দেশের শীর্ষ চার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়-ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র আবাসন সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো শিক্ষার্থী। প্রতিষ্ঠার কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও আবাসন সক্ষমতা না বাড়ায় ঢাবি, রাবি ও চবিতে মাত্র ২৭ থেকে ৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থী হলের সুবিধা পাচ্ছেন। অন্যদিকে জবির ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র একটি ছাত্রীহল। যারা হলে থাকছেন, তাদেরও দিন কাটছে গাদাগাদি গণরুম, নিম্নমানের খাবার আর স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে। বাধ্য হয়ে বাকি বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে মেস বা ভাড়া বাসায়। অতিরিক্ত খরচ, নিরাপত্তাহীনতা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে চরম ভোগান্তি ও মানসিক চাপে ব্যাহত হচ্ছে তাদের শিক্ষাজীবন।
ঢাবি হলে গাদাগাদি, দূষিত পানি পুষ্টিহীন খাবার
দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) আবাসন সংকটের সঙ্গে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি এখন শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। ৪২ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর এই প্রতিষ্ঠানে অর্ধেকেরও কম শিক্ষার্থী হলে থাকার সুযোগ পান। যারা হলে থাকছেন, তাদেরও দিন কাটছে চারজনের কক্ষে আটজনের গাদাগাদি পরিবেশে। এছাড়া নিম্নমানের খাবার, দূষিত পানি, অপরিচ্ছন্ন স্যানিটেশন এবং অস্বাস্থ্যকর কক্ষ তাদের নিত্যসঙ্গী। বিশেষ করে ছাত্রী হলগুলোয় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানসিক স্বস্তির অভাবে শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ভর্তি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪২ হাজার ৮৮১ জন। এর মধ্যে ছাত্র ২২ হাজার ১৫২ এবং ছাত্রী ২০ হাজার ৭২৯ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হল ১৯টি। ছাত্রদের ১৩টি, ছাত্রীদের পাঁচটি এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক হল রয়েছে।
ছাত্রী হলগুলোয় থাকছেন প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী আর ছাত্র হলে প্রায় ১২ হাজার। অর্থাৎ, মোট শিক্ষার্থীর অর্ধেকেরও কম হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৈধভাবে হলে থাকা আবাসিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮ হাজার ৮১৭ জন। বাকিদের থাকতে হচ্ছে মেস বা ভাড়া বাসায়। কিন্তু যারা হলে থাকার সুযোগ পেয়েছেন, তারাও স্বস্তিতে নেই। প্রতিনিয়ত তারা নানারকম সংকট মোকাবিলা করেই টিকে আছেন। হলের ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অধিকাংশ হলে প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় থাকে নিম্নমানের ভাত, পাতলা ডাল, সামান্য সবজি, ব্রয়লার মুরগি কিংবা ছোট মাছের টুকরা। অনেক সময় পচা বা পোকায় ধরা সবজি, অতিরিক্ত তেল-মসলা, অপরিষ্কার পরিবেশে রান্না এবং টেস্টিং সল্ট ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া যায়।
পুষ্টিবিদদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের জন্য প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন, আয়রন ও ক্যালসিয়াম থাকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, এ বয়সে মানসিক শ্রম বেশি থাকে এবং দীর্ঘসময় পড়াশোনার জন্য শরীর ও মস্তিষ্কের পর্যাপ্ত শক্তি প্রয়োজন হয়। অথচ অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত সুষম খাদ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, শিক্ষার্থীদের পুষ্টির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। খাবারে বৈচিত্র্য না থাকলে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এদিকে নিরাপদ পানির সংকটও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন হলে বিশুদ্ধ পানির ফিলটার অকার্যকর, অপরিষ্কার কিংবা অপর্যাপ্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক শিক্ষার্থী ট্যাপের পানি পান করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও ক্যাম্পাস এলাকার পানিতে মলমূত্রজনিত জীবাণু ‘কলিফর্ম’ পাওয়া গেছে। ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার মোহাম্মদ ইয়ামিনের উদ্যোগে পরিচালিত পরীক্ষায় ২ থেকে ১৪ মাত্রা কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত হয়। এ ধরনের জীবাণু ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিস, কলেরাসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে ‘পানিজনিত কারণে’ শতাধিক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কয়েকদিন ধরে জ্বর, বমি, পেটব্যথা ও ডায়রিয়াজনিত উপসর্গ নিয়ে শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মাহবুবা সুলতানা বলেন, সমস্যা দেখা দেওয়ার পর ফিল্টার পরীক্ষা, কিট পরিবর্তন ও রিজার্ভার পরিষ্কার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ডাকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মিনহাজ বলেন, সব হলের পানি পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী শিক্ষার্থী ভর্তি করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধার সক্ষমতা যদি ১৫ থেকে ১৭ হাজার শিক্ষার্থীর হয়, সেখানে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। অথচ হল, লাইব্রেরি, ল্যাব ও শ্রেণিকক্ষের সুবিধা তার চেয়েও কম। তিনি বলেন, শিক্ষাবিজ্ঞান অনুযায়ী একজন শিক্ষক ৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে যথাযথ মনোযোগ দিতে পারেন না। কিন্তু বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, হলগুলোয় আবাসন সংকট, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাবে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী যুগান্তরকে বলেন, হলগুলোর সমস্যা প্রাধ্যক্ষরা দেখছেন বলে আমার বিশ্বাস। আমি আমার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকব। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও জীবনমান যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমার সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
চবিতে হলের বাইরে ৭৩ ভাগ শিক্ষার্থী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) মোট শিক্ষার্থীর ২৭ শতাংশ পাচ্ছেন আবাসন সুবিধা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ধাপে ধাপে বিভাগ, ইনস্টিটিউট, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। তবে সে অনুপাতে বাড়েনি আবাসন সুবিধা। ফলে আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় এ ক্যাম্পাসে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে হলের বাইরে। বাইরে থাকা এসব শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে শুধু বঞ্চিতই হচ্ছেন না, অনেক ভোগান্তিও পোহাতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্যাম্পাসে যাতায়াত করেন শাটল ট্রেনে ‘গাদাগাদি’ করে। বাসে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও মেয়ে শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের বিড়ম্বনায় পড়েন। হলে সিট না পেয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে ১নং গেট, ২নং গেট, ফতেপুর, জোবরা, হাটহাজারীসহ চট্টগ্রাম শহরে বাসা ভাড়া করে থাকেন শিক্ষার্থীরা। প্রায় সময়ই এসব ভাড়া বাসায় সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। এছাড়াও রয়েছে নিরাপত্তা সংকট।
চবিতে নিয়মিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী প্রায় ১২ হাজার এবং পুরুষ প্রায় ১৬ হাজার। হলে থাকেন ৭ হাজার ৫শ জন, অর্থাৎ ৭৩ ভাগ শিক্ষার্থীই হলের বাইরে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেদের আটটি হল ও একটি হোস্টেল এবং মেয়েদের পাঁচটি রয়েছে। ছেলেদের হলে আছে ৩৭৬৭টি আসন, আর মেয়েদের হলে আছে ২৬৪১টি আসন। হলগুলোতে আবার অনেক রুম বসবাসের অনুপযোগী। ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাচ্ছেন আবাসিক সুবিধা। তবে মেয়েদের হলে ডাবলিংয়ের সুযোগ থাকায় সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ছয় শতাংশ শিক্ষার্থী বেশি পাচ্ছেন আবাসিক সুবিধা।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর আবাসিক হলগুলোতে আট বছর পর আসন বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। এর আগে ২০১৭ সালের জুনে আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
চবির ছাত্র হলগুলোর মধ্যে আলাওল হলে আসন রয়েছে ২৬০টি, এএফ রহমান হলে ২৫৮টি, শাহজালাল হলে ৪৭৫টি, শাহ আমানত হলে ৬৩২টি, সোহরাওয়ার্দী হলে ৩৭৫টি, শহীদ আব্দুর রব হলে ৫০৯টি, মাস্টারদা সূর্যসেন হলে ১৭৬টি, শহীদ ফরহাদ হোসেন হলে ৭০০টি ও অতীশ দীপঙ্কর হলে ৩১২টি আসন রয়েছে। এছাড়া চাকসুর উদ্যোগে সম্প্রতি চালু হওয়া শহীদ ফরহাদ হোসেন হলের নবনির্মিত বর্ধিত অংশে (এক্সটেনশন) আরও ৮৮ জন শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ছাত্রী হলগুলোর মধ্যে শামসুন নাহার হলে ৪৮১টি, প্রীতিলতা হলে ৫৩১টি, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হলে ৫০৮টি, বিজয় ২৪ হলে ৭৫০টি, মাস্টারদা সূর্যসেন হলে (আংশিক) ৩৯টি, নবাব ফয়জুন্নেছা হলে ৩১২টি আসন রয়েছে। এছাড়া চারুকলার শিক্ষার্থীদের জন্য শিল্পী রশীদ চৌধুরী হোস্টেলে আছে ৩৫টি আসন।
আবাসন ভাতা দাবি শিক্ষার্থীদের : আবাসন সংকট নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় আন্দোলনে নেমেছে। তাদের দাবি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হওয়ার আগ পর্যন্ত ভাতার ব্যবস্থা করা। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির, বাম ছাত্র সংগঠন, অন্যান্য ইসলামী ছাত্র সংগঠনের নেতারা বিভিন্ন সময় এসব দাবি তুলেছেন।
নতুন ১০টি হল নির্মাণের পরিকল্পনা : চবিকে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার লক্ষ্যে ১০ তলা বিশিষ্ট পাঁচটি ছাত্র হল এবং পাঁচটি ছাত্রী হল নির্মাণের লক্ষ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ডিপিপি পাঠাতে কাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মো. রিয়াদ গাজী বলেন, এখন হলে গণরুম, গেস্টরুম কালচার নেই। মেধার ভিত্তিতেই সিট দেওয়া হচ্ছে। তারপরও আবাসন সংকটের কারণে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকে হলের বাইরে থাকতে হচ্ছে। স্নাতকোত্তরের আরেক শিক্ষার্থী মারজান বেগম বলেন, আমরা শহর থেকে এসে ক্লাস করি। চার বছরেও হলে সিট পাইনি। শাটল ট্রেনে গাদাগাদি করে আসতে হয়। পাশাপাশি নিরাপত্তা হুমকি তো আছেই।
চাকসুর যোগাযোগ ও আবাসনবিষয়ক সম্পাদক মো. ইসহাক ভূঁঞা বলেন, ইতোমধ্যে চাকসুর উদ্যোগে ফরহাদ হলের এক্সটেনশন ৮৮ জন শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া শাহজালাল হলে সংস্কার কাজ চলমান। অনেক হলে এক্সটেনশন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ১০টি হল নির্মাণের জন্যও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
চবির বিজয় ২৪ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. জান্নাত আরা পারভীন বলেন, আমাদের হলে ৭৫০ জন মেয়ে শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা থাকলেও ১৩০০ জন অবস্থান করছে। নানা কারণে মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের রাখতে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান বলেন, ইতোমধ্যে বেশ কিছু হলে এক্সটেনশনের কাজ করা হচ্ছে। পুরাতন শামসুন্নাহার হল সংস্কার করে বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১০ তলা বিশিষ্ট পাঁচটি ছাত্র হল এবং পাঁচটি ছাত্রী হল নির্মাণের লক্ষ্যে ডিপিপি প্রস্তুত করা হচ্ছে।
রাবিতে আবাসন সংকট কাটেনি ৭৩ বছরেও
প্রতিষ্ঠার ৭৩ বছর পেরিয়ে গেলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটের কোনো সমাধান হয়নি। প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে হলে জায়গা পাচ্ছেন মাত্র ৯ হাজার ৬৭৩ জন। অর্থাৎ, ৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থীকেই হলের বাইরে থাকতে হচ্ছে। সংকট সবচেয়ে প্রকট ছাত্রী হলগুলোতে; যেখানে গণরুমে একটি সিঙ্গেল বেডে দুজন করে চরম মানবেতর ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া ১৬০ জনের জন্য রয়েছে মাত্র চারটি গ্যাসের চুলা ও তিনটি ওয়াশরুম। নতুন ভবন নির্মাণের কাজ চললেও ধীরগতির কারণে এ সংকট সহসাই কাটছে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১২টি অনুষদের অধীনে ৫৯টি বিভাগ ও ৬টি উচ্চতর গবেষণা ইনস্টিটিউট রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য আছে ১৭টি আবাসিক হল এবং একটি আন্তর্জাতিক ডরমেটরি। এর মধ্যে ছেলেদের জন্য ১১টি এবং মেয়েদের জন্য ৬টি হল। আন্তর্জাতিক ডরমেটরিতে থাকেন বিদেশি শিক্ষার্থী ও এমফিল-পিএইচডি পর্যায়ের গবেষকেরা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩টি নতুন বিভাগ, ৭টি অনুষদ এবং ৪টি ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে। এর মধ্যে গত ১৫ বছরেই চালু হয়েছে ১৪টি বিভাগ ও একটি ইনস্টিটিউট। একই সময়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজারে। তবে এ দীর্ঘ সময়ে নতুন আবাসিক হল নির্মিত হয়েছে মাত্র তিনটি।
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আবদুল আহাদ বলেন, তৃতীয় বর্ষে উঠেও সিট পাইনি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার অভাবেই ৭৩ বছরেও ৫০ শতাংশ আবাসিকতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রী ও হল প্রাধ্যক্ষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছয়টি ছাত্রী হলেই আসন সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রায় প্রতিটি হলেই চালু রয়েছে গণরুম, যেখানে একটি সিঙ্গেল বেডে দুজন করে থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রহমতুন্নেছা হলের শিক্ষার্থী সাদিকা ইয়াসমিন বলেন, ছোট জায়গার মধ্যে জামা-কাপড়, বইপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখতে দারুণ ভোগান্তি পোহাতে হয়। রান্নার হাঁড়ি-পাতিলসহ সবকিছু এর মধ্যেই রাখতে হয়, একদম বস্তির মতো পরিবেশ। গরমের মধ্যে এই কষ্ট আরও বেড়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, গণরুমে প্রায় ১৬০ শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র চারটি চুলা ও তিনটি ওয়াশরুম। এর মধ্যে দুটি নিচতলায়। রান্না করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এত কষ্টের পরও মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা খরচ কমানোর জন্য গণরুমে থাকতে বাধ্য হন।
এ বিষয়ে বেগম খালেদা জিয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক নাহিদা শারমিন বলেন, গণরুমের বর্তমান পরিস্থিতি কোনোভাবেই আদর্শ নয়। আমরাও তাদের এভাবে রাখতে চাই না। কিন্তু অনেক ছাত্রী এসে অনুরোধ করে-‘ম্যাডাম, খাট না হলেও চলবে, শুধু থাকার জায়গা চাই।’
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৮ সালে ১০ তলা বিশিষ্ট বিজয় একাত্তর হল ও শেখ হাসিনা হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। এর মধ্যে বিজয় একাত্তর হল প্রস্তুত হলেও শেরেবাংলা ফজলুল হক হলের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ওই হলের শিক্ষার্থীদের সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। অন্যদিকে, ছাত্রীদের মন্নুজান হলের বিভিন্ন দেওয়ালে ফাটল দেখা দেওয়ায় ওই হলের ছাত্রীরা নিরাপদ আবাসনের দাবিতে বিক্ষোভও করেছেন। এদিকে নির্মাণাধীন শেখ হাসিনা হলের কাজ সম্পন্ন হয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ।
এ বিষয়ে রাকসু সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, আবাসন সংকট বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি। নিয়মিত প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরা হচ্ছে। সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আমরা আন্দোলনে যাব।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন যুগান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা কমিটি থেকে ইউজিসি, সেখান থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় হয়ে একনেকে অনুমোদন নিতে হয়। দুটি হল নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া আরও পাঁচটি হল নির্মাণে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।
জবির ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য একটি মাত্র হল
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন মানেই পুরান ঢাকার সংকীর্ণ গলি আর ছোট ছোট মেস। পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধার অভাবে হাজারো শিক্ষার্থী অস্বাস্থ্যকর ঘিঞ্জি পরিবেশ ও ব্যয়বহুল মেসে বসবাস করছেন। ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে থাকা, বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং ন্যূনতম ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেক শিক্ষার্থী মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্রতিষ্ঠার পর হলবিহীন দুই দশক পার করলেন জবি শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র ১২শ নারী শিক্ষার্থীর জন্য একটি হল রয়েছে-নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ছাত্রী হল। অন্যদিকে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দুটি ছাত্র হলের কাজ চললেও নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ায় বন্ধ রয়েছে প্রকল্পের কাজ। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত মেস ভাড়া, খাবার খরচ ও যাতায়াত ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
নানামুখী সমস্যায় একমাত্র ছাত্রী হল : বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র আবাসিক হল নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হল। প্রথমে ৬শ শিক্ষার্থীর ধারণ ক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজন বিবেচনায় ১২শ শিক্ষার্থী উঠানো হয়। ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় অর্ধেক নারী শিক্ষার্থীর বিপরীতে একটি হল পর্যাপ্ত নয়। হলে সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা নিয়েও আছে শিক্ষার্থীদের নানা অভিযোগ। দুর্বল ওয়াইফাই সংযোগ, মেডিকেল সেন্টার না থাকা, কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকির ঘাটতি এবং খাবারের নিম্নমান ও উচ্চমূল্য নিয়ে একাধিকবার শিক্ষার্থীরা অভিযোগ জানালেও কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, হলে প্রতি ফ্লোরে ৯০ জন শিক্ষার্থীর জন্য গ্যাসের চুলা আছে মাত্র ৪টি। পুরো ১৬ তলা ভবনে যাতায়াতের জন্য ৪টি লিফট স্থাপন করা হলেও চালু রাখা হয় ২টি। ফলে লিফটের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ১২শ শিক্ষার্থীর জন্য একমাত্র মেডিকেল সেন্টারটিও বন্ধ রয়েছে। অধিকাংশ হাউজ টিউটর নিয়মিত হলে আসেন না বলে জানান শিক্ষার্থীরা।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত ছাত্রী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আয়েশা ইসলাম আনিকা বলেন, হলে পানির ট্যাপ, বৈদ্যুতিক লাইট, ফ্যান অথবা গ্যাসের চুলা নষ্ট হয়ে গেলে দিনের পর দিন আর ঠিক করা হয় না। হাউজ টিউটররাও কোনো খোঁজ রাখেন না। ক্যান্টিনে উচ্চমূল্যে নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হয়। শিক্ষার্থীরা সমান দামে বাইরে থেকে আরও ভালো খাবার খেতে পারেন।
আস সুন্নাহর মেধাবী প্রকল্প : আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশন পরিচালিত ‘মেধাবী’ প্রকল্পের আওতায় কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে ৭শ শিক্ষার্থীর আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানেও কঠোর নিয়মশৃঙ্খলা ও আস সুন্নাহ কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন ফাউন্ডেশন কোর্স নিয়েও অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীদের দাবি, আস সুন্নাহ কর্তৃপক্ষ একাডেমিক মানোন্নয়ন ও পড়াশোনার চেয়ে তাদের নিজস্ব প্রণীত বিভিন্ন ফাউন্ডেশন কোর্সগুলো সম্পন্ন করতে বেশি চাপ দেয়।
শিক্ষার্থীদের আশার আলো নির্মাণাধীন দুই ছাত্র হল : পরিত্যক্ত ‘বাণী ভবন’ ও ‘হাবিবুর রহমান হল’র জায়গায় বর্তমানে দুটি ছাত্র হল নির্মাণাধীন রয়েছে। সরেজমিন দেখা যায়, বাণী ভবনের জায়গায় ইতোমধ্যে পাইলিং সম্পন্ন হয়েছে। ভিত্তি পিলার নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ। উভয় হলের জায়গায় মোট ১২শ শিক্ষার্থী ধারণ ক্ষমতার ৬ তলা বিশিষ্ট দুটি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে প্রশাসনের। সম্প্রতি নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ার দাবি তুলে প্রকল্পের কাজ বন্ধ রেখেছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন টিম।
পুরান ঢাকায় মানবেতর জীবন পার শিক্ষার্থীদের : বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী পুরান ঢাকার আশপাশের মেসে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। খরচ জোগাড় করতে টিউশনি করতে হয় তাদের। টিউশনিতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হওয়ায় পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে জবির অসংখ্য শিক্ষার্থীর। খরচ সংস্থান করতে না পেরে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন অনেক শিক্ষার্থী। ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী মুনির হোসেন বলেন, মাসের অধিকাংশ সময়ই খরচ মেটানোর চিন্তায় মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হয় আমাদের। একই সঙ্গে ক্লাস, টিউশনি ও মেস জীবনের ক্লান্তি আমাদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমিয়ে দিচ্ছে।
নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ছাত্রী হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আঞ্জুমান আরা বলেন, মাস্টার্স শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও কেউ সিট ছাড়তে চায় না। তাই নতুন ব্যাচকে হলে সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। হাউজ টিউটররা নিয়মিত হলে যান। আর কারও যদি কোনো সমস্যা বা অভিযোগ থাকে, আমাকে জানানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নতুন ছাত্র হলের নির্মাণ কাজ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, আমরা সেনাবাহিনী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বারবার বসছি। আমাদের উপাচার্যও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। দ্রুত কাজ শুরুর জন্য তাদের তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। সার্বিক বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইস উদ্দিন বলেন, ইতোমধ্যে আমাদের দুটি হলের নির্মাণ কাজ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন হচ্ছে। আমি শনিবারও দেখা করেছি সেনাবাহিনীর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে, আবারও দেখা করার শিডিউল নিয়েছি। দুটি হলের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা সমাধানে বড় অগ্রগতি হবে।