Image description

উচ্ছেদকৃত হকারদের পুনর্বাসনে পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকার দুই সিটির প্রশাসকরা। হকাররা ফুটপাথেই বসবেন। তবে নির্ধারিত জায়গায়। দেয়া হবে ডিজিটাল আইডি কার্ড। স্ক্যান করলেই বের হবে পুরো তথ্য। নিজের বরাদ্দকৃত জায়গায়তেই বসতে হবে। দিতে হবে নির্দিষ্ট ফি। এ ছাড়াও জায়গাভেদে নির্ধারণ করে দেয়া হবে সময়। নির্দিষ্ট সময়েই করতে পারবেন ব্যবসা। সরকারি নির্দেশনা না মানলে বাতিল হবে আইডি কার্ড।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফুটপাথ দখলমুক্ত রাখতে শুধু উচ্ছেদ নয়, সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। হকারদের পুনর্বাসন, নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসার সুযোগ, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং নিয়মিত ও স্বচ্ছ আইন প্রয়োগ প্রয়োজন। এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব মানবজমিনকে বলেন, ফুটপাথ পথচারীদের জন্য। তবে, হকারদের সঙ্গে পথচারীদের সম্পর্ক নিবিড়। এটাও বিচ্ছিন্ন করা ঠিক নয়। কারণ ৩০০-৪০০ টাকায় শার্ট-প্যান্ট অথবা বাচ্চার কাপড় অন্য কোথাও যোগান দিতে পারবেন না। তবে, পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিতভাবে ধারণ করার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের করিডোরভিত্তিক পরিকল্পিত এবং সমনির্ভর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। ফুটপাথকে প্রশস্ত করে গাছ লাগিয়ে মাঝে-মধ্যে ‘পকেট স্পেস’ বের করে সহজেই হকারদের জন্য ব্যবস্থা করা সম্ভব। হকার যেন কখনোই না মনে করে এ জায়গার মালিক আমি। যেমন, ৬ ঘণ্টা পর তাকে সে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। সেখানে নতুন কেউ বসবে। তাই হকারদের শৃঙ্খলায় আনার বিকল্প নেই।

জানা গেছে, এবার হকারদের ছেড়ে দেয়া হবে না চাঁদাবাজদের হাতে। তবে তাদের মানতে হবে সরকারি নির্দেশনা। চলতে হবে নিয়মের মধ্যে। ব্যবসার জন্য জায়গা ও সময় ঠিক করে দিবে সিটি করপোরেশন। হাতে দিবে ডিজিটাল আইডি কার্ড। থাকবে কিউআর কোড সিস্টেম। যে কেউ স্ক্যান করে দেখতে পারবে ব্যবসায়ীর পরিচয়। এছাড়াও নির্দিষ্ট জায়গায় বসতে হবে তাদের। নির্ধারিত সময়েই করতে পারবেন ব্যবসা। সরকারি নির্দেশনা না মানলে বাতিল হবে আইডি কার্ড। এরইমধ্যে দুই সিটি করপোরেশন থেকে হকারদের পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত ৩০শে এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) থেকে ১০০ জন হকারকে ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেয়া হয়। এছাড়াও সোমবার আরও ১০০ জন হকারের মাঝে কার্ড বিতরণ করা হয়। অপরদিকে, ভ্রাম্যমাণ ২০২ জন ব্যবসায়ীর (হকার) মাঝে ডিজিটাল পরিচয়পত্র বিতরণ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। ধীরে ধীরে সবাইকে এর আওতায় আনা হবে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, হকারদের নির্দিষ্ট ফি-এর আওতায় আনা হবে। তবে কত টাকা তা নিয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। তাদের প্রতি বছর কার্ড রিনিউ করতে হবে। এতে সরকারি ফি ফাঁকি দেয়ার সুযোগ থাকবে না। পুরো বিষয়টি ডিজিটাল সিস্টেমের মধ্যে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। যাতে এ সুযোগ নিয়ে কেউ ফায়দা নিতে না পারে। হকারদের বসার জায়গা নিয়ে জরিপ চলছে। নির্দিষ্ট হারেই বসার সুযোগ দেয়া হবে। অতিরিক্ত বসিয়ে জগাখিচুড়ির মতো অবস্থা যেন না হয় তা নিয়েও ভাবছেন সংশ্লিষ্টরা। ডিএনসিসি’র একটি সূত্র জানিয়েছে, হকারদের জন্য দৈর্ঘ্য ৪ ফুট, প্রস্থ ৩ ফুট পরিমাণ জায়গা বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। এজন্য সর্বনিম্ন্ন ফি নির্ধারণ করা হবে। যা মাসে ৩০০ টাকার মতো হতে পারে।

জানা যায়, হকারদের পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করছে পুলিশ। পুলিশের দেয়া তথ্য যাচাই করে আইডি কার্ড বানাচ্ছে সিটি করপোরেশন। এরপর তা বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি হকারদের বসার জায়গা নিয়ে জরিপ করছে সিটি করপোরেশন। জরিপ শেষে কোথায় কতজনকে বসানো হবে তা নির্ধারণ করা হবে। তবে সব সড়কে বসতে পারবে না হকাররা। বসার জন্য কয়েকটি সড়কও নির্ধারণ করা হয়েছে। সড়কে জ্যাম ও ফুটপাথে জটের বিষয়টি নিয়েও ভাবছে সিটি করপোরেশন। এ জন্য ভিন্ন সড়কে ভিন্ন সময়ে বসানোর বিষয়টি ভাবা হচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কিছু জায়গা নির্ধারণ করে দিয়েছে। যেসব হকাররা আইডি পাচ্ছেন তাদের বসানো হবে এসব স্থানে। এর মধ্যে গুলিস্তানের রমনা ভবনের লিংক রোডে হকাররা দিনব্যাপী বসবে। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের বিপরীত পাশে এজিবি কলোনি মাঠে এবং মতিঝিল ইসলাম চেম্বারের সামনে ও আশেপাশের এলাকায় সন্ধ্যা ৬টা হতে রাত ১০টা পর্যন্ত বসবে। এছাড়াও তারা রাজউক ভবনের পেছনে- গুলিস্তান টুইন টাওয়ার গলি, বায়তুল মোকাররম পূর্বগেইট সংলগ্ন লিংক রোড, নিউ মার্কেটের দক্ষিণ গেট সংলগ্ন এক পাশে, শাজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির অভ্যন্তরে মাঠ সংলগ্ন রাস্তায় দিনব্যাপী বসবে। ঠিক কতজন হকারকে বসতে দেয়া হবে- তা এখানো নির্ধারণ করা হয়নি।

অপরদিকে, ২০২ জন ব্যবসায়ীর (হকার) মাঝে ডিজিটাল পরিচয়পত্র বিতরণ করেছে ডিএনসিসি। এর মধ্যে ১০২ জন হকারকে মিরপুর-১০ এলাকা থেকে মিরপুর-১৩ ওয়াসা রোডে স্থানান্তর করা হয়েছে। বাকি ১০০ জনকে গাবতলী কাঁচা বাজার সংলগ্ন ফাঁকা স্থানে স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া চলছে। এসব এলাকায় তালিকাভুক্ত ৮২৯ জন হকার রয়েছেন। পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল পরিচয়পত্র দিয়ে তাদেরকে নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তর করা হবে বলে সূত্র জানায়। তবে তাদেরকে প্রধান সড়কগুলোর ফুটপাথে বসতে দেয়া হবে না। স্থানান্তর করা হবে লোকাল সড়কগুলোতে। বর্তমানে মিরপুর এলাকার হকারদের প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। এরপর অন্য এলাকার হকারদের পুনর্বাসন করা হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে ফার্মগেটসহ ডিএনসিসি’র গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো থেকে তাদেরকে স্থানান্তর করা হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম মানবজমিনকে বলেন, আমরা উচ্ছেদে বিশ্বাস করি না। আমরা হকারদের একটি নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা করবো। হকাররাও এ দেশের মানুষ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাদের বিষয়ে মানবিক। আমরা সবার সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টা করছি। যাতে গাড়ি, মানুষ চলাচলের পাশাপাশি হকাররা নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারে। আমরা হকারদের বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তর করবো। যেন রাস্তায় চলাচলে সমস্যা না হয়। হকাররা কোথাও বসবে অর্ধবেলা, কোথাও পূর্ণবেলা। তাদেরকে বিভিন্নভাবে ভাগ করা হবে। সবকিছু নিয়মের মধ্যে আনা হবে। এরইমধ্যে আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। একটু সময়ের প্রয়োজন। দ্রুতই একটি সমাধান চলে আসবে।