যুক্তরাষ্ট্রের সাথে থমকে যাওয়া শান্তি আলোচনা ফের সচল করতে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে নতুন ১৪ দফার প্রস্তাব পেশ করেছে ইরান। শান্তি আলোচনা যখন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, তখন ইসলামাবাদের এই কূটনৈতিক উদ্যোগ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। গতকাল সোমবার রয়টার্সকে পাকিস্তানের একটি কূটনৈতিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দুই পক্ষের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচিয়ে সমঝোতায় আসতে কতটা সময় লাগবে- এমন প্রশ্নের জবাবে সূত্রটি নির্বাচন-পরবর্তী গণতন্ত্রের অগ্রগতি, গণভোট এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতবিনিময় করেন। হাইকমিশনার ডেরেক লোহ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ইতিবাচক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। একইসাথে জানায়, আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। একই সাথে ক্ষোভ প্রকাশ করে সূত্রটি আরো বলে, উভয় দেশই ঘনঘন তাদের অবস্থান ও শর্ত পরিবর্তন করছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যৌথ হামলা শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এরপর থেকেই ব্যাক-চ্যানেল কূটনীতি ও মধ্যস্থতা চালিয়ে আসছে পাকিস্তান। গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতাতেই একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্ভব হয়েছিল। এর আগে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেহরানকে ৯ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব দেয়া হয়, যেখানে দুই মাসের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর কথা বলা হয়। তবে ইরান তা প্রত্যাখ্যান করে জানায়, তারা সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, স্থায়ীভাবে যুদ্ধের অবসান চায় এবং সব বিরোধপূর্ণ বিষয়ের সমাধান আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। ওয়াশিংটনের ৯ দফার বিপরীতে ইরান ১৪ দফা পাল্টা প্রস্তাব দেয়, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘স্টুপিড’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আলোচনা-ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, তেহরানের দেয়া এই নতুন প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো চলমান যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটানো এবং দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস স্থাপন করা। ইরানের আগের দেয়া ১৪ দফা প্রস্তাবের প্রধান শর্তগুলো ছিল- ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ ও সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অবরুদ্ধ মার্কিন ও ইসরাইলি সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, জব্দ বা ফ্রিজ করা ইরানি অর্থ ও সম্পদ অবিলম্বে ফেরত, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে স্থায়ীভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।
অন্যদিকে তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি সাপ্তাহিক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি ইরানের কোনো শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব নেই এবং এ অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে তেহরান সবসময় হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। তিনি বলেন, এ অঞ্চলের জন্য মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বড় হুমকি এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকে আঞ্চলিক দেশগুলোর, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শিক্ষা নেয়া উচিত। এ ছাড়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে ইরান একটি নতুন কৌশলগত মেকানিজম নিয়ে কাজ করছে এবং এ বিষয়ে ওমান সালতানাতের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
এ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অগ্রগতি নিশ্চিত করতে গত শনিবার দুই দিনের সফরে তেহরানে পৌঁছান পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি। এর কয়েক দিন আগেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরও ইরান সফর করেছিলেন। ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনির সাথে দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত বাণিজ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক বৈঠকের পাশাপাশি মার্কিন-ইরান সংলাপের জট খুলতে মহসিন নাকভি তার সফর তৃতীয় দিনের মতো বর্ধিত করেছেন বলে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজের বরাত দিয়ে জানিয়েছে আলজাজিরা।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ওয়াশিংটনের মূল আপত্তি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে। ট্রাম্প প্রশাসন ২০ বছরের জন্য ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত রাখার দাবি জানালেও তেহরান তা সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য স্থগিত রাখতে রাজি হয়েছে। এই জটিল সমীকরণের মধ্যে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বর্ধিত সফর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
২৪-৪৮ ঘণ্টায় হামলার আশঙ্কা
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট অব গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের মিডিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমাসরি। গতকাল সোমবার আলজাজিরাকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারো যুদ্ধ শুরু করবে, কারণ ট্রাম্পের কানের কাছে রয়েছেন অনেক মানুষ- যাদের মধ্যে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্প সরকারের মধ্যে থাকা কট্টরপন্থীরা অন্যতম।
তিনি আরো বলেন, ইরানের কাছ থেকে ট্রাম্প যে ধরনের আত্মসমর্পণ ও প্রত্যাশা করেছিলেন তা পাননি। চীন সফরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠকের সময়ও তিনি ইরান নিয়ে উচ্চ আশা পোষণ করেছিলেন। এই অধ্যাপক বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য সত্যিকারের একটি বিপর্যয়। বিজ্ঞ হলে তার এখানেই যুদ্ধ শেষ করা উচিত। কিন্তু বর্তমান অবস্থা থেকে পিছিয়ে এসে দেশের নাগরিকদের কাছে যুদ্ধ জয়ের ঘোষণা নিয়ে যেতে পারবেন না বলেই তিনি তা করবেন না।