গুরুতর অনিয়ম ও স্বচ্ছতা সংকটে পড়ছে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)। ২৭ জুন অনুষ্ঠেয় নির্বাচন ঘিরে ভোটার তালিকায় ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে আওয়ামী সিন্ডিকেটের ফেরার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সদস্যপদ যাচাই-বাছাই না করেই চূড়ান্ত করা হয়েছে তালিকা।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৈরি হওয়া ‘ভুয়া’ ভোটারদের একটি বড় অংশ রয়ে গেছে তালিকায়। বাস্তবে যাদের কোনো প্রযুক্তি ব্যবসা নেই। তাদের প্রভাবেই বেসিস হয়ে উঠেছিল আওয়ামী দলীয় প্রযুক্তি সংস্থা। মেম্বারশিপ অডিট ছাড়াই নির্বাচনের তফসিল ও ভোটার তালিকা প্রকাশ করায় অনেক সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, বেসিসের নেতৃত্ব আবারও পুরোনো আওয়ামী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। প্রযুক্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত প্রযুক্তি ব্যবসায়ী ছাড়া ভুয়া সদস্য বহাল থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে সংকটে পড়বে দেশের প্রযুক্তি খাত।
বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাসরুর যুগান্তরকে বলেন, বেসিস দেশের প্রযুক্তি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। এখানে যোগ্য ও প্রকৃত প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা নেতৃত্বে না এলে পুরো খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সদস্যপদ ও ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সংগঠনের বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন নষ্ট হবে, তেমনই দেশের প্রযুক্তি শিল্পের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হবে। প্রযুক্তি খাতের স্বার্থে একটি নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি।
বেসিস সংস্কার পরিষদের আহ্বায়ক বাংলা পাজেল লিমিটেডের সিইও মুহাম্মদ আবদুল মজিদ যুগান্তরকে বলেন, সংগঠনে বিপুলসংখ্যক ভুয়া সদস্য রয়েছে। তফসিল ঘোষণার আগেই আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সদস্যপদ অডিট করে তাদের বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু অডিট ছাড়াই নির্বাচন আয়োজন করায় আবারও ভোট কারচুপির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এতে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
বেসিসে বর্তমানে সদস্যসংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৮০০। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ সদস্যই সরাসরি প্রযুক্তি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নয়। এমনকি তাদের অনেকের বেসিস সদস্য হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতাও নেই। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচনি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে এসব ‘ডামি ভোটার’ তৈরি করা হয়। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আগের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগ স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব একেএম হাফিজুল্লাহ খান লিটনকে গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বেসিসের কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে প্রশাসক ১০ সদস্যের একটি সহায়ক কমিটি গঠন করেন। তবে প্রশাসক ও সহায়ক কমিটি ৬ মাসের বেশি সময় কাজ করলেও সদস্যপদ হালনাগাদ ও আর্থিক নিরীক্ষার (অডিট) কার্যক্রম সম্পন্ন করেনি।
অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত নির্বাচন বোর্ড মেম্বারশিপ অডিট সম্পন্ন না করেই ৫ এপ্রিল নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা করে। ২৭ এপ্রিল ছিল ভোটার হওয়ার শেষ দিন। ৭ মে প্রাথমিক ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়। যুগান্তরের হাতে আসা প্রাথমিক ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এবারের নির্বাচনে ৭২৫ জন সদস্য ভোটার হওয়ার জন্য আবেদন করেন। এর মধ্যে জেনারেল ক্যাটাগরিতে ৪৩১, অ্যাসোসিয়েট ক্যাটাগরিতে ৯৬, অ্যাফিলিয়েট ক্যাটাগরিতে ৮৪ এবং ইন্টারন্যাশনাল ক্যাটাগরিতে ৪ জন। প্রাথমিকভাবে ৬১৫ জন ভোটার হিসাবে অনুমোদন পান। ১১০ জনের আবেদন বাতিল করা হয়। ১৫ মে শুক্রবার ছুটির দিন গভীর রাতে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়। এতে দেখা যায়, ৭২৫ জন আবেদনকারীর বিপরীতে চূড়ান্ত তালিকায় ৯৩৫ জন ভোটার। সেখানে জেনারেলে ৬২৬, অ্যাসোসিয়েটে ১৯২, অ্যাফিলিয়েটে ১২২ এবং ইন্টারন্যাশনালে ৫ জন। অর্থাৎ, আবেদনকারীর চেয়েও ২১০ জন বেশি ভোটার যুক্ত হয়েছেন। বাড়তি ২১০ জন ভোটার কোথা থেকে কীভাবে এলেন, এ নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। অনেক ভোটারের বেসিসের সদস্য হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতাই নেই, আবার অনেকেই প্রযুক্তি ব্যবসায়ও সক্রিয় নন।
নিয়ম অনুযায়ী বেসিসের সদস্যপদের ক্ষেত্রে সরাসরি সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টে যুক্ত এবং ন্যূনতম দুই বছরের বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে জেনারেল সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সদস্যপদ যাচাইয়ের সময় প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট সচল আছে কি না, তা প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনা করার কথা থাকলেও বাস্তবে সে মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। একাধিক সদস্য প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ওয়েবসাইটই নেই। জেড কর্প সলিউশনের সামিরা জুবেরি হিমিকার নাম উঠে এসেছে ওই তালিকায়। তিনি বেক্সিমকো গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গিগাটেকের প্রতিনিধি হিসাবে যুক্ত থাকার পাশাপাশি নিজস্ব একটি প্রতিষ্ঠান থেকেও বেসিসের ভোটার হয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট (http://www.zcorpsolutions.com/) বর্তমানে অকার্যকর।
এছাড়া ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন এনআরবি জবস লিমিটেডের দিলারা আফরোজ খান। বেসিস পোর্টালে তাদের ঠিকানা হিসাবে কাওরান বাজারের ভিশন টুয়েন্টি টুয়েন্টি ওয়ান উল্লেখ থাকলেও ভবনটিতে সংস্কারকাজ চলমান থাকায় সেখানে প্রতিষ্ঠানটির কোনো কার্যকর অফিস নেই। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটও সচল নয়।
ভোটার তালিকায় আরও অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন আওয়ামী সরকারের সাবেক মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য র্যাডিসন ডিজিটাল লিমিটেডের দেলোয়ার হোসাইন ফারুক, সালমান এফ রহমানের ব্যবসায়িক অংশীদার দোহাটেক নিউ মিডিয়া, সিসটেক ডিজিটালের এম রাশিদুল হাসান, বেক্সিমকো গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গিগাটেক লিমিটেডের সামিরা জুবেরি হিমিকা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিপক্ষে বেসিসে সভা আয়োজনের অভিযোগ থাকা টিম ক্রিয়েটিভের তসলিম আহমেদ রাসেলসহ বহু আওয়ামী দোসর। জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় কয়েকজন প্রার্থী অভিযোগ করেছেন, সব কাগজপত্র ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিক ও চূড়ান্ত কোনো তালিকাতেই ভোটার হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট রুপম রাজ্জাক জানান, আপিল করার পরও তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম চূড়ান্ত তালিকায় আসেনি।
একই অভিযোগ ব্যবসায়ী শোহিবুর রহমান খান রানার। তিনি যুগান্তরকে জানান, প্রয়োজনীয় সব যোগ্যতা পূরণের পরও তার প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, পরিকল্পিতভাবে ভোটার তালিকা সাজিয়ে পুরোনো সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকে আবারও বেসিসের নিয়ন্ত্রণে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসিসের নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান ও উপসচিব তানিয়া ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না।