাও নিজেকেই করতে হয় : দেশের অধিকাংশ থানায় গাড়ির তীব্র সংকট রয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য নিজেই গাড়ি ম্যানেজ করেন। মানিকগঞ্জ জেলার একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, সদর থানা এলাকায় রাতে ৯টি টহল টিম থাকে। কিন্তু ওসির গাড়িসহ ওই থানায় গাড়ি আছে মাত্র তিনটি। বাকি সাতটি টহল টিমের গাড়ি ম্যানেজ করতে হয়।
ভালো পদায়নে লাগে টাকা : পুলিশে অনেক ক্ষেত্রে ভালো কাজ করলেই ভালো পদায়ন হয় না। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া জেলার এসপি পদায়নে লাগে কয়েক কোটি টাকা। থানার ওসি হতে ২০ থেকে ৩০ লাখ, এসআই ২ থেকে আড়াই লাখ। কনস্টেবল পদায়নে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত লাগে। আওয়ামী লীগ আমলে বিষয়টি ছিল ওপেন সিক্রেট। আওয়ামী লীগের পতনের পর কিছুদিন বন্ধ ছিল এই পদায়ন বাণিজ্য। তবে ফের নতুন করে পদায়ন বাণিজ্য শুরু হয়েছে বলে জোর আলোচনা রয়েছে।
পুলিশের অনেক কর্মকর্তা ভালো পদায়ন পেতে অবৈধ পথে টাকা ইনকাম করে থাকেন। এসব বিষয় প্রকাশ্যে এলেও দোষীদের খুব একটা শাস্তি হয় না। গত বছর নরসিংদীর পুলিশ সুপার (এসপি) পদে পদায়ন পেতে ৫০ লাখ টাকা ঘুস দিয়েছিলেন মো. আবদুল হান্নান নামে এক এসপি। তদন্তে এ অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে লোক দেখানো ‘তিরস্কার’ দণ্ড দিয়েছে সরকার।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশের একটি অপরাধ সভায় তৎকালীন তেজগাঁও বিভাগের ডিসি বলেছেন, রেঞ্জ ডিআইজিরা ওসি পদায়নে ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা করে ঘুস নেন। আবার পুলিশ সুপাররা এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল পদায়নে ঘুস নেন। এ ঘুসের টাকা উঠাতে গিয়ে ওসি থেকে শুরু করে নিচের পদের সদস্যরা মাদক বাণিজ্যসহ নানা অবৈধ কাজে যুক্ত হন। ফলে মাদক বাণিজ্য বন্ধ করা যাচ্ছে না।
ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যায়, পুলিশ বিভাগের সেবা পেতে গিয়ে ঘুস দিতে হয়েছে এমন ভুক্তভোগীর হার প্রায় ৬২ শতাংশ। অপরদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জরিপে বলা হয়েছে, পুলিশের সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছেন এমন মানুষের হার ৭৪.৫ শতাংশ। ঘুস প্রদান করেছেন ৫৮ শতাংশ। এমন বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এক অনুষ্ঠানে পুলিশকে নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, তার কমিউনিকেশন নেই, তার কাছে একটা গাড়ি নেই যে চট করে সে কোনো জায়গায় যাবে। তখন সে কী করে? যে কমপ্লেন (অভিযোগ) করতেছে তাকে বলে, তুই সিএনজির পয়সা দে আমি যাইতেছি। পুলিশ তো নিজের পকেট থেকে টাকা দেবে না। মোস্টলি রুরাল এরিয়াতে তাই হয়। পুলিশকে পুলিশের মতো করে না রাখেন, তাহলে পুলিশের মনোবল তো ওরকমই হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, পুলিশের সেবাদান পর্যায়ে যে অবকাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধা, সেটা সত্যিই নগণ্য এবং অনেক ক্ষেত্রেই শূন্য পর্যায়ে, যার কারণে পুলিশ বাধ্য হয়ে অনেক সময় অনিয়ম-দুর্নীতির দিকে ঝোঁকে। পুলিশ সার্ভিসটাকে উন্নয়নের জন্য কখনোই সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিল না, সেটারই প্রতিফলনে এটা ঘটছে। তিনি বলেন, এগুলোকে যদি সরকার নজরে না নেয়, বিবেচনায় না নেয় তাহলে এই সমস্যা জিইয়ে থাকবে চিরদিন।